মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো;
পৃথিবীর বয়সিনী তুমি এক মেয়ের মতন;
কালো চোখ মেলে ওই নীলিমা দেখেছো;
গ্রীক হিন্দু ফিনিশিয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন
শুনেছো ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা-নগরীর গায়ে
কী চেয়েছে? কী পেয়েছে? —গিয়েছে হারায়ে।

বয়স বেড়েছে ঢের নরনারীদের
ঈষৎ নিভেছে সূর্য নক্ষত্রের আলো;
তবুও সমুদ্র নীল; ঝিনুকের গায়ে আলপনা;
একটি পাখির গান কী রকম ভালো।
মানুষ কাউকে চায়— তার সেই নিহত উজ্জ্বল
ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল।

মনে পড়ে কবে এক তারাভরা রাতের বাতাসে
ধর্মাশোকের ছেলে মহেন্দ্রের সাথে
উতরোল বড়ো সাগরের পথে অন্তিম আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রাণে
তবুও কাউকে আমি পারিনি বোঝাতে
সেই ইচ্ছা সঙ্ঘ নয় শক্তি নয় কর্মীদের সুধীদের বিবর্ণতা নয়,
আরো আলো: মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়।

যেন সব অন্ধকার সমুদ্রের ক্লান্ত নাবিকেরা
মক্ষিকার গুঞ্জনের মতো এক বিহ্বল বাতাসে
ভূমধ্যসাগরলীন দূর এক সভ্যতার থেকে
আজকের নব সভ্যতায় ফিরে আসে;
তুমি সেই অপরূপ সিন্ধু রাত্রি মৃতদের রোল
দেহ দিয়ে ভালোবেসে, তবু আজ ভোরের কল্লোল।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবি সুরঞ্জনাকে সম্বোধন করে বলেন—আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো; পৃথিবীর বয়সিনী তুমি এক মেয়ের মতন। তুমি কালো চোখ মেলে নীলিমা দেখেছো; গ্রিক, হিন্দু, ফিনিশীয় সভ্যতার রূঢ় আয়োজন, তিলোত্তমা-নগরীর ফেনিল শব্দ শুনেছো—তারা কী চেয়েছিল, কী পেয়েছিল, সব হারিয়ে গেছে। নরনারীদের বয়স বেড়েছে, সূর্য-নক্ষত্রের আলো ঈষৎ নিভেছে; তবু সমুদ্র নীল, ঝিনুকের গায়ে আলপনা, পাখির গান ভালো। মানুষ আজ কাউকে চায়—নিহত উজ্জ্বল ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল হিসেবে। কবির মনে পড়ে, এক তারাভরা রাতে ধর্মাশোকের ছেলে মহেন্দ্রের সঙ্গে বড়ো সাগরের পথে অন্তিম আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি কাউকে বোঝাতে পারেননি যে তার ইচ্ছা সঙ্ঘ নয়, শক্তি নয়—শুধু ‘মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়’। শেষে কবি দেখেন, অন্ধকার সমুদ্রের ক্লান্ত নাবিকেরা ভূমধ্যসাগরলীন দূর সভ্যতা থেকে আজকের নব সভ্যতায় ফিরে আসছে; আর সুরঞ্জনা—সেই অপরূপ সিন্ধু-রাত্রি—দেহ দিয়ে ভালোবেসেও আজ ভোরের কল্লোল।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘সুরঞ্জনা’ কবিতাটি জীবনানন্দের ইতিহাস-চেতনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। সুরঞ্জনা কে? কবিতা পড়ে মনে হয়, তিনি কোনো একক নারী নন; তিনি ‘পৃথিবীর বয়সিনী’—মানব-সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে চলে আসা চিরন্তন নারী-সত্তা। গ্রিক, হিন্দু, ফিনিশীয়—তিনটি প্রাচীন সভ্যতার নামোল্লেখে কবি সময়কে হাজার হাজার বছর পেছনে নিয়ে যান; ‘তিলোত্তমা-নগরী’ (তিলোত্তমা—পুরাণের অপ্সরা, এখানে নগর-সভ্যতার প্রতীক) যেন সমস্ত নগর-সভ্যতার প্রতিমা। ‘কী চেয়েছে? কী পেয়েছে?—গিয়েছে হারায়ে’—এই তিনটি প্রশ্নে সভ্যতার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থতার সারসংক্ষেপ। দ্বিতীয় স্তবকে কবি বর্তমানে ফেরেন: বয়স বেড়েছে, আলো নিভেছে—কিন্তু প্রকৃতি অটুট (‘তবুও সমুদ্র নীল’)। ‘মানুষ কাউকে চায়—তার সেই নিহত উজ্জ্বল ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল’—এই পংক্তিদ্বয় গভীর দার্শনিক: আধুনিক মানুষ ঈশ্বরকে হারিয়েছে (‘নিহত উজ্জ্বল ঈশ্বর’—কি চমৎকার বৈপরীত্য!), আর সেই শূন্যতা পূরণে সে খুঁজছে মানবিক প্রেম। তৃতীয় স্তবকটি আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি—ধর্মাশোকের ছেলে মহেন্দ্রের সঙ্গে সমুদ্রযাত্রা (বৌদ্ধ-ইতিহাসের ইঙ্গিত) আসলে কবির নিজের আধ্যাত্মিক যাত্রার রূপক। ‘সেই ইচ্ছা সঙ্ঘ নয় শক্তি নয়’—কবি প্রত্যাখ্যান করেন সংগঠিত ধর্ম ও ক্ষমতার পথ; তার চাওয়া শুধু ‘মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়’—এই পংক্তিটি জীবনানন্দের সমগ্র কাব্যদর্শনের সার। শেষ স্তবকে ইতিহাস বৃত্তাকারে ফেরে: প্রাচীন সভ্যতার ক্লান্ত নাবিকেরা আজকের সভ্যতায় ফিরে আসছে—ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত। আর সুরঞ্জনা—‘দেহ দিয়ে ভালোবেসে, তবু আজ ভোরের কল্লোল’—তিনি প্রেম দিয়েছেন, কিন্তু নিজে রয়ে গেছেন অধরা, ভোরের কল্লোলের মতো। এই অ-প্রাপ্তিই কবিতার রোমান্টিক বেদনা। ভাষা ঘন, চিত্রকল্পে ইতিহাস ও পুরাণের স্তর; ‘ভূমধ্যসাগরলীন দূর এক সভ্যতা’—এমন যৌগশব্দ জীবনানন্দের নিজস্ব সৃষ্টি। কবিতাটির নাম-প্রতিমা ‘সুরঞ্জনা’ নিয়ে অনেক জল্পনা হয়েছে—তিনি কি কোনো বাস্তব নারী, না কল্পনা? গবেষকদের মতে, সুরঞ্জনা জীবনানন্দের কবিতায় বারবার ফিরে আসা ‘চিরন্তন নারী’দের একজন—বনলতা সেন, সুচেতনা, সুদর্শনা, শঙ্খমালার মতো। প্রতিটি নামে কবি নারী-সত্তার একটি দিক তুলে ধরেছেন; সুরঞ্জনায় সেই দিক হলো ইতিহাস-বাহিতা। ‘পৃথিবীর বয়সিনী তুমি এক মেয়ের মতন’—এই পংক্তিতে বয়স ও যৌবনের যে বৈপরীত্য, তা-ই কবিতার রহস্য: সুরঞ্জনা প্রাচীন, তবু চির-নবীন। কবিতার ছন্দ ও ধ্বনি লক্ষণীয়—‘তুমি সেই অপরূপ সিন্ধু রাত্রি মৃতদের রোল / দেহ দিয়ে ভালোবেসে, তবু আজ ভোরের কল্লোল’—এখানে ‘রোল’ ও ‘কল্লোল’-এর ধ্বনি-মিল কবিতাকে সংগীতময় করেছে। ‘মৃতদের রোল’—মৃতদের কোলাহল—এই চিত্রকল্পে ইতিহাসের ভয়াবহতা; আর ‘ভোরের কল্লোল’—নতুন দিনের আশা। সুরঞ্জনা এই দুয়ের মাঝে সেতু। দার্শনিকভাবে কবিতাটি বলে, সভ্যতা বদলায়, সাম্রাজ্য পড়ে, কিন্তু মানবিক প্রেমের আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়—আর সেই আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক নারী। এই বার্তা আজকের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পৃথিবীতেও সমান প্রাসঙ্গিক।

প্রধান ভাব ও বার্তা

ইতিহাস-চেতনা, সভ্যতা, প্রেম, নারী-সত্তা, সময়

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটি মুক্তছন্দে রচিত; চারটি স্তবকে ইতিহাস-বর্তমান-স্মৃতি-ভবিষ্যৎ—সময়ের চারটি স্তর বিন্যস্ত। চিত্রকল্পে পুরাণ ও ইতিহাসের মিশ্রণ: গ্রিক-হিন্দু-ফিনিশীয় সভ্যতা, তিলোত্তমা-নগরী, ধর্মাশোকের ছেলে মহেন্দ্র, ভূমধ্যসাগরলীন সভ্যতা। সম্বোধনধর্মী কাঠামো (‘সুরঞ্জনা, আজো তুমি…’) কবিতাকে ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ করেছে। ‘নিহত উজ্জ্বল ঈশ্বর’—বৈপরীত্যমূলক বিশেষণের ব্যবহারে দার্শনিক গভীরতা। যৌগশব্দ (‘পৃথিবীর বয়সিনী’, ‘ভূমধ্যসাগরলীন’) কবির ভাষা-উদ্ভাবনার নিদর্শন। শেষ পংক্তির ‘ভোরের কল্লোল’ ধ্বনি ও অর্থের অপূর্ব মিলন।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯৫২ সালে সিগনেট প্রেস থেকে ‘বনলতা সেন’-এর পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়—প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। প্রথম সংস্করণের (১৯৪২) ১২টি কবিতার সঙ্গে আরো ১৮টি কবিতা যোগ হয়ে মোট ৩০টি হয়; ‘সুরঞ্জনা’, ‘সুদর্শনা’, ‘সুচেতনা’—এই ‘সেন’-ত্রয়ীর দুটি এই সংস্করণেই প্রথম গ্রন্থিত হয়। এই সময়ে জীবনানন্দ ইতিহাস ও সভ্যতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবছিলেন—‘মহাপৃথিবী’ (১৯৪৪) পর্বের সেই চিন্তারই ধারাবাহিকতা এই কবিতায়। দেশভাগ-পরবর্তী বাংলায় সভ্যতার সংকট নিয়ে কবির এই ভাবনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সম্পর্কিত কবিতা

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।