ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘অবনী বাড়ি আছো’ বাংলা আধুনিক কবিতার সবচেয়ে রহস্যময় নাগরিক-কবিতাগুলোর একটি। বৃষ্টিভেজা রাতে ঘুমন্ত পাড়ায় কে যেন ডেকে ফেরে—’অবনী বাড়ি আছো?’—এই প্রশ্ন নগর-জীবনের একাকিত্ব ও অস্তিত্বের অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অবনী বাড়ি আছো
দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া— শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ‘অবনী বাড়ি আছো’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
বর্ষণমুখর রাতে ঘুমন্ত পাড়ায় একটি রহস্যময় ডাক—'অবনী বাড়ি আছো?' বৃষ্টি পড়ে বারোমাস, মেঘ গাভীর মতো চরে, দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া; শুধু কবি জেগে শুনছেন রাতের কড়ানাড়া। অবনী কে—বন্ধু, প্রেমিকা, না কবির নিজেরই প্রতিচ্ছবি—কবি বলেন না। এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিতে নগর-জীবনের একাকিত্ব ও অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা ধরা আছে।
‘অবনী বাড়ি আছো’ বাংলা আধুনিক কবিতার সবচেয়ে রহস্যময় সৃষ্টিগুলোর একটি। কবিতাটি একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়, প্রশ্ন দিয়েই শেষ হয়—মাঝে কোনো উত্তর নেই। ‘অবনী বাড়ি আছো?’—কে জিজ্ঞেস করছে, কাকে জিজ্ঞেস করছে, কেন জিজ্ঞেস করছে—কবি কিছুই বলেন না। এই অনিশ্চয়তাই কবিতার শক্তি; প্রতিটি পাঠক নিজের মতো করে এই প্রশ্নের অর্থ খুঁজে নেন। কবিতার পটভূমি এক বর্ষণমুখর রাতের নগর। ‘বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস’—এই পংক্তিতে কলকাতার চিরবর্ষণময় বিষণ্ণতা ধরা আছে। ‘এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে’—মেঘকে গাভীর সঙ্গে তুলনা করা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের চিত্রকল্প-প্রতিভার নিদর্শন; আকাশের মেঘ যেন মাঠে চরে-বেড়ানো গাভীর পাল—পরিচিত, অথচ অদ্ভুত। ‘দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া, কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া’—পুরো পাড়া ঘুমিয়ে আছে, শুধু কবি জেগে আছেন, আর শুনছেন কড়ানাড়ার শব্দ। এই বৈপরীত্য—ঘুমন্ত নগর বনাম জাগ্রত কবি—আধুনিক নাগরিক-একাকিত্বের নিখুঁত চিত্র। সবাই ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু কবির ঘুম আসে না; তিনি শুনছেন এমন একটি ডাক যা হয়তো কেউ ডাকছে না। ‘অবনী’ কে? এই প্রশ্নের উত্তর কবি দেননি, সমালোচকরাও নিশ্চিত নন। কেউ বলেন অবনী এক বন্ধু, কেউ বলেন প্রেমিকা, কেউ বলেন অবনী কবির নিজেরই আরেক নাম—নিজেকেই ডাকছেন কবি। এই বহুমাত্রিকতাই কবিতাটিকে টিকিয়ে রেখেছে; প্রতিটি পাঠক নিজের ‘অবনী’কে খুঁজে পান এই কবিতায়—যাকে ডাকা যায়, কিন্তু যার সাড়া পাওয়া যায় না। কবিতার গঠন সংগীতময়। ‘অবনী বাড়ি আছো’ পংক্তির পুনরাবৃত্তি যেন একটি ধুয়া—লোকগানের মতো বারবার ফিরে আসে। এই পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে আবৃত্তি-যোগ্য করেছে; মঞ্চে এই কবিতা পাঠ করলে শ্রোতারা যেন নিজেরাই সেই রাতের পাড়ায় হাঁটছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বোহেমিয়ান জীবন—রাত জাগা, বৃষ্টিতে ভেজা, বন্ধুদের দরজায় কড়া নাড়া—এই কবিতার প্রতিটি পংক্তিতে জীবন্ত। এটি শুধু কবিতা নয়, একটি জীবনযাপনের দলিল। কবিতাটির দার্শনিক গভীরতাও কম নয়। ‘অবনী বাড়ি আছো?’—এই প্রশ্ন আসলে অস্তিত্বের প্রশ্ন: আমরা কি সত্যিই ‘বাড়ি’ আছি? না কি সবাই ঘুমিয়ে আছি, দুয়ার এঁটে? নগর-জীবনে মানুষ শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকেও মানসিকভাবে অনুপস্থিত—এই আধুনিক বিচ্ছিন্নতাই কবিতার মূল বিষয়। ‘আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী’—কবি নিজেও পুরোপুরি উপস্থিত নন; তার হৃদয় আধখানা, আর তিনি দূরে চলে গেছেন। এই আত্ম-স্বীকারোক্তিই কবিতাটিকে শুধু পর্যবেক্ষণ থেকে উন্নীত করে আত্ম-অন্বেষণে পরিণত করেছে।
নগর, রাত, একাকিত্ব, রহস্য, বৃষ্টি
প্রশ্ন-কাঠামো—কবিতাটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু, প্রশ্ন দিয়েই শেষ; উত্তরহীনতাই এর দর্শন। পুনরাবৃত্তি (‘অবনী বাড়ি আছো’) ধুয়ার মতো সংগীত তৈরি করে। চিত্রকল্প অভিনব: ‘মেঘ গাভীর মতো চরে’, ‘পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস’। রাত-বৃষ্টি-ঘুমের ত্রিবেণীতে নাগরিক-একাকিত্বের চিত্র। ভাষা সহজ, কিন্তু রহস্যময়।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের (১৯৩৩–১৯৯৫) নাগরিক-কবিতার ধারায় রচিত; ১৯৬০–৭০-এর কলকাতার পটভূমি। হাংরি আন্দোলন-পরবর্তী বাংলা কবিতায় নগর, রাত ও একাকিত্বের নতুন ভাষা তৈরি করছিলেন শক্তি। তার বোহেমিয়ান জীবনযাপন—রাত জাগা, বৃষ্টিতে ভেজা—এই কবিতার প্রতিটি পংক্তিতে জীবন্ত।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”