ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল
বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে,
ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায়—
আরো দু’তিনটি মুরগীর সঙ্গে।
আশ্রয় যদিও মিলল,
উপযুক্ত আহার মিলল না।
সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে
গলা ফাটাল সেই মোরগ
ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত—
তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত।
তারপর শুরু হল তার আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা:
আশ্চর্য! সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল
ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার!
তারপর একসময় আস্তাকুঁড়েও এল অংশীদার—
ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু’তিনটে মানুষ;
কাজেই দুর্বলতর মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে।
খাবার! খাবার! খানিকটা খাবার!
অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে
বার বার চেষ্টা ক’রল প্রাসাদে ঢুকতে,
প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচণ্ড।
ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে—
‘প্রাসাদের ভেতর রাশি রাশি খাবার’!
তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল,
একেবারে সোজা চলে এল
ধব্ধপে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবর টেবিলে;
অবশ্য খাবার খেতে নয়—
খাবার হিসেবে॥
একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে যায় এক বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট কোণে—ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায়, আরও দু-তিনটি মুরগির সঙ্গে। আশ্রয় মিললেও উপযুক্ত আহার মেলে না; মোরগটি সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানায়, খাবারের জন্য লড়াই করে। তার এই প্রতিবাদ, তার এই ‘বিদ্রোহী’ আচরণ মালিকের নজরে পড়ে। মালিক সন্তুষ্ট হন—এমন তেজি মোরগই তো চাই! শেষে মোরগটিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ধবধবে সাদা দামি কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে—তবে খাবার খেতে নয়, খাবার হিসেবে। অর্থাৎ প্রতিবাদই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল; ব্যবস্থা বিদ্রোহীকেও নিজের ভোজের উপকরণ বানিয়ে নেয়। এই কবিতা শোষক-শোষিত সম্পর্কের নির্মম ব্যঙ্গ—আশ্রয়ের নামে প্রাণীটিকে পোষা হয়েছিল শুধু খাওয়ার জন্য। এই নির্মম পরিণতিতে কবি দেখিয়েছেন—শোষণ-ব্যবস্থায় দয়া ও নিষ্ঠুরতার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; দুটোই শোষকের স্বার্থের দাস।
‘একটি মোরগের কাহিনী’ কবিতার শিল্পকৌশল এর চমকপ্রদ সমাপ্তিতে। পুরো কবিতা জুড়ে পাঠক মোরগটির প্রতি সহানুভূতিশীল হন—আশ্রয় পেয়েও খাবার না পাওয়া, প্রতিবাদে চিৎকার করা—এই সংগ্রামে পাঠক মোরগের পক্ষ নেন। কিন্তু শেষ দুই পংক্তিতে—‘অবশ্য খাবার খেতে নয়—খাবার হিসেবে’—কবি পাঠকের সব সহানুভূতিকে উল্টে দেন। এই আকস্মিক মোড় কবিতাটিকে শুধু করুণ কাহিনি থেকে রূপান্তরিত করে তীব্র ব্যঙ্গে। মোরগটি এখানে শোষিত শ্রেণির প্রতীক—যাকে ‘আশ্রয়’ দেওয়া হয়, কিন্তু সেই আশ্রয় আসলে খাঁচা; যার প্রতিবাদকে প্রশংসা করা হয়, কিন্তু সেই প্রশংসা আসলে তাকে জবাইয়ের জন্য বাছাই করা। প্রাসাদ, প্যাকিং বাক্স, সাদা কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিল—এই চিত্রগুলো ধনী শ্রেণির ভোগবিলাসের প্রতীক; আর মোরগটি সেই বিলাসেরই উপকরণ। কবিতার গভীরতম বক্তব্য হলো: শোষণ-ব্যবস্থায় বিদ্রোহও পণ্যে পরিণত হয়। মোরগটি যত তেজি, মালিকের কাছে তত মূল্যবান—অর্থাৎ ব্যবস্থা প্রতিবাদকেও নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে। এই উপলব্ধি শুধু মোরগের গল্প নয়—তা ঔপনিবেশিক ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমালোচনা, যেখানে শোষিতের শ্রম, এমনকি তার প্রতিবাদও শোষকের ভোজে পরিণত হয়। গদ্যছন্দের ব্যবহার কবিতাটিকে গল্প-বলার স্বাভাবিকতা দিয়েছে; কোনো ছন্দের বাধা ছাড়াই কবি যেন একটি ছোটোগল্প শোনাচ্ছেন। ভাষা সরল, বর্ণনাধর্মী, কিন্তু প্রতিটি বাক্যে ব্যঙ্গের ছুরি লুকিয়ে আছে। ‘বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে’—এই বৈপরীতেই ফুটে উঠেছে শোষণের চিত্র: প্রাচুর্যের মধ্যে দারিদ্র্য। কবিতাটি পড়ার পর পাঠকের মনে যে তিক্ত হাসি ফোটে, তাই এর সার্থকতা—সুকান্ত প্রমাণ করেছেন, ব্যঙ্গও হতে পারে প্রতিবাদের শক্তিশালী অস্ত্র। ছোটো পরিসরে বড়ো বক্তব্য—এই কবিতা বাংলা গদ্যকবিতার একটি মডেল। এই কবিতার ব্যঙ্গের ধরনটিও লক্ষণীয়—সুকান্ত কোথাও সরাসরি মালিককে গালি দেননি, কোথাও ‘শোষণ’ শব্দটি উচ্চারণও করেননি; তিনি শুধু ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন—আর ঘটনার ভেতর থেকেই ব্যঙ্গ ফুটে উঠেছে। এই সংযমই ব্যঙ্গকে তীক্ষ্ণ করেছে; পাঠক নিজেই উপসংহার টানেন, আর সেই উপসংহারই সবচেয়ে আঘাত করে। মোরগটির ‘প্রতিবাদ’—সুতীক্ষ্ণ চিৎকার, খাবারের জন্য লড়াই—পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হয়, এই তো ঠিক; কিন্তু শেষে যখন জানা যায় এই প্রতিবাদই তাকে ‘নির্বাচিত’ করেছে জবাইয়ের জন্য, তখন পাঠকের হাসি তিক্ত হয়ে যায়। এই তিক্ততাই কবিতার সার্থকতা। কবিতাটি মঞ্চে পাঠের জন্যও অত্যন্ত উপযোগী—গল্প-বলার ভঙ্গি, চমক-সমাপ্তি—শ্রোতারা শেষ পংক্তি শুনে চমকে ওঠেন। ‘ছাড়পত্র’ কাব্যের অন্যান্য ব্যঙ্গকবিতার সঙ্গে এই কবিতা মিলে সুকান্তকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গকবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে—মাত্র একুশ বছরের জীবনে যা বিস্ময়কর।
শোষণ ও বঞ্চনা, প্রতিবাদের পরিণতি, শ্রেণিবৈষম্য, ব্যঙ্গ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত—ছন্দের বাঁধন না থাকায় এটি ছোটোগল্পের মতো স্বাভাবিকভাবে এগিয়েছে। এর শিল্পকৌশল ‘চমক-সমাপ্তি’ (twist ending)—শেষ দুই পংক্তিতে পুরো কাহিনির অর্থ উল্টে যায়। মোরগ, প্রাসাদ, খাবার টেবিল—প্রতিটি বস্তু এখানে প্রতীকী: মোরগ শোষিত শ্রেণি, প্রাসাদ শোষক শ্রেণি, টেবিল ভোগের ব্যবস্থা। বর্ণনা সংক্ষিপ্ত কিন্তু চিত্রধর্মী—‘ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদা’, ‘ধব্ধপে সাদা দামী কাপড়’—এই বৈপরীত্যেই শ্রেণিচিত্র ফুটে উঠেছে। ভাষা সরল ও গদ্যধর্মী; ব্যঙ্গ কখনো সরাসরি নয়—তা লুকিয়ে আছে ঘটনার স্বাভাবিক বর্ণনার ভেতরে, যা একে আরও তীক্ষ্ণ করেছে। চমক-সমাপ্তির কৌশলটি ছোটোগল্পের—বিশেষত মোপাসাঁ-ধাঁচের গল্পের—ঐতিহ্য বহন করে; কবিতায় এই কৌশলের প্রয়োগ বাংলা গদ্যকবিতায় নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। পাঠক শেষ পংক্তিতে পৌঁছে পুরো কবিতা নতুন করে পড়তে বাধ্য হন—এই ‘পুনর্পাঠের’ বাধ্যবাধকতাই কবিতাটির শৈল্পিক সাফল্য।
১৯৪৭ সালে ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত এই কবিতা সুকান্তের মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। তিনি দেখেছিলেন, ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় দরিদ্র মানুষকে ‘আশ্রয়’ ও ‘কাজ’ দেওয়ার নামে কীভাবে শোষণ করা হয়—চা-বাগানের কুলি, কলকারখানার শ্রমিক, গৃহভৃত্য—সবার জীবনেই এই ‘মোরগের’ পরিণতি। ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের পর বাংলার গ্রামে-শহরে এই শোষণের চিত্র আরও নগ্ন হয়ে ওঠে। সুকান্তের ব্যঙ্গকবিতাগুলো (‘ছাড়পত্র’ কাব্যের অনেক কবিতাই) এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। গদ্যকবিতা হিসেবে এই রচনা বাংলা কবিতায় নতুন ধারার—রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতার পর সুকান্ত তাকে দিয়েছেন রাজনৈতিক ধার। মাত্র একুশ বছরের জীবনে সুকান্ত যে পরিণত ব্যঙ্গবোধের পরিচয় দিয়েছেন, এই কবিতা তার প্রমাণ। রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতার ঐতিহ্য থেকে সুকান্ত শিখেছিলেন ছন্দমুক্তির কৌশল; কিন্তু তাতে তিনি যোগ করেন রাজনৈতিক ব্যঙ্গের ধার—যা বাংলা কবিতায় ছিল নতুন।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”