কেউ কথা রাখেনি
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
শামসুর রাহমানের ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক হতাশার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-কবিতা। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় কবি দেখেন, স্বদেশ চলেছে উদ্ভট উটের পিঠে চড়ে মরুভূমির দিকে—’হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়’।
উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।— শামসুর রাহমান, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
শিরোনাম-কবিতায় কবি দেখেন, স্বদেশ চলেছে ‘উদ্ভট উটের পিঠে’ চড়ে ‘বিরানায়’—জনশূন্য প্রান্তরের দিকে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ও ত্যাগ যেন বৃথা যাচ্ছে—‘হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়’। স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক বিপথগামিতা ও স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের আশঙ্কার বিরুদ্ধে এই কবিতা তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও গভীর শোকের মিলন।
‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কবিতার শিরোনামই একটি সম্পূর্ণ ব্যঙ্গ-চিত্র। উট মরুভূমির প্রাণী; তার পিঠে চড়ে স্বদেশ চলেছে ‘বিরানায়’—জনশূন্য প্রান্তরের দিকে। স্বাধীনতার মাত্র এক বছর পর, ১৯৭২ সালে, কবি দেখছেন মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের স্বদেশ ভুল পথে চলেছে। এই একটি চিত্রেই কবিতার সমস্ত বক্তব্য ধরা আছে। ‘হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়’—এই বিলাপ-ধ্বনি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। মুক্তিযুদ্ধ, যে যুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিল, সেই যুদ্ধের ফসল যদি বৃথা যায়, তবে এর চেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? কবির এই ‘হায়’ ধ্বনিতে আছে শোক, ক্ষোভ, আর অসহায়ত্ব—একজন কবি যিনি যুদ্ধ চেয়েছিলেন, স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, কিন্তু পেলেন বিপথগামী স্বদেশ। শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবি-পরিচয় এই কবিতায় চরমে পৌঁছেছে। তিনি আগেও লিখেছিলেন ‘আসাদের শার্ট’, ‘বন্দী শিবির থেকে’—কিন্তু সেগুলো ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে, পরাধীনতার বিরুদ্ধে। এখানে তিনি লিখছেন নিজের স্বাধীন দেশের বিরুদ্ধে—এটা অনেক কঠিন, অনেক বেশি ঝুঁকির কাজ। স্বাধীন দেশের সমালোচনা করা মানে দেশদ্রোহী তকমার ঝুঁকি নেওয়া; কিন্তু কবি সেই ঝুঁকি নিয়েছেন, কারণ তার কাছে সত্য বলাই কবির ধর্ম। কবিতার ব্যঙ্গ-কৌশল লক্ষণীয়। কবি সরাসরি কাউকে আক্রমণ করেন না; তিনি শুধু একটি চিত্র আঁকেন—উদ্ভট উট, তার পিঠে স্বদেশ। পাঠক নিজেই বুঝে নেন, কারা এই উট চালাচ্ছেন। এই পরোক্ষতাই ব্যঙ্গকে শিল্পে উন্নীত করে; সরাসরি গালি হলে তা হতো প্যামফ্লেট, কিন্তু চিত্র হলে তা হয় কবিতা। ১৯৭২-এর প্রেক্ষাপট মনে রাখা জরুরি। সদ্য-স্বাধীন দেশে তখন আশা ও বিশৃঙ্খলা একসঙ্গে; কবি সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তার আশঙ্কা অমূলক ছিল না। এই দূরদৃষ্টিই কবিতাটিকে শুধু সমসাময়িক প্রতিবাদ থেকে উন্নীত করে ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত করেছে। আজও, অর্ধশতাব্দী পরেও, যখনই স্বদেশ ভুল পথে চলে, তখনই এই কবিতার পংক্তি মানুষের মুখে ফিরে আসে। ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’—এই উপমা বাংলা রাজনৈতিক ভাষার স্থায়ী সম্পদ হয়ে গেছে। এটাই মহৎ ব্যঙ্গ-কবিতার লক্ষণ—তা একটি যুগকে ছাড়িয়ে সব যুগের কথা বলে। কবিতাটির ভাষা-শৈলীও লক্ষণীয়—সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ, প্রায় শ্লোগানের মতো; কিন্তু শ্লোগান নয়, কারণ এর ভেতরে আছে কবির ব্যক্তিগত বেদনা। শামসুর রাহমান এই কবিতায় রাগী নন, তিনি শোকাহত; তার ব্যঙ্গের পেছনে আছে ভালোবাসা—স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এই বিলাপ আসত না। এই ভালোবাসা-মিশ্রিত ব্যঙ্গই কবিতাটিকে তিক্ততা থেকে বাঁচিয়েছে। সমালোচকরা এই কবিতাকে শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতার শিখর বলে মনে করেন—এখানে তিনি শুধু প্রতিবাদী নন, ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা।
রাজনীতি, ব্যঙ্গ, স্বদেশ, হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ
শিরোনামেই সম্পূর্ণ ব্যঙ্গ-চিত্র—‘উদ্ভট উটের পিঠে’ স্বদেশের যাত্রা। ‘বিরানা’ (জনশূন্য প্রান্তর) শব্দটি যাত্রার লক্ষ্যহীনতা বোঝায়। ‘হায়, বৃথা যায়’—বিলাপ-ধ্বনির পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে শোকগাথার মর্যাদা দেয়। কবি সরাসরি আক্রমণ না করে চিত্র আঁকেন—এই পরোক্ষতাই ব্যঙ্গকে শিল্পে উন্নীত করে। ভাষা তীক্ষ্ণ, সংক্ষিপ্ত, আঘাতী।
১৯৭২ সালে ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত—স্বাধীনতার পরপর। সদ্য-স্বাধীন দেশে আশার পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা ও হতাশা; কবি সেই হতাশার ভাষা দেন। শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতার ধারায় (‘আসাদের শার্ট’, ‘বন্দী শিবির থেকে’) এই কবিতা নতুন মোড়—এবার সমালোচনার লক্ষ্য নিজের স্বাধীন রাষ্ট্র।
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”