আঠারো বছর বয়স
“কবিতা আঠারাে বছর বয়স কী দুঃসহ স্পর্ধায় নেয় মাথা তােলবার ঝুঁকি, আঠারাে বছর বয়সেই…”
কাজী নজরুল ইসলামের ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ (‘জাতের বজ্জাতি’ গান) বাংলা ভাষায় সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গগুলোর একটি। ধর্মের নামে মানুষে মানুষে ভেদ সৃষ্টিকারীদের কবি ‘জাত-জালিয়াত’ বলে অভিহিত করেছেন—যারা মানুষের বিশ্বাস নিয়ে জুয়া খেলে। আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যেকোনো আহ্বানে এই গান স্মরণ করা হয়।
জাতের নামে বজ্জাতি সব
জাত-জালিয়াত খেলছ জুয়া।— কাজী নজরুল ইসলাম, ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
গানটির মূল বক্তব্য—ধর্মের নামে যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করা হয়, তা 'বজ্জাতি', অর্থাৎ দুর্বৃত্তপনা। যারা জাতের দোহাই দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ ঘটায়, তারা 'জাত-জালিয়াত'—প্রতারক, যারা ধর্মকে পুঁজি করে জুয়া খেলে। কবির প্রশ্ন—ধর্ম কি মানুষকে ভাগ করার জন্য, না মিলানোর জন্য? যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে দাঙ্গা বাধায়, তারা ধর্মের সেবক নয়, ধর্মের শত্রু। সংক্ষেপে, এটি অসাম্প্রদায়িক মানবতার গান—মানুষের মৌলিক ঐক্যের পক্ষে, কৃত্রিম বিভেদের বিরুদ্ধে।
'জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছ জুয়া'—বাংলা ভাষায় সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে এর চেয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আর হয় না। নজরুলের এই গানটি ('জাতের বজ্জাতি') তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার সবচেয়ে খাঁটি প্রকাশগুলোর একটি। এখানে তিনি ধর্মের নামে মানুষে মানুষে ভেদ সৃষ্টিকারীদের 'জাত-জালিয়াত' বলে অভিহিত করেছেন—যারা জালিয়াতি করে, প্রতারণা করে, জুয়া খেলে মানুষের বিশ্বাস নিয়ে। গানটির শক্তি এর সরলতায়। নজরুল কোনো দার্শনিক তত্ত্ব দেন না; তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন—ধর্ম কি মানুষকে ভাগ করার জন্য, না মিলানোর জন্য? যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে দাঙ্গা বাধায়, মসজিদ-মন্দির ভাঙে, মানুষ মারে—তারা কি ধর্মের সেবক, না ধর্মের শত্রু? এই প্রশ্নগুলো আজও, একশো বছর পরেও, সমান জরুরি। ভারতভাগ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি—প্রতিটি সংকটের সময় এই গান নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। নজরুলের এই অবস্থানের মূলে ছিল তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা। তিনি দেখেছিলেন, ধর্মীয় বিভেদ কীভাবে সাধারণ মানুষের দুঃখ বাড়ায় আর শাসকদের সুবিধা করে দেয়। 'সাম্যবাদী' কাব্যের 'মানুষ' কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—'গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান'। 'জাতের নামে বজ্জাতি' সেই সাম্যের গানেরই আরেক রূপ—এখানে লক্ষ্য ধর্মীয় গোঁড়ামি। গানটির সুর ও ভাষা লোকায়ত—সহজ, সরাসরি, মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ার মতো। নজরুল ইচ্ছে করেই কঠিন ভাষা এড়িয়েছেন; তিনি চেয়েছিলেন এই বার্তা পৌঁছে যাক খেটে-খাওয়া মানুষের কাছে, যারা সাম্প্রদায়িকতার সবচেয়ে বড়ো শিকার। 'বজ্জাতি' শব্দটি নিজেই লোকভাষার—মার্জিত সাহিত্যিক ভাষায় এর অনুবাদ হয় না; এর ঝাঁঝই এর অর্থ। আজকের বাংলাদেশ ও ভারতে যখনই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা মাথাচাড়া দেয়, তখনই এই গানটি স্মরণ করা হয়। এটি প্রমাণ করে, নজরুল শুধু তাঁর যুগের কবি নন—তিনি ভবিষ্যতেরও কবি। ধর্মের নামে ভেদাভেদ যতদিন থাকবে, 'জাতের নামে বজ্জাতি' ততদিন গাওয়া হবে। নজরুলের এই অসাম্প্রদায়িকতার মূলে ছিল তাঁর নিজের জীবন-সাধনা। তিনি একদিকে লিখেছেন ইসলামী হামদ ও নাত ('ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ'), অন্যদিকে শ্যামাসংগীত ও কীর্তন ('বল রে জবা বল')—বাংলা সাহিত্যে তিনিই একমাত্র কবি, যিনি দুই ধর্মের ভক্তিসংগীতে সমান দক্ষ। এই সাধনা তাঁকে দিয়েছিল নৈতিক অধিকার—তিনি কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে বলেননি; বলেছেন ধর্মের নামে প্রতারণার বিরুদ্ধে। 'জাতের নামে বজ্জাতি' তাই কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের গান নয়; এটি সব মানুষের গান—যারা বিশ্বাস করে, স্রষ্টা সবার, আর সৃষ্টিকে কৃত্রিমভাবে ভাগ করা মহাপাপ।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবতা, ব্যঙ্গ
ব্যঙ্গাত্মক গান; 'বজ্জাতি', 'জাত-জালিয়াত'—লোকভাষার তীক্ষ্ণ শব্দচয়নে আক্রমণের ঝাঁঝ। সরাসরি প্রশ্ন ও সম্বোধনে শ্রোতাকে চিন্তায় বাধ্য করা। সুর ও ভাষা লোকায়ত—মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ার উপযোগী। 'সাম্যবাদী'র 'মানুষ' কবিতার ভাবধারার সঙ্গে সুরের মিল—নজরুলের অসাম্প্রদায়িক দর্শনের সংগীত-রূপ।
নজরুল-গীতি হিসেবে প্রচলিত ('জাতের বজ্জাতি' নামে)। নজরুলের যুগে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ ছিল ব্রিটিশ 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতির হাতিয়ার; এই পটভূমিতে তাঁর অসাম্প্রদায়িক রচনাগুলো ছিল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। 'সাম্যবাদী' (১৯২৫) কাব্যের 'মানুষ' কবিতার—'গাহি সাম্যের গান'—ভাবধারারই ধারাবাহিকতা এই গানে। ভারতভাগ ও পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সংকটগুলোর সময় এই গান বারবার স্মরণ করা হয়েছে।
“কবিতা আঠারাে বছর বয়স কী দুঃসহ স্পর্ধায় নেয় মাথা তােলবার ঝুঁকি, আঠারাে বছর বয়সেই…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের ‘মানুষ’ (১৯২৫) মানবিক সাম্যের সবচেয়ে দৃপ্ত ঘোষণাগুলোর একটি। ‘সাম্যবাদী’…”
“কবিতা ভূতের মতন চেহারা যেমন, নির্বোধ অতি ঘোর। যা-কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, "কেষ্টা বেটাই…”
“কবিতা গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে মৈত্র মহাশয় যাবে সাগরসঙ্গমে তীর্থস্নান লাগি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান' ('হিন্দু-মুসলমান' কবিতা) বাংলা…”