মূল কন্টেন্টে যান

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি

কবিতা সম্পর্কে

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৭৯) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী কবিতাগুলোর একটি। এই কবিতায় কবি তার পূর্বপুরুষ — সাধারণ বাঙালি মানুষের — শ্রম ও সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসের কথা বলেন, যা একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণ করে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।

— আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ থেকে উদ্ধৃত

স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবি ঘোষণা করেন — তিনি কিংবদন্তির কথা বলছেন, তার পূর্বপুরুষের কথা বলছেন। এই পূর্বপুরুষ কোনো দূর অতীতের রাজা নন; তিনি সেই সাধারণ বাঙালি, যিনি মাটি কর্ষণ করেছেন, বীজ বুনেছেন, ঘাম ঝরিয়ে এই বাংলার সভ্যতা গড়েছেন। একের পর এক চিত্রকল্পে কবি তুলে ধরেন সেই শ্রমজীবী পূর্বপুরুষের জীবন — যার ঘামে উর্বর এই মাটি, যার সংগ্রামে টিকে আছে এই জাতি। কবিতাটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঘোষণা: বাঙালির শিকড় হাজার বছরের শ্রম ও সংগ্রামে প্রোথিত, কোনো ভাসমান জনগোষ্ঠী সে নয়।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৭৯) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী ঘোষণাগুলোর একটি। কবিতার শুরুতেই কবি ঘোষণা করেন — তিনি কিংবদন্তির কথা বলছেন, অর্থাৎ এমন কথা যা ইতিহাসের গণ্ডি পেরিয়ে পুরাণের মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু এই কিংবদন্তি কোনো দূর অতীতের রাজা-মহারাজের নয়; এটি তার পূর্বপুরুষের — সাধারণ বাঙালি মানুষের — কথা। কবি তার পূর্বপুরুষের বর্ণনা দেন একের পর এক চিত্রকল্পে: যে পূর্বপুরুষ কর্ষণ করেছে মাটি, বুনেছে বীজ, গড়েছে সভ্যতা — যার ঘামে এই বাংলার মাটি উর্বর। এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে কবি একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণ করেন: বাঙালি কোনো ভাসমান জনগোষ্ঠী নয়, তার শিকড় হাজার বছরের শ্রম ও সংগ্রামে প্রোথিত। কবিতাটি লেখা হয় মুক্তিযুদ্ধের পরের দশকে, যখন সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশ নিজের পরিচয় খুঁজছিল। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির ইতিহাসকে খণ্ডিত করে দেখানো হয়েছিল; ওবায়দুল্লাহ সেই খণ্ডিত ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, গৌরবময় অতীতের কথা বলেন। কবিতার ভাষা গদ্যছন্দের কাছাকাছি, কিন্তু ভেতরে আছে মহাকাব্যিক বিস্তার — একের পর এক চিত্র যেন ইতিহাসের পাতা উল্টে যায়। 'কিংবদন্তি' শব্দটি এখানে দ্ব্যর্থক: একদিকে এটি গৌরবের, অন্যদিকে এটি সতর্কবাণীও — কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া মানে বর্তমান থেকে দূরে সরে যাওয়া; কবি চান, এই গৌরব বর্তমানের প্রেরণা হোক। কবিতাটি বাংলাদেশের স্কুল-কলেজের পাঠ্যে স্থান পেয়েছে, আবৃত্তির মঞ্চে নিয়মিত শোনা যায়; কারণ প্রতিটি প্রজন্মেরই নিজের শিকড়ের কথা শোনা দরকার। ওবায়দুল্লাহ দেখিয়েছেন, জাতীয়তাবাদী কবিতা শুধু যুদ্ধের ডাক নয় — তা হতে পারে আত্মপরিচয়ের গভীর অনুসন্ধান। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪–১৯৮৮) ছিলেন একাধারে কবি, সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তা; মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তার কবিতায় জাতীয়তাবাদী চেতনার গভীর ছাপ রেখেছে। 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম-কবিতা হিসেবে এই রচনা বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে; ফলে প্রতিটি স্কুলপড়ুয়া বাঙালি শিশুর মুখে এই পংক্তি শোনা যায়। কবিতাটির ভাষা নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে বিতর্কও আছে — কেউ কেউ বলেন, 'পূর্বপুরুষের গৌরব' নিয়ে এই উচ্ছ্বাস ইতিহাসের জটিলতাকে সরল করে দেখে। কিন্তু কবিতার কাজ ইতিহাস লেখা নয়; কবিতার কাজ প্রেরণা দেওয়া। ওবায়দুল্লাহর কৃতিত্ব, তিনি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে — কৃষক, জেলে, তাঁতিকে — কিংবদন্তির নায়ক করেছেন; রাজা-মহারাজের ইতিহাসের বাইরে এই প্রথম সাধারণ মানুষের ইতিহাস কবিতায় এত মর্যাদা পেল। এই গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই কবিতাটিকে চিরস্থায়ী করেছে।

প্রধান ভাব ও বার্তা

জাতীয়তাবাদ, ইতিহাস, পূর্বপুরুষ, আত্মপরিচয়

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটি গদ্যছন্দের কাছাকাছি মুক্তছন্দে রচিত, কিন্তু ভেতরে মহাকাব্যিক বিস্তার — একের পর এক চিত্রকল্পে ইতিহাসের পাতা উল্টে যায়। 'আমি...কথা বলছি' — এই ঘোষণাধর্মী পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে দিয়েছে বক্তৃতার তেজ। শ্রমজীবী পূর্বপুরুষের চিত্রায়ণে বাস্তববাদী চিত্রকল্পের ব্যবহার। 'কিংবদন্তি' শব্দের দ্ব্যর্থক প্রয়োগ — গৌরব ও সতর্কবাণী একসঙ্গে। ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে জাতীয় ইতিহাসে উত্তরণ — এই স্কেল-বদলই কবিতাটির শিল্পকৌশল।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯৭৯ সালে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সময় বাংলাদেশ স্বাধীনতার আট বছর পেরিয়েছে; জাতি তখন নিজের ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবছিল। পাকিস্তান আমলে বাঙালির ইতিহাসকে খণ্ডিত ও বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছিল; মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কবিরা সেই ক্ষত সারানোর কাজে নামেন। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪–১৯৮৮) ছিলেন সেই প্রজন্মের অন্যতম প্রধান কবি; এই কবিতা তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবিতার ক্যাননে স্থায়ী আসন দেয়।

সম্পর্কিত কবিতা

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।