মূল কন্টেন্টে যান

তপসে মাছ

কবিতা

কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়।
গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়॥

মানুষের দৃশ্য নও বাস কর নীরে।
মোহন মণির প্রভা ননীর শরীরে॥

পাখি নও কিন্তু ধর মনোহর পাখা।
সমধুর মিষ্ট রস সব-অঙ্গে মাখা॥

একবার রসনায় যে পেয়েছে তার।
আর কিছু মুখে নাহি ভাল লাগে তার॥

দৃশ্য মাত্র সর্বগাত্র প্রফুল্লিত হয়।
সৌরভে আমোদ করে ত্রিভুবনময়॥

প্রাণে নাহি দেরি সয় কাঁটা আঁশ বাছা।
ইচ্ছা করে একেবারে গালে দিই কাঁচা॥

অপরূপ হেরে রূপ পুত্রশোক হরে।
মুখে দেওয়া দূরে থাক গন্ধে পেট ভরে॥

কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা।
টপাটপ খেয়ে ফেলি ছাঁকাতেলে ভাজা॥

না করে উদর যেই তোমায় গ্রহণ।
বৃথায় জীবন তার বৃথায় জীবন॥

নগরের লোক সব এই কয় মাস।
তোমার কৃপায় করে মহা সুখে বাস॥

কবিতার সারসংক্ষেপ

দশটি পয়ার-যুগ্মে তপসে মাছের স্তুতি। কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায় — গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়। মানুষের দৃশ্য নয় সে, বাস করে নীরে; মোহন মণির প্রভা ননীর শরীরে। পাখি নয়, কিন্তু ধরে মনোহর পাখা; সমধুর মিষ্ট রস সব অঙ্গে মাখা। একবার রসনায় যে পেয়েছে তার স্বাদ, আর কিছু মুখে ভালো লাগে না তার। দৃশ্যমাত্রে সর্বগাত্র প্রফুল্লিত হয়; সৌরভে আমোদ করে ত্রিভুবনময়। কাঁটা-আঁশ বাছতে প্রাণে দেরি সয় না — ইচ্ছা করে একেবারে কাঁচাই গালে দিই। অপরূপ রূপ হেরে পুত্রশোক হরে; মুখে দেওয়া দূরে থাক, গন্ধেই পেট ভরে। কুড়ি দরে কিনে লই তাজা তাজা দেখে; ছাঁকাতেলে ভেজে টপাটপ খেয়ে ফেলি। যে উদর তাকে গ্রহণ করে না, তার জীবন বৃথা — বৃথায় জীবন। নগরের লোক এই কয় মাস তার কৃপায় মহাসুখে বাস করে।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২–১৮৫৯) বাংলা কবিতায় 'সংবাদ প্রভাকর'-যুগের প্রাণপুরুষ — সাংবাদিক, রসিক, সমাজ-সমালোচক। 'তপসে মাছ' তাঁর সেই রসিক সত্তার নিখুঁত নিদর্শন, যেখানে একটি মাছের বন্দনায় কবি প্রায় দেবস্তুতির ভঙ্গি এনেছেন। প্রথমেই নাম-শ্লেষ: 'তপসে' মাছের গালভরা গোঁফ-দাড়ি 'তপস্বীর প্রায়' — মাছ ও তপস্বীর এই অপ্রত্যাশিত তুলনায় হাস্যরসের উৎস। কিন্তু কবিতা শুধু রসিকতা নয়; এটি বাঙালির মৎস্য-সংস্কৃতির কাব্যিক দলিল। 'একবার রসনায় যে পেয়েছে তার, আর কিছু মুখে নাহি ভাল লাগে তার' — ভোজনরসিক বাঙালির সর্বজনীন অভিজ্ঞতার সূত্রবদ্ধ প্রকাশ। অতিশয়োক্তির ধারাবাহিক ব্যবহার — 'অপরূপ হেরে রূপ পুত্রশোক হরে', 'মুখে দেওয়া দূরে থাক গন্ধে পেট ভরে', 'সৌরভে আমোদ করে ত্রিভুবনময়' — স্তোত্র-সাহিত্যের ভঙ্গিকে খাদ্য-বন্দনায় প্রয়োগ করে কবি পবিত্র-অপবিত্রের সীমানা ভেঙে দেন; এখানেই ঈশ্বর গুপ্তের গণতান্ত্রিক রসবোধ। 'না করে উদর যেই তোমায় গ্রহণ, বৃথায় জীবন তার বৃথায় জীবন' — পংক্তিটি প্রায় ধর্মীয় অনুশাসনের সুরে বলে, তপসে না খাওয়া জীবনই বৃথা। পয়ারের সরল, গানের মতো চালে কবিতাটি মুখে মুখে ফেরার যোগ্য — 'সংবাদ প্রভাকর'-এর পাঠক, অর্থাৎ সাধারণ শহুরে বাঙালি, এই কবিতায় নিজের রসনার জয়গান শুনতে পেয়েছিল। উনিশ শতকের মধ্যভাগে, যখন বাংলা কবিতা সংস্কৃত-ঘেঁষা গাম্ভীর্য থেকে বেরিয়ে আসছে, ঈশ্বর গুপ্ত দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ বিষয়কে কবিতার মর্যাদা দেন — 'তপসে মাছ' সেই আন্দোলনের স্মরণীয় ফসল। ঈশ্বর গুপ্তের খাদ্য-বিষয়ক কবিতা শুধু 'তপসে মাছ'ই নয় — তাঁর কবিতায় পাঁঠার মাংস, মিষ্টান্ন, পানও এসেছে; ভোজনকে তিনি কবিতার বিষয় করার সাহস দেখিয়েছিলেন যখন 'উচ্চ' সাহিত্য এসবকে তুচ্ছ জ্ঞান করত। 'সংবাদ প্রভাকর'-এর পাঠক ছিল শহুরে মধ্যবিত্ত — দোকানদার, কেরানি, ছাত্র; তাদের রসনার কথা তাদেরই ভাষায় বলায় ঈশ্বর গুপ্ত জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠেন। পয়ারের ঐতিহ্যও এখানে প্রাসঙ্গিক — পয়ার বাংলা কবিতার প্রাচীনতম প্রচলিত ছন্দ, মঙ্গলকাব্য থেকে লোকগীতি পর্যন্ত এর বিস্তার; ঈশ্বর গুপ্ত এই লোক-ছন্দকে শহুরে রসিকতায় প্রয়োগ করে ছন্দকেও গণতান্ত্রিক করেন। 'কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা' — বাজারের এই বাস্তবতা কবিতায় ঢুকে পড়ায় 'তপসে মাছ' হয়ে ওঠে সমাজ-দলিলও — উনিশ শতকের কলকাতার বাজার-দর, খাদ্যাভ্যাসের সাক্ষ্য। আর 'নগরের লোক সব এই কয় মাস তোমার কৃপায় করে মহা সুখে বাস' — মরসুমি মাছের এই উদযাপনে বাঙালির ঋতু-চেতনার প্রকাশ; বর্ষার ইলিশের মতো শীতের তপসেও বাঙালি জীবনের ঋতু-উৎসব।

প্রধান ভাব ও বার্তা

রসিকতা, বাঙালি ভোজন-সংস্কৃতি, দৈনন্দিন জীবন

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

দশটি পয়ার-যুগ্মে রচিত; স্তোত্র-ভঙ্গিতে খাদ্য-বন্দনা। 'তপসে/তপস্বী' নাম-শ্লেষে হাস্যরস। ধারাবাহিক অতিশয়োক্তি — 'পুত্রশোক হরে', 'গন্ধে পেট ভরে'। গানের মতো সরল চাল — মুখে মুখে ফেরার যোগ্য।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত — ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। উনিশ শতকের মধ্যভাগে পত্রিকা-কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের যুগে রচিত; সাধারণ পাঠকের রুচি ও দৈনন্দিন জীবনকে কবিতার বিষয় করার আন্দোলনের অংশ। সুনির্দিষ্ট প্রকাশসাল অজ্ঞাত।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।