বৃষ্টি ও মেঘমালা
বই সম্পর্কে
- বইয়ের নামঃ বৃষ্টি ও মেঘমালা
- লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
- বইয়ের ধরণঃ উপন্যাস
- প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারী ২০০১ (একুশে বইমেলা)
- প্রকাশকঃ পার্ল পাবলিকেশন্স
“ভালোবাসা ও ঘৃণা দুটোই মানুষের চোখে লেখা থাকে” — এই এক বাক্যেই যেন ধরা আছে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস বৃষ্টি ও মেঘমালা-র পুরো ভাবনা। একদিকে পেশাগত সাফল্যের মোহ, অন্যদিকে পরিবারের নীরব ভালোবাসা — এই দুইয়ের টানাপোড়েনে এক ব্যস্ত মানুষের জীবন কীভাবে ভেঙে যায়, সেই মর্মস্পর্শী কাহিনিই এই বই।
বই পরিচিতি
বৃষ্টি ও মেঘমালা হুমায়ূন আহমেদের একটি সামাজিক-পারিবারিক উপন্যাস। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় একুশে বইমেলা ২০০১-এ, পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে। শতাধিক পৃষ্ঠার এই মাঝারি আকারের উপন্যাসে লেখক তুলে ধরেছেন আধুনিক নগরজীবনের এক চেনা সংকট — কাজের চাপে পরিবার থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাওয়া এক পিতার গল্প। এটি হুমায়ূন আহমেদের সেই ধারার লেখা, যেখানে অতিপ্রাকৃত বা রহস্যের ছোঁয়া নেই; আছে শুধু আমাদের চারপাশের খুব চেনা মানুষ আর তাদের খুব চেনা কষ্ট।
কাহিনি সংক্ষেপ
গল্পের কেন্দ্রে হাসান — একজন প্রতিষ্ঠিত ও ব্যস্ত ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। পেশাগত জীবনে তিনি সফল, কিন্তু সেই সাফল্যের মূল্য দিতে হচ্ছে তার পরিবারকে। তার স্ত্রী নাজমা, ছেলে অন্তু আর মেয়ে নীতুকে নিয়ে তার সংসার। অন্তু খুব বাবা-ভক্ত ছেলে — বাবার সান্নিধ্যই তার সবচেয়ে বড় চাওয়া। কিন্তু হাসান কাজের চাপে এতটাই ডুবে থাকেন যে সন্তানদের জন্য তার হাতে সময় নেই বললেই চলে।
হাসানের অফিসে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) হিসেবে কাজ করে লীনা। লীনা হাসানকে অসম্ভব ভয় পায়, আবার মনের গভীরে তাকে পছন্দও করে। লীনার নিজের জীবনেও একটা মোড় আসন্ন — তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে ভাইয়ের বন্ধু ফিরোজের সঙ্গে। লীনার পরিবারে আছে তার মা সুলতানা বেগম আর ছোটবোন বীনা। অফিসের দৈনন্দিন কাজের মাঝে লীনা ধীরে ধীরে হাসানের পারিবারিক জীবনের ফাটলগুলো কাছ থেকে দেখতে পায়।
গল্পে নতুন মোড় আসে ইয়াকুব সাহেবের হাত ধরে। তার মেয়ে শামা ও ছয় বছরের নাতনি এলেন থাকে ভার্জিনিয়ায়। এলেনের জন্মদিনে নাতনিকে চমকে দিতে চান ইয়াকুব সাহেব — যেন সে বাংলাদেশে থেকে যেতে চায়। এজন্য তিনি জয়দেবপুরের শালবনে দুইশ বিঘা জমির উপর গড়ে তুলতে চান এক বিশাল শিশুপার্ক। এই প্রকল্পের দায়িত্ব পান হাসান, অগ্রিম হিসেবে ইয়াকুব সাহেব দেন এক কোটি টাকার চেক। হাসান প্রকল্পের নাম দেন “মায়ানগর”। এই বড় কাজ সফল করতে হাসান ও লীনা পুরোপুরি ডুবে যান — আর ততই হাসান দূরে সরে যান নিজের পরিবার থেকে।
এরই মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে ছোট্ট অন্তু। মৃত্যুর আগে সে বাবাকে কাছে পেতে চেয়েছিল, কিন্তু কাজের ব্যস্ততায় সন্তানের শেষ ইচ্ছাটুকুও পূরণ করতে পারেননি হাসান। ছেলের মৃত্যুর শোক আর স্বামীর প্রতি জমে ওঠা ঘৃণায় নাজমা মেয়ে নীতুকে নিয়ে ভাইয়ের বাসায় চলে যান। সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও হাসান রয়ে যান একেবারে একা — এভাবেই শেষ হয় বৃষ্টি ও মেঘমালা।
প্রধান চরিত্র
- হাসান — উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। প্রতিভাবান ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, কিন্তু কাজের নেশায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এক পিতা। তার ট্র্যাজেডি হলো — সাফল্য তিনি পেয়েছেন, কিন্তু যাদের জন্য সাফল্য, তাদেরই হারিয়েছেন।
- লীনা — হাসানের পিএ ও সেক্রেটারি। বসকে ভয় পাওয়া আর মনে মনে পছন্দ করা — এই দ্বৈত অনুভূতির মাঝে দাঁড়িয়ে সে গল্পের নীরব সাক্ষী। পাঠক অনেকটা তার চোখ দিয়েই হাসানের জীবন দেখে।
- ফিরোজ — লীনার ভাইয়ের বন্ধু, যার সঙ্গে লীনার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। গল্পে সরাসরি কম এলেও লীনার ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতীক হিসেবে তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
- নাজমা — হাসানের স্ত্রী। স্বামীর অবহেলা সহ্য করে এসেছেন দীর্ঘদিন, কিন্তু ছেলের মৃত্যুর পর তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। তার চলে যাওয়াই হাসানের চূড়ান্ত পরাজয়।
- অন্তু ও নীতু — হাসানের ছেলে ও মেয়ে। বাবা-ভক্ত অন্তুর অসুস্থতা ও মৃত্যু গল্পের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ; নীতু মায়ের সঙ্গে চলে যায়।
- ইয়াকুব সাহেব — শিশুপার্ক প্রকল্পের উদ্যোক্তা; তার মেয়ে শামা ও নাতনি এলেনের জন্য এই আয়োজনই হাসানকে আরও গভীরে টেনে নেয় কাজের জগতে।
বিষয়বস্তু ও থিম
উপন্যাসের প্রধান থিম ভালোবাসা বনাম ঘৃণা। হাসানের প্রতি নাজমার ভালোবাসা কীভাবে ধীরে ধীরে ঘৃণায় রূপ নেয়, আর লীনার মনে ভয় ও পছন্দ কীভাবে পাশাপাশি থাকে — লেখক এই সূক্ষ্ম রূপান্তরগুলো খুব যত্নে এঁকেছেন।
দ্বিতীয় বড় থিম কর্মজীবন বনাম পারিবারিক জীবন। হাসান সেই আধুনিক পেশাজীবী মানুষের প্রতিনিধি, যে “পরিবারের জন্যই” কাজ করে, অথচ কাজের অজুহাতেই পরিবারকে সময় দেয় না। এই বৈপরীত্য আজকের পাঠকের কাছে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
তৃতীয় থিম অনুশোচনা — যা আসে সব হারানোর পর। মৃত্যুশয্যায় ছেলের পাশে না থাকার অপরাধবোধ হাসানকে তাড়া করে; কিন্তু তখন আর ফেরার পথ নেই। অনেক পাঠকের মতে, গল্পে মোহ বনাম ভালোবাসার দ্বন্দ্বও আছে — সাফল্যের মোহ যখন ভালোবাসার উপর চাদর ফেলে দেয়, তখন ভালোবাসা হারিয়ে যায়; মোহের চাদর সরে গেলে ফিরে আসে শুধু শূন্যতা।
রচনাশৈলী
এই উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদের স্বভাবসুলভ সরল ও সাবলীল ভাষা পুরোপুরি বজায় আছে। বাক্য ছোট, সংলাপ প্রাণবন্ত — পড়তে পড়তে মনে হয় চোখের সামনে ঘটনা ঘটছে। লেখক দীর্ঘ বর্ণনায় না গিয়ে ছোট ছোট দৃশ্য আর সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রদের মনোজগৎ উন্মোচন করেন। অফিসের ব্যস্ততা, পারিবারিক টানাপোড়েন, শিশুপার্ক প্রকল্পের উত্তেজনা — সবই এগিয়ে চলে সংলাপ-নির্ভর গতিতে। আবেগঘন মুহূর্তগুলোতে লেখক কখনো অতিরঞ্জন করেন না; বরং সংযত ভাষায় এমনভাবে লিখেছেন যে পাঠকের মন নিজে থেকেই ভারী হয়ে ওঠে।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া
পাঠকমহলে বইটি মিশ্র কিন্তু উষ্ণ প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। গুডরিডসে বইটির রেটিং ৩.৭৮ (প্রায় ৯০০ রেটিং ও ৬০-এর বেশি রিভিউ)। অনেক পাঠক বইটিকে “দারুণ” বলেছেন, আবার কেউ কেউ একে “এভারেজ” মানের বলে ৭/১০ রেটিং দিয়েছেন। বেশ কয়েকজন পাঠকের মতে, এই বইয়ের সমাপ্তি হুমায়ূন আহমেদের সেরা ফিনিশিংগুলোর একটি — শেষ দুটি পৃষ্ঠা এত সুন্দরভাবে লেখা যে বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। একজন পাঠকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে — হাসান চরিত্রের মধ্যে লেখক হয়তো একজন সৃষ্টিশীল মানুষের দ্বন্দ্বই রূপায়িত করেছেন, যে তার সৃষ্টিকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখে। বইটির চার পর্বের অডিওবুক সংস্করণও ইউটিউবে পাঠকদের মাঝে জনপ্রিয়।
কাদের পড়া উচিত
যারা হুমায়ূন আহমেদের পারিবারিক ও আবেগঘন উপন্যাস পছন্দ করেন, তাদের জন্য বৃষ্টি ও মেঘমালা অবশ্যপাঠ্য। কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য নিয়ে যারা ভাবেন, বইটি তাদের ভাবাবে। যারা এক বসায় শেষ করার মতো মাঝারি আকারের, মন ছুঁয়ে যাওয়া গল্প খুঁজছেন — তাদের জন্যও এটি চমৎকার পছন্দ। আর হুমায়ূন আহমেদ পড়া শুরু করতে চাওয়া নতুন পাঠকদের জন্য এটি একটি ভালো শুরুর বই হতে পারে।