মূল কন্টেন্টে যান

কেউ কথা রাখেনি

কবিতা সম্পর্কে

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর একটি। তেত্রিশ বছরের জীবনে পাওয়া প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের হিসাব — বোষ্টমী, মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী, বাবা, বরুণা — কেউ কথা রাখেনি। ষাটের দশকের শেষে রচিত এই কবিতা আজও প্রতিটি প্রজন্মের পাঠকের নিজের গল্প বলে মনে হয়।

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল

— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘কেউ কথা রাখেনি’ থেকে উদ্ধৃত

স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবিতাটি একটি তালিকা — জীবনের বিভিন্ন পর্বে যারা কথা দিয়েছিল, কিন্তু রাখেনি। ছেলেবেলায় এক বোষ্টমী আগমনী গান থামিয়ে বলেছিল, শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে — সে আর এলো না। মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হলে তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবে — সে প্রতিশ্রুতিও রইল অপূর্ণ। বাবা কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, 'দেখিস, একদিন, আমরাও…' — বাবা এখন অন্ধ, কিছুই দেখা হলো না। আর বরুণা — বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে যে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে-ও কথা রাখেনি। কবিতা শেষ হয় সেই বিখ্যাত পংক্তিতে — 'কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!'

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

'কেউ কথা রাখেনি' কবিতার অমরত্বের রহস্য এর সার্বজনীনতায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এখানে নিজের আত্মজীবনী লিখেছেন — বোষ্টমী, নাদের আলী, বাবা, বরুণা সবাই তার জীবনের বাস্তব চরিত্র। কিন্তু কবিতাটি পড়ার সময় প্রতিটি পাঠক নিজের জীবনের বোষ্টমী, নিজের নাদের আলী, নিজের বরুণাকে খুঁজে পান। প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের অভিজ্ঞতা এমনই সার্বজনীন — শৈশবের কোনো না কোনো প্রতিশ্রুতি প্রতিটি মানুষেরই অপূর্ণ থেকে যায়। এই কারণেই কবিতাটি ব্যক্তিগত হয়েও সবার হয়ে ওঠে; পাঠক ভাবেন, এ তো আমারই গল্প। কবিতার গঠন লক্ষণীয়: প্রতিটি অনুচ্ছেদ একটি করে স্মৃতি, একটি করে না-রাখা কথা; আর প্রতিটি স্মৃতির শেষে ফিরে আসে সেই ধ্রুবপংক্তি — 'কেউ কথা রাখেনি'। এই পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে প্রায় গানের স্থায়ী-অন্তরার মতো করে তোলে; পাঠক প্রথম পাঠেই এই পংক্তি মুখস্থ করে ফেলেন। 'তেত্রিশ বছর' — এই নির্দিষ্ট সংখ্যাটি কবিতাটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে; এটি কোনো বিমূর্ত দার্শনিকতা নয়, একটি নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের হিসাব। সুনীলের ভাষা এখানে সম্পূর্ণ গদ্যধর্মী ও কথ্য — কোনো কাব্যিক অলংকারের আড়ম্বর নেই। 'মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর' — এই সরল বর্ণনাই এর শক্তি; পাঠক যেন গল্প শুনছেন, কবিতা পড়ছেন না। এই গদ্যধর্মিতা ষাটের দশকের কবিতার বৈশিষ্ট্য — কৃত্তিবাস-প্রজন্ম কবিতাকে নিয়ে এসেছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়। বরুণা-পর্বটি কবিতার সবচেয়ে তীব্র অংশ — 'ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি / দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়' — প্রেমের জন্য কবির দুঃসাহসিক প্রচেষ্টার বর্ণনা, আর তারপর নির্মম সত্য — 'তবু কথা রাখেনি বরুণা'। এখানে ব্যক্তিগত বেদনা সার্বজনীন হয়ে ওঠে। কবিতার শেষ পংক্তির সামান্য পরিবর্তন লক্ষণীয় — 'কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!' শেষের 'রাখে না' বর্তমান কালে — অর্থাৎ এটি শুধু অতীতের হিসাব নয়, ভবিষ্যতেরও ভবিষ্যদ্বাণী। কবিতাটি কেন টিকে আছে? কারণ প্রতিটি প্রজন্ম নতুন করে আবিষ্কার করে — কথা না-রাখার এই বেদনা কালোত্তীর্ণ। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে ফেসবুক স্ট্যাটাস — সর্বত্র এই কবিতার পংক্তি। সুনীল নিজে বলেছিলেন, এই কবিতা তার সবচেয়ে বেশি পঠিত রচনা। মজার ব্যাপার, কবিতাটি যতই ব্যক্তিগত, ততই সার্বজনীন — এই বৈপরীত্যই এর জাদু। যতদিন মানুষ প্রতিশ্রুতি দেবে আর ভাঙবে, ততদিন এই কবিতা পড়া হবে।

প্রধান ভাব ও বার্তা

স্মৃতি, প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গ, জীবন, বিষণ্ণতা, প্রেম ও বিচ্ছেদ

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

আত্মজীবনীমূলক আখ্যান-কাঠামো — স্মৃতির ধারাবাহিক তালিকা। ধ্রুবপংক্তির পুনরাবৃত্তি ('কেউ কথা রাখেনি') কবিতাটিকে গানের মতো স্মরণীয় করে। সম্পূর্ণ কথ্য ও গদ্যধর্মী ভাষা — অলংকারহীন সরল বর্ণনা। প্রতিটি চরিত্র (বোষ্টমী, নাদের আলী, বরুণা) একটি করে জীবন-পর্বের প্রতীক। শেষ পংক্তির সামান্য পরিবর্তন ('কেউ কথা রাখে না!') সমাপ্তিকে চূড়ান্ত সত্যে রূপ দেয়।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

ষাটের দশকের শেষ দিকে রচিত — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালে, 'তেত্রিশ বছর' হিসেবে কবিতাটি ১৯৬৭-৬৮ সালের দিকে লেখা বলে অনুমান করা হয়। এই সময় সুনীল 'কৃত্তিবাস' পত্রিকার সম্পাদক ও ষাটের দশকের প্রধান কবিদের অন্যতম। আত্মজীবনীমূলক এই কবিতা প্রকাশের পরপরই পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগায় এবং দ্রুত বাংলা কবিতার সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

সম্পর্কিত কবিতা

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।