মূল কন্টেন্টে যান
হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম হুমায়ূন আহমেদ
ডাকনাম কাজল
জন্ম ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮
জন্মস্থান কুতুবপুর গ্রাম, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোণা (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)
মৃত্যু ১৯ জুলাই ২০১২, বেলভিউ হাসপাতাল, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
সমাধিস্থল নুহাশ পল্লী, পিরুজালি, গাজীপুর
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, অধ্যাপক
শিক্ষা বগুড়া জিলা স্কুল; ঢাকা কলেজ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসসি, এমএসসি — রসায়ন); পিএইচডি (পলিমার রসায়ন), নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৮২)
উল্লেখযোগ্য কর্ম *নন্দিত নরকে*, *শঙ্খনীল কারাগার*, *হিমু* সিরিজ, *মিসির আলি* সিরিজ, *শুভ্র* সিরিজ, *জোছনা ও জননীর গল্প*, *দেয়াল*; টিভি ধারাবাহিক *এই সব দিন রাত্রি*, *কোথাও কেউ নেই*, *বহুব্রীহি*, *আজ রবিবার*, *নক্ষত্রের রাত*; চলচ্চিত্র *আগুনের পরশমণি*, *শ্যামল ছায়া*, *ঘেটুপুত্র কমলা*
পুরস্কার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), একুশে পদক (১৯৯৪), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সাতবার), বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার

পরিচিতি

হুমায়ূন আহমেদ (১৩ নভেম্বর ১৯৪৮ – ১৯ জুলাই ২০১২) বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক পঠিত লেখকদের একজন। স্বাধীনতার পর বাংলা সাহিত্যের পাঠকসমাজে তার মতো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, এমন লেখক দ্বিতীয়টি নেই বললেই চলে। ১৯৭২ থেকে ২০১২ — চার দশকের লেখকজীবনে তিনি দুই শতাধিক কল্পকাহিনী ও অকল্পকাহিনী গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার প্রায় সবই বাংলাদেশের পাঠকের কাছে বেস্টসেলার হিসেবে পরিচিতি পায়। ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি যেমন সাড়া জাগিয়েছেন, তেমনি টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রেখেছেন গভীর প্রভাব। হিমু, মিসির আলি, শুভ্র ও বাকের ভাইয়ের মতো কাল্পনিক চরিত্রের স্রষ্টা হিসেবে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন, সংকট ও হাস্যরসকে ধারণ করেছেন সাহিত্যের পাতায়।

জন্ম ও শৈশব

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জের কুতুবপুর গ্রামে হুমায়ূন আহমেদের জন্ম। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা ও নিজেও একজন লেখক; মা আয়েশা ফয়েজ। আদর করে তাকে ডাকা হতো “কাজল” নামে। বাবার চাকরির বদলির সুবাদে সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর ও বগুড়াসহ দেশের নানা শহরে কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর।

হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও কিশোরসাহিত্য লেখক এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান; আরেক ভাই আহসান হাবীব খ্যাতিমান কার্টুনিস্ট ও উন্মাদ পত্রিকার সম্পাদক। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ নিহত হন — এই পারিবারিক ট্র্যাজেডি তার পরবর্তী লেখায় মুক্তিযুদ্ধ-চেতনার গভীর ছাপ রেখে গেছে।

শিক্ষাজীবন

বগুড়া জিলা স্কুল থেকে তিনি মাধ্যমিক (এসএসসি) পাস করেন এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়ে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন — দুটোতেই প্রথম শ্রেণী। পিএইচডি গবেষণার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যান এবং ১৯৮২ সালে পলিমার রসায়নে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। রসায়নের অধ্যাপক হয়েও সাহিত্যে এমন বিপ্লব ঘটানো — বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ইতিহাসে এটি বিরল দৃষ্টান্ত।

কর্মজীবন (অধ্যাপনা)

পিএইচডির আগে, ১৯৭৩–৭৪ সাল নাগাদ তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘ প্রায় দুই দশক সেখানে অধ্যাপনা করেন। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি পুরোপুরি লেখালেখি ও চলচ্চিত্র নির্মাণে মনোনিবেশ করেন।

সাহিত্যজীবন

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যযাত্রা শুরু হয় নন্দিত নরকে (১৯৭২) উপন্যাসের মাধ্যমে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী নিয়ে লেখা এই প্রথম উপন্যাসই তাকে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয়। এরপর শঙ্খনীল কারাগার-সহ একের পর এক উপন্যাসে তিনি মুক্তিযুদ্ধ, মধ্যবিত্ত জীবন, গ্রামীণ সমাজ ও নাগরিক অস্তিত্বের গল্প বলে পাঠককে মুগ্ধ করেন।

তার সৃষ্ট তিনটি সিরিজ-চরিত্র বাংলা সাহিত্যে কিংবদন্তিতুল্য:

  • **হিমু** — প্রথম উপন্যাস *ময়ূরাক্ষী* (১৯৯০)। হলুদ পাঞ্জাবি পরা, খালি পায়ে ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো উদাসীন যুবক হিমু — বাবার “মহাপুরুষ বানানোর” অদ্ভুত পরীক্ষার ফসল। যুক্তির বদলে বিশ্বাস ও অন্তর্দৃষ্টিতে চলা এই চরিত্রের প্রায় একুশটি উপন্যাস রয়েছে, যা তরুণ পাঠকদের মধ্যে একধরনের কাল্ট অনুসরণ তৈরি করে।
  • **মিসির আলি** — প্রথম উপন্যাস *দেবী* (জুন ১৯৮৫)। যুক্তিবাদী, অবিশ্বাসী মনোরোগ-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক, যিনি রহস্যময় ঘটনার যৌক্তিক ব্যাখ্যা খোঁজেন। হিমুর ঠিক বিপরীত মেরুর এই চরিত্র পাঠককে ভাবতে শেখায়।
  • **শুভ্র** — নির্মল, স্বচ্ছ মনের তরুণ; তার সিরিজে *শুভ্র*, *এই শুভ্র! এই*-সহ একাধিক বই রয়েছে।

এর বাইরে তার উল্লেখযোগ্য স্বতন্ত্র উপন্যাসের মধ্যে আছে কবি, মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মহাকাব্যিক উপন্যাস), বাদশাহ নামদার (মুঘল সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস) এবং জীবনের শেষ দিকে লেখা দেয়াল (২০১২)। মৃত্যুর আগে নিউইয়র্কের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি দেয়াল রচনা করেন। কিশোরসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, ভ্রমণকাহিনী, আত্মজীবনীমূলক রচনা — সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তার অবদান রয়েছে। একুশে বইমেলায় ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তার বই ছিল সর্বাধিক বিক্রীত। তার বেশ কয়েকটি বই পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতেও তার রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া “দেবী” উপন্যাস অবলম্বনে ২০১৮ সালে দেবী: মিসির আলি প্রথমবার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যা প্রমাণ করে তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো আজও প্রাসঙ্গিক।

চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন

টেলিভিশনে তার অভিষেক ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটক প্রথম প্রহর দিয়ে। এরপর এই সব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, অয়োময়, নক্ষত্রের রাত, আজ রবিবার এবং সর্বোপরি কোথাও কেউ নেই (১৯৯৩–৯৪) — এই ধারাবাহিকগুলো বাংলাদেশের টেলিভিশন-ইতিহাস বদলে দেয়। কোথাও কেউ নেই-এর বাকের ভাই চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূরের অভিনয় এবং নাটকের শেষ পর্ব নিয়ে সারাদেশে যে আলোড়ন তৈরি হয়, তা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণে আসেন তিনি; সব মিলিয়ে আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন — প্রতিটিই তার নিজের উপন্যাস অবলম্বনে। উল্লেখযোগ্য ছবি: শঙ্খনীল কারাগার (১৯৯২), আগুনের পরশমণি (১৯৯৪, প্রথম পরিচালিত ছবি), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), দুই দুয়ারী (২০০০), চন্দ্রকথা (২০০৩), শ্যামল ছায়া (২০০৪), দারুচিনি দ্বীপ (২০০৭) এবং ঘেটুপুত্র কমলা (২০১২)। তার দুটি ছবি — শ্যামল ছায়া ও ঘেটুপুত্র কমলা — অস্কারের সেরা বিদেশি ভাষার ছবি বিভাগে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন হিসেবে পাঠানো হয়। তিনি অসংখ্য গানও লিখেছেন, যেমন “আমি আজ ভেজাবো চোখ সমুদ্রের জলে” ও “চাঁদনী পসর রাইতে”।

ব্যক্তিগত জীবন

১৯৭৬ সালে হুমায়ূন আহমেদ গুলতেকিন খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির তিন কন্যা — নোভা, শীলা ও বিপাশা — এবং এক পুত্র নুহাশ। শীলা আহমেদ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান; নুহাশ হুমায়ূন লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। ২০০৩ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরে তিনি অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন (বিভিন্ন সূত্রে ২০০৪/২০০৫ সাল উল্লেখ আছে)। দ্বিতীয় সংসারে তার দুই পুত্র — নিশাদ ও নিনিত।

গাজীপুরের পিরুজালিতে তিনি নিজের স্বপ্নের ঠিকানা “নুহাশ পল্লী” গড়ে তোলেন — গাছপালা, ভাস্কর্য ও প্রকৃতির মাঝে এই বাড়ি পরবর্তীতে তার স্মৃতিবিজড়িত তীর্থস্থানে পরিণত হয়।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সাহিত্য ও চলচ্চিত্র — দুই অঙ্গনেই হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি:

  • লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩)
  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১)
  • শিশু একাডেমি পুরস্কার
  • জয়নুল আবেদিন স্বর্ণপদক
  • মাইকেল মধুসূদন পদক (১৯৮৭)
  • বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮)
  • হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০)
  • একুশে পদক (১৯৯৪)
  • বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার — সর্বমোট সাতবার (পরিচালনা, চিত্রনাট্য, কাহিনি ও সংলাপ বিভাগে; *আগুনের পরশমণি*, *শঙ্খনীল কারাগার*, *দারুচিনি দ্বীপ*, *ঘেটুপুত্র কমলা*, *অনিল বাগচীর একদিন* ছবির জন্য)
  • মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার (সেরা পরিচালক, ২০১৩ — মরণোত্তর)

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

২০১১ সালে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার কোলনে ক্যানসার ধরা পড়ে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে নেওয়া হয়। প্রায় এগারো মাস ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে) নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে তিনি মারা যান; বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। পরে তার মরদেহ দেশে এনে গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় — টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দিনভর শোকানুষ্ঠান, পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র, আর লাখো পাঠকের অশ্রুসিক্ত বিদায় সাক্ষ্য দেয় তিনি কতটা গভীরভাবে বাঙালির মননে প্রোথিত ছিলেন। ডন পত্রিকা তাকে “বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কিংবদন্তি” আখ্যা দিয়েছিল। আজও প্রতি বছর তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে সারাদেশে স্মরণানুষ্ঠান হয়; হিমু পরিবহণসহ অসংখ্য ভক্তগোষ্ঠী তার স্মৃতি ধরে রেখেছে। বইমেলায় তার বই এখনও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের তালিকায় থাকে — এটাই তার অমরত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

জনপ্রিয় বই

সব বই দেখুন →

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।