দেয়াল উপন্যাস
বই সম্পর্কে
- বইয়ের নাম: দেয়াল
- লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
- প্রকাশক: অন্যপ্রকাশ
- মুদ্রিত মূল্য: ৪৫০ টাকা
- বিদ্যা বিচিত্রা মূল্য: ৩১৫ টাকা
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।
বই পরিচিতি
দেয়াল হুমায়ূন আহমেদের চল্লিশ বছরের বর্ণাঢ্য লেখকজীবনের সর্বশেষ উপন্যাস। তিনি এটি রচনা শুরু করেন ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে। রচনার শুরুতে উপন্যাসের পাঁচটি পর্ব ধারাবাহিকভাবে অন্যদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসার চিকিৎসা চলাকালে তিনি নতুন করে এটি রচনায় মনোনিবেশ করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত উপন্যাসটির চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার সুযোগ পাননি। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর ২০১৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় অন্যপ্রকাশ উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে। প্রথম প্রকাশে বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১৯৮ এবং প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন মাসুম রহমান।
এটি একটি ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস — মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এর ভিত্তি। বইটি লেখার ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে লেখা বহু গ্রন্থকে তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন, যার মধ্যে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস রচিত বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ গ্রন্থটি অন্যতম। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরুর রক্তাক্ত পথই এই উপন্যাসের পটভূমি।
কাহিনি সংক্ষেপ
দেয়াল উপন্যাসে দুটি আখ্যান সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলে। একটিতে চপলমতি তরুণী অবন্তিকে কেন্দ্র করে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কাহিনি আবর্তিত হয়; অন্যটিতে উঠে আসে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক বাস্তবতা — হত্যাকাণ্ড, ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার লোভ আর দেশপ্রেমের মুখোমুখি লড়াই।
অবন্তি তার গৃহশিক্ষক শফিকের জীবনকে বদলে দেয়। নিজেকে প্রচণ্ড ভীতু ভাবা শফিক সময়ের পরীক্ষায় সাহসী হয়ে ওঠে — সামরিক শাসনের আতঙ্কময় সময়ে সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুজিব হত্যার বিচার চাই বলে স্লোগান দেয়। ঘটনাক্রমে অবন্তির একজন পীরের ছেলের সঙ্গে বিনা মতে বিয়ে হয়, আর এই ঘটনা তার জীবনে নতুন মোড় আনে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক আখ্যানে ধরা পড়ে ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত বছর — বঙ্গবন্ধুর হত্যা, খন্দকার মোশতাক আহমেদের ক্ষমতাগ্রহণ, কারাগারে চার নেতার হত্যা, সিপাহী বিপ্লব, জিয়াউর রহমানের উত্থান, খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহেরের করুণ পরিণতি। উপন্যাসের সময়রেখা স্বাধীনতাযুদ্ধের একটু আগ থেকে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। ক্ষমতার লোভে আসক্ত মানুষরা একে অন্যের শত্রু হয়ে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে — এই নির্মম সত্যই উপন্যাসের মূল ভাবনার অংশ।
ঐতিহাসিক পটভূমি
দেয়ালের প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ, যখন সদ্য স্বাধীন দেশটি রক্তাক্ত রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। উপন্যাসে উঠে এসেছেন তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানতম রাজনৈতিক চরিত্রেরা — বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল আবু তাহের, মেজর ফারুক, মেজর রশীদ, মেজর ডালিম প্রমুখ।
পাঠকের মনে রাখা জরুরি — দেয়াল ইতিহাসের দলিল নয়, ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস। লেখক বাস্তব ঘটনা ও চরিত্রকে ভিত্তি করে তাঁর সৃজনী ভাবনা দিয়ে আখ্যান গড়েছেন। ইতিহাসের সত্য আর লেখকের কল্পনা — দুইয়ের মিলেই দেয়াল পরিণত হয়েছে একটি হৃদয়গ্রাহী উপাখ্যানে।
প্রধান চরিত্র
অবন্তি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় কাল্পনিক চরিত্র — চঞ্চল, হেয়ালি, অসাধারণ রূপবতী এক তরুণী। তার বাবা নিরুদ্দেশ, মা একজন স্প্যানিশ নারী; ফলে দাদা সরফরাজ খানের কাছেই তার লালনপালন। দাদা তার ব্যাপারে কিছুটা রক্ষণশীল।
শফিক অবন্তির গৃহশিক্ষক — শুরুতে ভীতু ও আত্মবিশ্বাসহীন মনে হলেও সময় তাকে বদলে দেয়; পাঠকের মনে তিনি বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। সরফরাজ খান অভিজ্ঞ ও রক্ষণশীল পিতামহ। পীর হামিদ কুতুবি, হাফেজ জাহাঙ্গীর, ইসাবেলা, ক্যাপ্টেন শামস, মেজর ফারুক, মেজর ইশতিয়াক, মেজর নাসের — প্রতিটি চরিত্রই আখ্যানে নিজ নিজ ভূমিকায় গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ছানু ভাই, রাধানাথ, চা বিক্রেতা কাদের মোল্লা, আওয়ামী লীগার মোজাম্মেল, আন্ধা পীর, শামীম শিকদার, ডোরা রাসনা — এমন বহু ছোট-বড় চরিত্র উপন্যাসকে জীবন্ত করে তুলেছে। লক্ষণীয় যে, লেখক নিজেও উপন্যাসের একটি অংশে নিজের ও পরিবারের সঙ্গে কাহিনির সম্পৃক্ততা উল্লেখ করেছেন।
বিষয়বস্তু ও থিম
দেয়ালের মূল থিম ক্ষমতা ও তার মূল্য। ক্ষমতার লোভ কীভাবে মানুষের মাঝে দেয়াল তুলে দেয় — পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে — তাই উপন্যাসের নামকরণের তাৎপর্য। ব্যক্তিগত জীবনে অবন্তি-শফিকের সম্পর্কেও আছে সামাজিক বাধার দেয়াল, আবার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাজনীতিকদের পারস্পরিক অবিশ্বাসের দেয়াল ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
নৈতিক সাহস আরেকটি বড় থিম। ভীতু শফিকের স্লোগান দেওয়ার মুহূর্তটি দেখায় — সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। চাটুকারিতা, ষড়যন্ত্র আর দেশপ্রেমের সংঘাতও উপন্যাসজুড়ে প্রবলভাবে অনুভূত হয়।
রচনাশৈলী
দেয়াল রচিত হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের স্বভাবসুলভ সহজ-সরল ভাষায় — সংলাপনির্ভর আখ্যান, প্রাণবন্ত চরিত্রায়ণ, হাস্যরস ও করুণার মিশ্রণ। অন্যান্য রচনার মতো এই উপন্যাস পড়ার সময়ও একটি মোহাচ্ছন্নতা কাজ করে। তবে ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস হিসেবে এখানে তাঁর স্বর কিছুটা ভিন্ন — ইতিহাসের ভার আর কল্পনার হালকা মিলনে এক নতুন স্বাদ তৈরি হয়েছে। পাঠকেরা লক্ষ করেছেন, লেখক উপন্যাসটির চূড়ান্ত রূপ দিতে না পারায় শেষের দিকে কিছুটা তাড়াহুড়োর ছাপ রয়ে গেছে — তবু আখ্যানের টান পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া ও গ্রহণযোগ্যতা
দেয়াল হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত উপন্যাসগুলোর একটি। ২০১২ সালের মে মাসে দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে উপন্যাসের দুটি অধ্যায় প্রকাশিত হলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিবরণে তথ্যগত ভুলের অভিযোগ ওঠে; বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং হাইকোর্ট সংশোধনের নির্দেশ দেয়। এটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণে খন্দকার মোশতাক আহমেদের সম্পৃক্ততা উঠে এলেও উপন্যাসে তাঁকে অনভিজ্ঞ দেখানো হয়েছিল। অন্যদিকে সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন — দেয়াল কোনো রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, এটি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস, যেখানে ইতিহাসের খলনায়কদের খলনায়ক হিসেবেই দেখানো হয়েছে। পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদের সংশোধিত পাণ্ডুলিপিই ২০১৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়।
পাঠকমহলে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। অনেকেই লেখকের সাহসের প্রশংসা করেছেন — এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখা সহজ ছিল না। কেউ কেউ রাজনৈতিক অংশগুলোকে ইতিহাসগতভাবে নির্ভুল ও নিরপেক্ষ বলেছেন। আবার সমালোচকদের একাংশ বলেছেন, উপন্যাসটি শেষ না হওয়ায় আখ্যান কিছুটা এলোমেলো ও খাপছাড়া মনে হয়, শেষদিকে তাড়াহুড়ো টের পাওয়া যায়। তবু একটি বিষয়ে পাঠকেরা একমত — বইটি পাঠককে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটতে অনুপ্রাণিত করে।
কাদের পড়া উচিত
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী প্রতিটি পাঠকেরই দেয়াল পড়া উচিত। হুমায়ূন আহমেদের অনুরাগীদের জন্য এটি বিশেষ — চল্লিশ বছরের লেখকজীবনের শেষ সৃষ্টি হিসেবে এতে তাঁর পরিণত শিল্পভাবনার ছাপ রয়েছে। তরুণ প্রজন্ম, যারা ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত অধ্যায় সম্পর্কে খুব কম জানে, তাদের জন্য উপন্যাসটি ইতিহাসের দরজা খুলে দেওয়ার মতো একটি বই। একই সঙ্গে যারা উপন্যাসে গল্পের টান আর চরিত্রের প্রাণ খোঁজেন, তারাও অবন্তি-শফিকের কাহিনিতে মুগ্ধ হবেন।