মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

ভোর;
আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল:
চারিদিকের পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ।
একটি তারা এখনও আকাশে রয়েছে:
পাড়াগাঁর বাসরঘরে সব চেয়ে গোধূলি-মদির মেয়েটির মতো;
কিংবা মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে-মুক্তা আমার নীল মদের গেলাসে রেখেছিলো
হাজার-হাজার বছর আগে এক রাতে— তেম্নি—
তেম্নি একটি তারা আকাশে জ্বলছে এখনও।

হিমের রাতে শরীর ‘উম্’ রাখবার জন্য দেশোয়ালীরা সারারাত মাঠে আগুন জ্বেলেছে—
মোরগ ফুলের মতো লাল আগুন;
শুকনো অশ্বত্থপাতা দুমড়ে এখনও আগুন জ্বলছে তাদের;
সূর্যের আলোয় তার রং কুঙ্কুমের মতো নেই আর;
হ’য়ে গেছে রোগা শালিকের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো।
সকালের আলোয় টলমল শিশিরে চারিদিকের বন ও আকাশ ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে।

ভোর;
সারারাত চিতাবাঘিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে-বাঁচিয়ে
নক্ষত্রহীন, মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে-ঘুরে
সুন্দর বাদামী হরিণ এই ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিলো।

এসেছে সে ভোরের আলোয় নেমে;
কচি বাতাবী লেবুর মতো সবুজ সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খাচ্ছে;
নদীর তীক্ষ্ণ শীতল ঢেউয়ে সে নামলো—
ঘুমহীন ক্লান্ত বিহ্বল শরীরটাকে স্রোতের মতো একটা আবেগ দেওয়ার জন্য;
অন্ধকারের হিম কুঞ্চিত জরায়ু ছিঁড়ে ভোরের রৌদ্রের মতো একটা বিস্তীর্ণ উল্লাস পাবার জন্য;
এই নীল আকাশের নিচে সূর্যের সোনার বর্শার মতে জেগে উঠে
সাহসে সাধে সৌন্দর্যে হরিণীর পর হরিণীকে চমক লাগিয়ে দেবার জন্য।

একটা অদ্ভুত শব্দ।
নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল।
আগুন জ্বললো আবার— উষ্ণ লাল হরিণের মাংস তৈরি হ’য়ে এলো।
নক্ষত্রের নিচে ঘাসের বিছানায় ব’সে অনেক পুরানো শিশিরভেজা গল্প;
সিগারেটের ধোঁয়া;
টেরিকাটা কয়েকটা মহিষের মাথা;
এলোমেলো কয়েকট বন্দুক— হিম– নিঃস্পন্দ নিরপরাধ ঘুম।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবিতার শুরুতে এক অপূর্ব ভোরের বর্ণনা—আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল, পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ, আকাশে এখনও জ্বলছে একটি তারা। হিমের রাতে দেশোয়ালীরা আগুন জ্বেলেছে; সকালের আলোয় শিশিরে বন ও আকাশ ময়ূরের ডানার মতো ঝিলমিল করছে। এই ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিল একটি সুন্দর বাদামী হরিণ—সারারাত চিতাবাঘিনীর হাত থেকে বেঁচে সে এখন নদীর শীতল ঢেউয়ে নামছে, সবুজ ঘাস খাচ্ছে, ভোরের রৌদ্রের মতো উল্লাস পেতে চায়। কিন্তু হঠাৎ ‘একটা অদ্ভুত শব্দ’—গুলি! নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে যায়। আগুন জ্বলে ওঠে আবার—এবার হরিণের মাংস রান্নার জন্য। শেষে শিকারীরা নক্ষত্রের নিচে ঘাসের বিছানায় বসে গল্প করে, সিগারেট খায়—‘হিম– নিঃস্পন্দ নিরপরাধ ঘুম’। সৌন্দর্যের এই নির্মম হত্যাই কবিতার কেন্দ্রীয় বক্তব্য।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘শিকার’ কবিতার গঠন এক নিখুঁত নাটকীয় বক্ররেখা অনুসরণ করে—শান্তি, প্রত্যাশা, আঘাত, আর শেষে নির্লিপ্ততা। প্রথম দুটি স্তবকে কবি ভোরের যে চিত্র আঁকেন, তা বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ প্রকৃতি-বর্ণনার অন্তর্গত: ‘আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল’—এই উপমায় রঙের সঙ্গে প্রাণের স্পর্শ মিশে আছে। ‘মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে-মুক্তা আমার নীল মদের গেলাসে রেখেছিলো হাজার-হাজার বছর আগে’—এই পংক্তিতে ব্যক্তিগত স্মৃতি ইতিহাসের গভীরে প্রসারিত হয়েছে; জীবনানন্দের ইতিহাস-চেতনার এটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবকে হরিণের চিত্র—সে শুধু একটি প্রাণী নয়, সে প্রকৃতির নিরীহ সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি। ‘অন্ধকারের হিম কুঞ্চিত জরায়ু ছিঁড়ে ভোরের রৌদ্রের মতো একটা বিস্তীর্ণ উল্লাস’—জন্ম-প্রতিমার এই ব্যবহারে হরিণের ভোর যেন নতুন জন্মের প্রত্যাশা। আর তারপর মাত্র তিনটি শব্দে সব ভেঙে যায়: ‘একটা অদ্ভুত শব্দ।’ এই আকস্মিকতা কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল—পাঠকও হরিণের মতোই অপ্রস্তুত। ‘নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল’—রক্তের বর্ণনায়ও কবি ফুলের উপমা ব্যবহার করেছেন; এই সৌন্দর্য-মিশ্রিত বীভৎসতা কবিতাটিকে আরো মর্মস্পর্শী করে। শেষ স্তবকটি সবচেয়ে নির্মম—শিকারীরা ‘নক্ষত্রের নিচে ঘাসের বিছানায় ব’সে’ গল্প করে, ‘সিগারেটের ধোঁয়া’ ওড়ায়; হত্যার পর তাদের ‘নিঃস্পন্দ নিরপরাধ ঘুম’—এই ‘নিরপরাধ’ শব্দটি তীব্র ব্যঙ্গে বিদ্ধ। কবি কোথাও সরাসরি নিন্দা করেননি; শুধু দৃশ্যটি দেখিয়েছেন। আর এই নিস্পৃহতাই প্রতিবাদকে আরো তীব্র করেছে। দার্শনিক স্তরে কবিতাটি সভ্যতা বনাম প্রকৃতির চিরন্তন দ্বন্দ্বের রূপক—মানুষের ‘সভ্য’ আনন্দের জন্য প্রকৃতির নিরীহ সৌন্দর্যকে বলি হতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে লেখা এই কবিতায় সমকালীন হিংসার ছায়াও পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ‘শিকার’ প্রমাণ করে, জীবনানন্দের প্রকৃতি-প্রেম শুধু সৌন্দর্য-উপাসনা নয়; তাতে আছে নৈতিক বেদনা ও প্রতিবাদের সুর। কবিতাটির প্রতীকী স্তর আরও গভীরে নিয়ে যায়। হরিণ এখানে শুধু হরিণ নয়—সে নিরীহ সৌন্দর্য, নিরপরাধ আনন্দ, প্রকৃতির কবিত্বের প্রতীক। আর শিকারী? তারা ‘সভ্য’ মানুষ—যাদের হাতে বন্দুক, মুখে সিগারেট, মনে কোনো অনুশোচনা নেই। ‘টেরিকাটা কয়েকটা মহিষের মাথা’—এই বিবরণে শিকারীদের চরিত্র ফুটে ওঠে: তারা শহুরে, ফ্যাশন-সচেতন, প্রকৃতিকে তারা দেখে শুধু ভোগের বস্তু হিসেবে। কবিতার নৈতিক বক্তব্য কখনো সরাসরি উচ্চারিত হয় না; কবি শুধু দুটি দৃশ্য পাশাপাশি রাখেন—ভোরের হরিণ ও রাতের শিকারী—আর পাঠক নিজেই বিচার করেন। এই ‘দেখানো, না-বলা’র কৌশল আধুনিক কবিতার শ্রেষ্ঠ গুণ। লক্ষণীয়, কবিতায় হরিণের মৃত্যু-মুহূর্ত বর্ণিত হয়নি; শুধু ‘একটা অদ্ভুত শব্দ’ আর তারপর ‘নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল’। এই শূন্যতা—মৃত্যুর বর্ণনা না-থাকা—পাঠকের কল্পনাকে কাজে লাগায়, ফলে বেদনা আরও তীব্র হয়। পরিবেশ-সচেতন আজকের যুগে এই কবিতা নতুন অর্থ পায়—বন্যপ্রাণী হত্যা, প্রকৃতি-ধ্বংসের বিরুদ্ধে এটি এক আগাম প্রতিবাদ। জীবনানন্দ ১৯৪২ সালে যা লিখেছিলেন, তা আজকের পরিবেশ-আন্দোলনের কাব্যিক ভিত্তি হতে পারে।

প্রধান ভাব ও বার্তা

প্রকৃতি, হিংসা ও সভ্যতা, সৌন্দর্যের বিনাশ, নৈতিক বেদনা

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটি গদ্যকবিতার ঢঙে, মুক্তছন্দে রচিত; বাক্যের দৈর্ঘ্যের ওঠানামায় এক ধরনের শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ তৈরি হয়েছে। চিত্রকল্প অত্যন্ত ঘন ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য—রঙ, গন্ধ, স্পর্শ সবই পাঠকের অনুভূতিতে পৌঁছায়। উপমার অভিনবত্ব লক্ষণীয়: ঘাসফড়িঙের দেহের মতো নীল আকাশ, টিয়ার পালকের মতো সবুজ গাছ, মোরগ ফুলের মতো লাল আগুন। ‘একটা অদ্ভুত শব্দ’—এই আকস্মিক বাক্য-ভঙ্গ কবিতার নাটকীয় মোড় ঘোরায়। শেষ স্তবকের সংক্ষিপ্ত, খণ্ডিত বাক্য (‘সিগারেটের ধোঁয়া;’) শিকারীদের নির্লিপ্ততার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ভাষায় সাধু-চলিতের মিশ্রণ জীবনানন্দের নিজস্ব স্বাক্ষর।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯৪২ সাল—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তুঙ্গে, বাংলায় দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ১২টি কবিতার মধ্যে ‘শিকার’ অন্যতম। এই সময়ে জীবনানন্দের কবিতায় প্রকৃতির পাশাপাশি হিংসা ও বিনাশের চিত্রও প্রবল হয়ে উঠছিল। সমালোচকদের মতে, ‘শিকার’-এর হরিণ-হত্যার দৃশ্যে যুদ্ধকালীন হিংসার প্রতিচ্ছবি আছে—সভ্য মানুষের হাতে নিরীহ প্রাণের বলি। কবিতাটি প্রকাশের পর পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগায় এবং বাংলা কবিতায় ‘প্রকৃতি-কবিতা’র ধারণাকে নতুন মাত্রা দেয়।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।