মূল কন্টেন্টে যান

ম্যাজিক মুনশি

বই সম্পর্কে

  • বই: ম্যাজিক মুনশি
  • লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
  • প্রকাশনী: অন্যপ্রকাশ
  • প্রথম প্রকাশ: ২০০৯
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৮৪
  • মূল্য: ১৭৫৳

বই পরিচিতি

ম্যাজিক মুনশি হুমায়ূন আহমেদের অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত বই (প্রথম প্রকাশ ২০০৯), যেটিকে তিনি নিজেই উপন্যাসের তকমা দিতে রাজি হননি। বইয়ের ভূমিকায় লেখক সরাসরি প্রশ্ন রেখেছেন — এটিকে কি উপন্যাস বলা যাবে? তাঁর যুক্তি ছিল সহজ: উপন্যাস বললে প্রকাশকের সুবিধা হয়, কারণ পাঠকরা উপন্যাস পড়তেই পছন্দ করেন। কিন্তু এই বই কোনো পর্যায়েই ঠিকঠাক ফেলা যায় না। তাঁর নিজের ভাষায়, এটি হলো “রহস্যময়তার বর্ণনা এবং কিছুটা বিশ্লেষণ”। উপন্যাসের কাঠামো তিনি ব্যবহার করেছেন বটে, তবে সেটি শুধু প্রেক্ষাপটের প্রস্তাবনা হিসেবে। বইটি প্রথমে কালের কণ্ঠের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়, পরে গ্রন্থবদ্ধ সংস্করণে কিছুটা বাড়তি অংশ যুক্ত করে অন্যপ্রকাশ থেকে বেরোয়।

বইটি কী নিয়ে

বইটির শুরুতে আছে স্মৃতিকথার ভঙ্গিতে লেখা একটি প্রস্তাবনা, যেখানে লেখক নিজেকে উত্তম পুরুষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ফলে উপন্যাসের চেয়ে আত্মজৈবনিক লেখার স্বাদই বেশি পাওয়া যায়। এই অংশে হুমায়ূন আহমেদের তীক্ষ্ণ রসবোধ স্পষ্ট। এরপর লেখক ঢুকে পড়েন নন-ফিকশনের জগতে — জাদুবিদ্যার ইতিহাস, নানা ম্যাজিকের কৌশল, এর পেছনের গণিত, ধর্মীয় মিথ এবং ব্ল্যাক ম্যাজিক-সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার আলোচনা। জাদুর জগৎটাই যেহেতু রহস্যময় ও জটিল, লেখক যতই সাবলীলভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরুন, বর্ণনার ভাষায়ও সেই জটিলতা ধরা পড়ে। এই অংশগুলোতে উদ্ধৃতি হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছেন কুরআন ও বাইবেলের আয়াত এবং কিছু কবিতার লাইন। সব মিলিয়ে বইটি স্মৃতিকথা ও জাদুবিদ্যা-বিষয়ক বিশ্লেষণী রচনার এক মিশ্রণ — যা বাংলা সাহিত্যে বিরল ধাঁচের।

ম্যাজিক মুনশি — জাদুকরের সাথে পরিচয়

বইয়ের নামক চরিত্র ম্যাজিক মুনশি — একজন জাদুকর। লেখকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র “ঘেটুপুত্র কমলা” নির্মাণের প্রস্তুতির সময়। শুটিংয়ের স্পট দেখার উদ্দেশ্যে লেখক হাওড় অঞ্চলে যাচ্ছিলেন; এই যাত্রার মাঝপথে তাঁর লঞ্চ ঝড়ের প্রকোপে পড়ে, আর সেই ঘটনাচক্রেই ম্যাজিক মুনশির সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। বইয়ের ফ্ল্যাপে এই প্রথম সাক্ষাতের একটি মনোহর বর্ণনা আছে — দরজায় অনুমতি নিয়ে দাঁড়ানো একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ, মুখভর্তি দাড়িগোঁফ, মাথায় গ্রামের বয়াতিদের মতো লম্বা চুল, পরনে সবুজ পাঞ্জাবি আর ধবধবে সাদা লুঙ্গি, পায়ে বিশেষ ধরনের খড়ম। এই অংশটুকুতে লেখকের পর্যবেক্ষণ-দক্ষতা আর রসবোধ দুটোই ধরা পড়ে। পরিচয়ের পর ম্যাজিক মুনশির কয়েকটি ম্যাজিক দেখা আর তাঁর মুখে শোনা ম্যাজিকের গল্প থেকেই বইয়ের মূল আলোচনার সূত্রপাত।

জাদুর কৌশল ও মনস্তত্ত্ব

বইয়ের মূল অংশ জুড়ে আছে জাদুর কৌশল আর তার পেছনের মনস্তত্ত্বের আলোচনা। পাঠক এখানে দৃষ্টিভ্রান্তি বা মিসডাইরেকশনের মতো ধারণার সঙ্গে উদাহরণসহ পরিচিত হবেন — জাদুকর আসলে দর্শকের দৃষ্টি কোথায় নিয়ে যান, কীভাবে মনোযোগের ফাঁক গলিয়ে কৌশল সম্পন্ন করেন। আলোচনায় এসেছে ভারতবর্ষের বিখ্যাত রোপ ট্রিক — অর্থাৎ দড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সেই কিংবদন্তি কৌশল — যাকে আসল ম্যাজিকের পর্যায়ে ফেলা যায় কিনা, সে নিয়ে বিভিন্ন বই পড়ে নানা লেখকের যুক্তি তিনি উদ্ধৃত করেছেন। পাশাপাশি লেখকদের মনস্তাত্ত্বিক পরিধি ও ক্ষমতা নিয়েও তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ আছে। বইয়ের ভূমিকায় তিনি পাঠককে সতর্কও করেছেন: কৃষ্ণশক্তি আহবানের মতো বিষয়ের ধারেকাছেও যেন কেউ না যান। তাঁর যুক্তি — মানবমস্তিষ্ক সাজেশনের (পরামর্শ-প্রভাবের) কাছে সহজেই বশীভূত হয়, আর ট্রান্স অবস্থায় মস্তিষ্কের বিচিত্র কার্যকলাপের দিকে যেতে পারে; অকারণে হ্যালুসিনেশনের শিকার হওয়া বিরাট মূর্খামি হবে।

সাহিত্য-প্রসঙ্গ

ম্যাজিক মুনশির একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো এর সাহিত্য-প্রসঙ্গগুলো। এই বইতেই হুমায়ূন আহমেদ বর্ণনা করেছেন কীভাবে তাঁর “হিমুর আছে জল” উপন্যাস লেখা শুরু হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে তিনি শরৎচন্দ্রের “শ্রীকান্ত” উপন্যাসের একটি অংশ উদ্ধৃত করেছেন — দেখিয়েছেন, কীভাবে বড় লেখকের লেখা তাঁর নিজের লেখার জন্মমুহূর্তে অনুপ্রেরণা বা প্রতিধ্বনি হয়ে কাজ করে। ব্ল্যাক ম্যাজিক ও ডাইনি-বিষয়ক আলোচনায় তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলা সাহিত্যে ডাইনিদের নিয়ে উল্লেখযোগ্য লেখা একটাই আছে — তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের “ডাইনি”। পাঠকের কৌতূহল মেটাতে বইয়ের গ্রন্থবদ্ধ সংস্করণের শেষ অংশে তিনি পাদটীকা হিসেবে “ডাইনি” গল্পটিই সংযোজিত করে দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, কালের কণ্ঠের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত মূল লেখায় এই বাড়তি অংশ ছিল না। এক আলোচকের মন্তব্য অনুযায়ী, এই সংযোজনের ফলে বই ৬৯ পৃষ্ঠা থেকে বেড়ে ৮৬ পৃষ্ঠা হয়েছে — যদিও এর পেছনে প্রকাশকের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

রচনাশৈলী ও পাঠ-অভিজ্ঞতা

শুরুর প্রস্তাবনা অংশে হুমায়ূন আহমেদের চেনা সাবলীল গদ্য আর রসবোধ পুরোমাত্রায় আছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ বলে এই অংশ পড়তে স্বস্তি লাগে। কিন্তু নন-ফিকশন বিশ্লেষণের অংশে বিষয়ের জটিলতা ভাষাতেও ধরা পড়েছে; যারা কেবল হুমায়ূন আহমেদের গল্প-উপন্যাস পড়ে অভ্যস্ত, তাদের কাছে কিছু অংশ কঠিন ঠেকতে পারে। সম্ভবত এই কারণেই পাঠক-প্রতিক্রিয়া বেশ বিভক্ত। রকমারিতে বইটির রেটিং ৩২ জনের মূল্যায়নে ৪.৬৩ — অনেকের কাছে এটি রহস্যজনক ও জ্ঞানগর্ভ মনে হয়েছে, আবার কেউ কেউ বলেছেন লেখক দু’বার পড়তে বললেও একবার পড়ার পর আর ফিরতে ইচ্ছে করেনি। কেউ আবার মনে করেছেন ম্যাজিকের গল্পগুলো কিছুটা অতিরঞ্জিতভাবে টেনে বড় করা হয়েছে। লেখক নিজেও ভূমিকায় বলেছেন, প্রথম পাঠের অস্পষ্ট বিষয়গুলো দ্বিতীয় পাঠে স্পষ্ট হতে পারে — অর্থাৎ বইটি ধীরে, ভেবে পড়ার বই।

কাদের পড়া উচিত

এই বই পড়ার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি — এটি কোনো ফিকশন বা উপন্যাস নয়। যারা শুধু হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে উপন্যাসই আশা করেন, তাদের এই বই ভালো নাও লাগতে পারে; তাঁর “বৃক্ষকথা” বইয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল বলে একজন আলোচক উল্লেখ করেছেন। কিন্তু যাদের জাদুবিদ্যা, রহস্যময়তা, মিথ কিংবা ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ আছে, অথবা যারা হুমায়ূন আহমেদের নন-ফিকশন লেখার ভক্ত, তাদের জন্য “ম্যাজিক মুনশি” মনোরঞ্জনও করবে, জ্ঞানপিপাসাও মেটাবে। লেখকের অনুরোধ মেনে বইটি দু’বার পড়লে প্রথমবারের অস্পষ্টতা দ্বিতীয়বারে কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

 

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।