কেউ কথা রাখেনি
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ ঢাকায় বসে লেখা ‘বন্দী শিবির থেকে’ মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী কবি-স্বীকারোক্তিগুলোর একটি। স্বাধীন দেশের কবিদের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করে শামসুর রাহমান লিখেছেন বন্দী কবির বেদনা—যেখানে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিই নিষিদ্ধ, সেখানে মনের মতো কবিতা লেখার অধিকারও হরণ করা হয়েছে।
ঈর্ষাতুর নই, তবু আমি
তোমাদের আজ বড়ো ঈর্ষা করি।— শামসুর রাহমান, ‘বন্দী শিবির থেকে’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ ঢাকায় বসে কবির স্বীকারোক্তি। স্বাধীন দেশের কবিদের সুখ ও মুক্ত শব্দ-ব্যবহারের প্রতি তার ঈর্ষা হয়—'ঈর্ষাতুর নই, তবু'। বন্দী-শিবিরে মনের মতো শব্দ উচ্চারণ করা যায় না; 'স্বাধীনতা', 'বাংলাদেশ'—এই শব্দগুলো বেআইনি ঘোষিত। অথচ কবি দেখেন, নিষিদ্ধ শব্দটি জ্বলছে সর্বত্র—গাছের পাতায়, পাখির পালকে, নারীর দু’চোখে, বস্তির দুরন্ত ছেলেটার হাতের মুঠোয়। শেষে সংকল্প—শহরের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি বাড়িতে 'স্বাধীনতা' শব্দটি বিশাল অক্ষরে লিখে দেওয়ার।
‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতার প্রথম পংক্তিতেই একটি চমকপ্রদ স্বীকারোক্তি—‘ঈর্ষাতুর নই, তবু আমি তোমাদের আজ বড়ো ঈর্ষা করি।’ কবি একদিকে বলছেন তিনি ঈর্ষাতুর নন, অন্যদিকে স্বীকার করছেন ঈর্ষা করছেন। এই দ্বন্দ্ব, এই সৎ দ্বিধা, কবিতাটিকে অসাধারণ করে তুলেছে। একজন মহৎ কবি এখানে নিজের ক্ষুদ্রতম অনুভূতিটিও লুকোচ্ছেন না; তিনি স্বীকার করছেন, বন্দী অবস্থায় স্বাধীন মানুষের সুখ দেখে তার ঈর্ষা হয়। এই সততাই কবিতার নৈতিক শক্তি। কবিতাটি লেখা ১৯৭১ সালে, পাকিস্তানি দখলদারিত্বের ঢাকায়। কবি তখন ‘বন্দী-শিবিরে’—পুরো দেশটাই তখন বন্দী-শিবির। এই অবস্থায় তিনি ভাবছেন স্বাধীন দেশের কবিদের কথা—যারা ‘যখন যা খুশি মনের মতো শব্দ’ ব্যবহার করতে পারেন, যাদের কবিতা ‘রাজহাঁসের মতো দৃপ্ত ভঙ্গিমায়’ মানুষের কাছে যায়। আর তিনি? ‘মাথা খুঁড়ে মরলেও’ পারছেন না মনের মতো শব্দ উচ্চারণ করতে। কারণ কিছু শব্দকে ‘বেআইনী’ করা হয়েছে—‘ভয়ানক বিস্ফোরক ভেবে’। কোন শব্দ? ‘স্বাধীনতা নামক শব্দটি’। একটি শব্দকে বিস্ফোরক ভাবা—এর চেয়ে বড়ো স্বীকৃতি শব্দের শক্তির আর কী হতে পারে? দখলদাররা বুঝেছিল, ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির মধ্যেই আছে মুক্তির বীজ; তাই তারা শব্দটিকেই নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু কবি দেখিয়ে দেন, নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ—‘গাছের পাতায়, ফুটপাতে, পাখির পালকে কিংবা নারীর দু’চোখে, পথের ধুলায়, বস্তির দুরন্ত ছেলেটার হাতের মুঠোয় সর্বদাই দেখি জ্বলে স্বাধীনতা নামক শব্দটি।’ এই তালিকাটি কবিতার সবচেয়ে সুন্দর অংশ। স্বাধীনতা আর শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়; তা ছড়িয়ে আছে প্রকৃতিতে, মানুষের চোখে, শিশুর মুঠোয়। দখলদাররা শব্দ নিষিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু পাতায়-পালকে জ্বলতে থাকা স্বাধীনতাকে নেভাতে পারে না। কবিতার সমাপ্তি সংকল্পে—কবি ‘স্বাধীনতা নামক শব্দটি’ শহরের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি বাড়িতে ‘বিশাল অক্ষরে’ লিখে দিতে চান। বন্দী কবির এই স্বপ্নই মুক্তির পূর্বাভাস। ‘বন্দী শিবির থেকে’ সংকলনের এই শিরোনাম-কবিতা মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, কারণ এটি যুদ্ধের বর্ণনা দেয় না—দেয় যুদ্ধের ভেতরে আটকে-পড়া একজন কবির আত্মার খবর। কবিতাটির আরেকটি গভীর দিক এর ‘শব্দ-চেতনা’। কবি এখানে শব্দকে দেখেছেন অস্ত্র হিসেবে—যে শব্দ নিষিদ্ধ করা হয়, সেই শব্দই সবচেয়ে শক্তিশালী। ‘প্রকাশ্য রাস্তায় যদি তারস্বরে চাঁদ, ফুল, পাখি এমনকি নারী ইত্যাকার শব্দাবলী করি উচ্চারণ, কেউ করবে না বারণ’—এই পংক্তিতে দখলদারদের ভণ্ডামি উন্মোচিত; নিরীহ শব্দে আপত্তি নেই, আপত্তি শুধু সেই শব্দে যা মানুষকে জাগিয়ে তোলে। এই উপলব্ধিই কবিতাটিকে শুধু যুদ্ধ-কবিতা থেকে উন্নীত করে ভাষা-দর্শনের কবিতায় পরিণত করেছে।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, ভাষা, বন্দিত্ব, প্রতিরোধ
‘ঈর্ষাতুর নই, তবু’—এই দ্বন্দ্বময় স্বীকারোক্তি কবিতার নৈতিক কেন্দ্র। শব্দের তালিকা-কৌশল (‘গাছের পাতায়, ফুটপাতে, পাখির পালকে...’) স্বাধীনতার সর্বব্যাপিতা দেখায়। ‘রাজহাঁসের মতো কবিতা’—উপমায় মুক্ত কবিতার সৌন্দর্য। ভাষা গদ্যছন্দের প্রবাহে, আবেগঘন অথচ সংযত। নিষিদ্ধ শব্দের ধারণা কবিতাটিকে ভাষা-রাজনীতির দলিল করে তুলেছে।
১৯৭১ সালে রচিত, ১৯৭২ সালে ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত। পাকিস্তানি দখলদারিত্বের ঢাকায় অবরুদ্ধ জীবনে বসে লেখা। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে এই কবিতা অনন্য—এটি যুদ্ধের বর্ণনা নয়, বন্দী কবির আত্মার খবর। ‘স্বাধীনতা’ শব্দ নিষিদ্ধ থাকার ঐতিহাসিক সত্য কবিতাটিকে দলিল-মর্যাদা দিয়েছে।
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”