মূল কন্টেন্টে যান

বাবুরাম সাপুড়ে

কবিতা

বাবুরাম সাপুড়ে, কোথা যাস্‌ বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা, দুটো সাপ রেখে যা—
যে সাপের চোখ্‌ নেই, শিং নেই, নোখ্‌ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস্‌ফাঁস্‌, মারে নাকো ঢুঁশ্‌ঢাঁশ,
নেই কোন উৎপাত, খায় শুধু দুধ ভাত—
সেই সাপ জ্যান্ত গোটা দুই আন্‌ তো!
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা ক’রে দেই ঠাণ্ডা।

কবিতার সারসংক্ষেপ

একটি শিশু সাপুড়ে বাবুরামকে ডেকে বলে — বাবা, দেখে যাও, দুটো সাপ রেখে যাও। কিন্তু সে এমন সাপ চায় যার চোখ নেই, শিং নেই, নখ নেই; যে ছোটে না, হাঁটে না, কাউকে কাটে না; যে ফোঁসফাঁস করে না, ঢুঁশঢাঁশ মারে না; যার কোনো উৎপাত নেই, যে শুধু দুধ-ভাত খায়। এমন নিরীহ, জ্যান্ত দুটো সাপ আনতে বলার পর শেষে শিশুটি হুমকি দেয় — তেড়ে মেরে ডাণ্ডা দিয়ে ঠাণ্ডা করে দেবে! ভয়ংকর সাপকে নিরীহ বানিয়ে শেষে তাকেই শাসানোর এই উল্টোপাল্টা মজাই ছড়াটির প্রাণ।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

সুকুমার রায়ের 'আবোল তাবোল' (১৯২৩) বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা — আর 'বাবুরাম সাপুড়ে' সেই বইয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত ছড়া। মাত্র আট পংক্তির এই ছড়ায় একটি শিশু সাপুড়ে বাবুরামকে ডেকে এমন সাপ চাইছে, যে সাপ আসলে সাপই নয়। 'যে সাপের চোখ্‌ নেই, শিং নেই, নোখ্‌ নেই, ছোটে না কি হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না' — একের পর এক 'নেই'-এর তালিকায় গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত, নিরীহ, প্রায়-অসম্ভব সাপের ছবি। এই ছড়ার আসল মজা এর যুক্তির উল্টোদিকে হাঁটায়: সাপুড়ের কাছে সাপ চাওয়া হচ্ছে, কিন্তু এমন সাপ যা সাপের কোনো লক্ষণই রাখে না — শুধু 'খায় শুধু দুধ ভাত'। শিশুমন ভয়কে জয় করতে চায় কল্পনা দিয়ে; ভয়ংকর সাপকে সে বদলে নেয় পোষা, নিরীহ প্রাণীতে — এই মনস্তত্ত্বই ছড়াটির প্রাণ। সুকুমার রায় ছিলেন নন্সেন্স সাহিত্যের অসামান্য কারিগর; ইংরেজি নন্সেন্স ঐতিহ্যের সঙ্গে তার গভীর পরিচয় ছিল, কিন্তু তিনি তাকে পুরোপুরি বাঙালি করে নিয়েছিলেন। 'করে নাকো ফোঁস্‌ফাঁস্‌, মারে নাকো ঢুঁশ্‌ঢাঁশ' — এই ধ্বন্যাত্মক শব্দজোড়া শুধু মজারই নয়, ছড়াটির ছন্দকেও বেঁধে রেখেছে। শেষ দুই পংক্তিতে মোড় আসে: 'সেই সাপ জ্যান্ত গোটা দুই আন্‌ তো! তেড়ে মেরে ডাণ্ডা ক’রে দেই ঠাণ্ডা।' — এতক্ষণ ধরে যে নিরীহ সাপের বর্ণনা, শেষে তাকেই ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করার হুমকি! এই আকস্মিক মোড় শিশুদের হাসায়, বড়দের ভাবায় — নন্সেন্সের চেনা কৌশল। 'আবোল তাবোল' প্রকাশিত হয় সুকুমার রায়ের মৃত্যুর বছরে (১৯২৩); মাত্র ছত্রিশ বছর বেঁচে তিনি যে শিশুসাহিত্যের ভাণ্ডার রেখে গেছেন, 'বাবুরাম সাপুড়ে' তার উজ্জ্বলতম রত্ন। আজও স্কুলের মঞ্চে, বাড়ির উঠোনে এই ছড়া শোনা যায় — প্রমাণ করে, সত্যিকারের মজার কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ হয় না। সুকুমার রায়ের জীবনের দিকে তাকালে এই ছড়ার মর্ম আরও গভীর হয়। মাত্র ছত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি; 'আবোল তাবোল'-এর ছড়াগুলো লিখেছিলেন কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন মানুষ শিশুদের জন্য হাসির ছড়া লিখছেন — এই তথ্যই ছড়াগুলোকে দিয়েছে অন্য মাত্রা। সুকুমার ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পুত্র; 'সন্দেশ' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের স্বর্ণযুগ। তার নন্সেন্স শুধু মজার জন্য নয় — এর ভেতরে আছে যুক্তিবাদের প্রতি শিশুসুলভ বিদ্রোহ: বড়দের গম্ভীর যুক্তির জগতের বাইরেও যে আনন্দের জগৎ আছে, সেটাই তিনি দেখিয়েছেন। 'বাবুরাম সাপুড়ে'র ছন্দ স্বরবৃত্তের দ্রুত তালে বাঁধা; পড়তে পড়তে জিভে তাল ওঠে। এই ছড়া প্রমাণ করে, শিশুসাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব মাপা হয় শিশুদের হাসিতে — আর সেই পরীক্ষায় সুকুমার রায় আজও অপরাজেয়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

শিশুমন, হাস্যরস, ভয়কে জয়, কল্পনা

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

ছড়াটি নন্সেন্স (অর্থহীনতার আনন্দ) ধারার উৎকৃষ্ট নমুনা — যুক্তিকে উল্টে দিয়ে হাস্যরস তৈরি করা হয়েছে। 'নেই'-এর পুনরাবৃত্তিমূলক তালিকা (চোখ নেই, শিং নেই, নখ নেই...) ছড়াটিকে দিয়েছে সংগীতময় গতি। ধ্বন্যাত্মক শব্দ — ফোঁস্‌ফাঁস্‌, ঢুঁশ্‌ঢাঁশ — মুখে বলার আনন্দ বাড়ায়। শেষ দুই পংক্তির আকস্মিক মোড় (নিরীহ সাপকে ডাণ্ডা মারার হুমকি) নন্সেন্সের চেনা কৌশল। মাত্র আট পংক্তিতে সম্পূর্ণ একটি নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি — সংক্ষিপ্ততাই এর শক্তি।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

'আবোল তাবোল' প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে, সুকুমার রায়ের মৃত্যুর বছরে — বইটি তিনি অসুস্থ শয্যায় শুয়ে শেষ করেন। এর আগে 'সন্দেশ' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যে নন্সেন্স ছড়ার নতুন ধারা গড়ে তুলেছিলেন। উনিশ শতকের নীতিকথামূলক শিশুসাহিত্যের বিপরীতে সুকুমার শিশুদের শুধু আনন্দ দেওয়ার জন্য লিখতেন — এই দৃষ্টিভঙ্গি তখন ছিল বৈপ্লবিক। 'বাবুরাম সাপুড়ে' সেই দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে সফল ফসল।

সম্পর্কিত কবিতা

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।