ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
অ্যান্ডারসনের রূপকথাকে আধুনিক রাজনৈতিক ব্যঙ্গে রূপ দিয়েছেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ‘সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে’—ক্ষমতার চারপাশে স্তাবকদের ভিড় আর সত্য বলার সাহস হারানোর এই চিত্র আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে।— নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ‘উলঙ্গ রাজা’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
অ্যান্ডারসনের রূপকথার রাজা নেমে এসেছেন বাস্তবের রাস্তায়। সবাই দেখছে রাজা উলঙ্গ, তবু সবাই হাততালি দিচ্ছে—কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়, কেউ বুদ্ধি বন্ধক দিয়েছে। গল্পে ছিল একটি সত্যবাদী শিশু; কিন্তু বাস্তবে সেই শিশুটিকে আর দেখা যাচ্ছে না। কবির আহ্বান—শিশুটিকে খুঁজে আনো, যাতে সে হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে জিজ্ঞাসা করতে পারে: 'রাজা, তোর কাপড় কোথায়?' ক্ষমতা ও স্তাবকতার বিরুদ্ধে চিরায়ত ব্যঙ্গ।
‘উলঙ্গ রাজা’ হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বিখ্যাত রূপকথার আধুনিক রাজনৈতিক পাঠ। গল্পটা সবাই জানে—দুই ঠগ রাজাকে বোকা বানিয়ে অদৃশ্য পোশাক বিক্রি করে; সবাই ভয়ে প্রশংসা করে; শেষে একটি শিশু চিৎকার করে বলে, রাজা উলঙ্গ। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই গল্পকে টেনে এনেছেন বাস্তবের রাস্তায়—‘নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায়।’ এই এক পংক্তিতেই রূপকথা হয়ে উঠেছে সমসাময়িক ব্যঙ্গ। কবিতার শুরুতে স্তাবকদের একটি নিখুঁত তালিকা আছে। ‘কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়; কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে; কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক’—ক্ষমতার চারপাশে ভিড়-করা মানুষের এই শ্রেণীবিভাগ এত নিখুঁত যে প্রতিটি যুগের পাঠক নিজের সময়ের স্তাবকদের চিনতে পারেন। ‘নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক’ দেওয়া—এই চিত্রকল্পটি বিশেষভাবে তীক্ষ্ণ; বুদ্ধিজীবীদের আত্মবিক্রয়ের এর চেয়ে ভালো বর্ণনা আর হয় না। কিন্তু কবিতার আসল মোড় আসে মাঝখানে। গল্পে শুধু স্তাবক ছিল না—‘একটি শিশুও ছিল। সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু।’ এই শিশুই সত্যের প্রতীক—যে ভয় পায় না, যে স্বার্থের হিসাব করে না, যে শুধু চোখে যা দেখে তাই বলে। কিন্তু বাস্তবের রাস্তায় নেমে কবি দেখেন, সেই শিশুটিকে আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ‘শিশুটি কোথায় গেল?’—এই প্রশ্নই কবিতার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। সত্য কি হারিয়ে গেছে? তাকে কি ‘পাহাড়ের গোপন গুহায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে’? নাকি সে ‘ঘুমিয়ে পড়েছে’? কবিতার সমাপ্তি একটি আহ্বানে—‘যাও, তাকে যেমন করেই হোক খুঁজে আনো।’ কবি শুধু শোক করেন না; তিনি কর্মের ডাক দেন। শিশুটিকে ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে সে ‘এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে জিজ্ঞাসা’ করতে পারে: ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ এই শেষ প্রশ্নে ‘তোর’ সম্বোধন লক্ষণীয়—রাজার প্রতি আর সম্মান নেই, আছে তীব্র অবজ্ঞা। ১৯৭১ সালে লেখা এই কবিতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক, কারণ প্রতিটি যুগেই উলঙ্গ রাজা থাকেন, আর প্রতিটি যুগেই প্রয়োজন হয় সেই শিশুটির। কবিতাটির নাটকীয় কাঠামোও প্রশংসনীয়—শুরুতে বর্ণনা, মাঝে প্রশ্ন, শেষে আহ্বান; পাঠককে নীরব দর্শক থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ‘যাও, তাকে যেমন করেই হোক খুঁজে আনো’—এই নির্দেশ পাঠকের প্রতিও; কবি চান পাঠক নিজেই সেই শিশুটিকে খুঁজে বের করুন—নিজের ভেতরে, সমাজের ভেতরে। এই অংশগ্রহণমূলক সমাপ্তিই কবিতাটিকে শুধু পড়ার বিষয় থেকে করণীয়ের বিষয়ে পরিণত করেছে।
ব্যঙ্গ, ক্ষমতা, সত্য, স্তাবকতা, সাহস
রূপকথার আধুনিক পাঠ—পরিচিত গল্পকে সমসাময়িক ব্যঙ্গে রূপান্তর। স্তাবকদের শ্রেণীবিভাগ (‘সংস্কার, ভয়, বুদ্ধি বন্ধক...’) ব্যঙ্গের নিখুঁত তালিকা। ‘শিশুটি কোথায় গেল’—প্রশ্নে সত্যের অন্তর্ধান। সমাপ্তি আহ্বানধর্মী—কবি শুধু বর্ণনা দেন না, কর্মের ডাক দেন। ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’—সম্মানহীন সম্বোধনে চরম অবজ্ঞা।
১৯৭১ সালে ‘উলঙ্গ রাজা’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত। অ্যান্ডারসনের ১৮৩৭ সালের রূপকথা ‘দ্য এম্পারর’স নিউ ক্লোদস’-এর আধুনিক পাঠ। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (১৯২৪–২০১৮) ছিলেন সাংবাদিক-কবি; ক্ষমতার স্বরূপ তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন। ব্যঙ্গ-কবিতার এই ধারা বাংলা সাহিত্যে সুকুমার রায়ের ঐতিহ্য বহন করে।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”