ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।
সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর? শরীরের স্বাদ
কে বুঝিতে চায় আর? প্রাণের আহ্লাদ
সকল লোকের মতো কে পাবে আবার।
সকল লোকের মতো বীজ বুনে আর
স্বাদ কই, ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,
শরীরে মাটির গন্ধ মেখে,
শরীরে জলের গন্ধ মেখে,
উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে
চাষার মতন প্রাণ পেয়ে
কে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর ’পরে?
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—কোন্ এক বোধ কাজ করে
মাথার ভিতরে।
পথে চ’লে পারে—পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে;
মড়ার খুলির মতো ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে,
তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।
আমি থামি—
সেও থেমে যায়;
সকল লোকের মাঝে ব’সে
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?
আমার পথেই শুধু বাধা?
জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে
সন্তানের মতো হ’য়ে—
সন্তানের জন্ম দিতে-দিতে
যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়,
কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়
যাহাদের; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজখেতে আসিতেছে চ’লে
জন্ম দেবে—জন্ম দেবে ব’লে;
তাদের হৃদয় আর মাথার মতন
আমার হৃদয় না কি? তাহদের মন
আমার মনের মতো না কি?
—তবু কেন এমন একাকী?
তবু আমি এমন একাকী।
হাতে তুলে দেখিনি কি চাষার লাঙল?
বাল্টিতে টানিনি কি জল?
কাস্তে হাতে কতোবার যাইনি কি মাঠে?
মেছোদের মতো আমি কতো নদী ঘাটে
ঘুরিয়াছি;
পুকুরের পানা শ্যালা—আঁশ্টে গায়ের ঘ্রাণ গায়ে
গিয়েছে জড়ায়ে;
–এই সব স্বাদ;
—এ-সব পেয়েছি আমি, বাতাসের মতন অবাধ
বয়েছে জীবন,
নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মন
এক দিন;
এই সব সাধ
জানিয়াছি একদিন—অবাধ—অগাধ;
চ’লে গেছি ইহাদের ছেড়ে;
ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
অবহেলা ক’রে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
ঘৃণা ক’রে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে;
আমারে সে ভালোবাসিয়াছে, আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা ক’রে চ’লে গেছে—যখন ডেকেছি বারে-বারে ভালোবেসে তারে;
তবুও সাধনা ছিলো একদিন–এই ভালোবাসা; আমি তার উপেক্ষার ভাষা আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা ক’রে গেছি; যে-নক্ষত্র—নক্ষত্রের দোষ
আমার প্রেমের পথে বার-বার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা’ ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালোবাসা—ধুলো আর কাদা।
মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়—প্রেম নয়—কোনো এক বোধ কাজ করে। আমি সব দেবতারে ছেড়ে আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি, বলি আমি এই হৃদয়েরে: সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!
অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?
কোনোদিন ঘুমাবে না? ধীরে শুয়ে থাকিবার স্বাদ
পাবে না কি? পাবে না আহ্লাদ মানুষের মুখ দেখে কোনোদিন! মানুষীর মুখ দেখে কোনোদিন! শিশুদের মুখ দেখে কোনোদিন!
এই বোধ—শুধু এই স্বাদ পায় সে কি অগাধ—অগাধ! পৃথিবীর পথ ছেড়ে আকাশের নক্ষত্রের পথ চায় না সে? করেছে শপথ দেখিবে সে মানুষের মুখ? দেখিবে সে মানুষীর মুখ? দেখিবে সে শিশুদের মুখ? চোখে কালো শিরার অসুখ, কানে যেই বধিরতা আছে,
যেই কুঁজ—গলগণ্ড মাংসে ফলিয়াছে নষ্ট শসা—পচা চাল্কুমড়ার ছাঁচে, যে-সব হৃদয়ে ফলিয়াছে —সেই সব।
কবিতার শুরুতেই ঘোষণা: আলো-অন্ধকারে পথ চলতে চলতে মাথার ভেতরে কোন্ এক ‘বোধ’ কাজ করে—তা স্বপ্ন নয়, শান্তি নয়, ভালোবাসা নয়; হৃদয়ের মাঝে জন্ম নেওয়া এক বোধ, যাকে এড়ানো যায় না, যা হাত ধরে থাকে। এর প্রভাবে সব কাজ তুচ্ছ মনে হয়, সব চিন্তা ও প্রার্থনা শূন্য মনে হয়। কবি প্রশ্ন তোলেন—সহজ লোকের মতো কে চলতে পারে? কে পাবে চাষার মতো সরল প্রাণ? কিন্তু এই বোধ তাকে আলাদা করে দিয়েছে; সকলের মাঝে বসেও সে একা। সে ভাবে, যারা সন্তানের জন্ম দেয়, সংসার করে—তাদের হৃদয় কি তার মতো নয়? তবু সে একাকী। কবি স্মরণ করেন, একদিন তিনিও চাষার লাঙল তুলেছেন, মেছোদের মতো নদীঘাটে ঘুরেছেন, মেয়েমানুষকে ভালোবেসেছেন—কিন্তু সব ছেড়ে এসেছেন। শেষে কবি নিজের হৃদয়কেই প্রশ্ন করেন: এই বোধ কি কখনো ঘুমাবে না? মানুষের মুখ দেখে কি কখনো আহ্লাদ পাবে না? কবিতা শেষ হয় এক বিষণ্ণ স্বীকারোক্তিতে—এই বোধ শুধু দেখবে মানুষের মুখ, কিন্তু তার চোখে কালো শিরার অসুখ, কানে বধিরতা; সে দেখবে, কিন্তু পুরোপুরি মিশতে পারবে না।
‘বোধ’ কবিতাটি জীবনানন্দের সবচেয়ে আত্মপ্রকাশমূলক রচনাগুলোর একটি—এখানে কবি নিজেই নিজের বিশ্লেষক। কবিতার কেন্দ্রীয় প্রতিমা ‘বোধ’—এটি কোনো বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা নয়, বরং একটি জীবন্ত সত্তা: ‘সে আমার হাত রাখে হাতে’, ‘আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে’। এই ব্যক্তিকরণে বোধ যেন কবির ছায়া-সঙ্গী, যাকে উপেক্ষা করা যায় না (‘মড়ার খুলির মতো ধ’রে আছাড় মারিতে চাই’), কিন্তু যে থেকেই যায়। সমালোচকদের মতে, এই ‘বোধ’ হলো কবির সৃজনশীল চেতনা—যা তাকে সাধারণ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু একই সঙ্গে তার কবিত্বের উৎস। কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে ‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে’—এই প্রশ্নমালায় কবির গভীর হাহাকার: তিনি চান চাষার মতো সরল হতে, মাটির গন্ধ মেখে, ফসলের আকাঙ্ক্ষায় বাঁচতে; কিন্তু পারেন না। এই ‘না-পারা’ই আধুনিক শিল্পীর নিয়তি। তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবকে একাকীত্বের দার্শনিক বিশ্লেষণ—সন্তান-জন্মদানকারী সাধারণ মানুষদের সঙ্গে নিজের তুলনা করে কবি দেখেন, বাইরে থেকে সব এক হলেও ভেতরে তিনি আলাদা। পঞ্চম স্তবকটি আত্মজীবনীমূলক: চাষার লাঙল, মেছোদের নদীঘাট, মেয়েমানুষের ভালোবাসা—কবি একদিন এই সব ‘সহজ’ জীবনের স্বাদ পেয়েছিলেন, কিন্তু ‘বোধ’-এর তাড়নায় সব ছেড়ে এসেছেন। ‘তবু এই ভালোবাসা—ধুলো আর কাদা’—এই পংক্তিতে প্রেমের প্রতিও এক ধরনের তিক্ততা। শেষ স্তবকে কবি নিজের হৃদয়ের সঙ্গে সংলাপে বসেন—‘সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!’ এই প্রশ্নে আত্ম-বিশ্লেষণের চরম। সমাপ্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: এই বোধ মানুষের মুখ দেখবে বলে শপথ করেছে, কিন্তু তার চোখে ‘কালো শিরার অসুখ’—অর্থাৎ দেখা হবে, কিন্তু স্বাভাবিক মিলন হবে না; কবি দেখবেন, বুঝবেন, কিন্তু পুরোপুরি অংশ নিতে পারবেন না। এই দূরত্বই শিল্পীর চিরন্তন শাস্তি ও চিরন্তন সম্পদ। কবিতাটির ভাষা গদ্যছন্দ-ঘেঁষা, প্রশ্নবোধক বাক্যের প্রাচুর্য এটিকে আত্ম-জিজ্ঞাসার দলিলে পরিণত করেছে। কবিতাটির দার্শনিক গভীরতা আরও একটি স্তরে উন্মোচিত হয় যখন আমরা ‘বোধ’-কে শুধু ব্যক্তিগত না দেখে সার্বজনীন মানব-অভিজ্ঞতা হিসেবে পড়ি। প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের জীবনেই এমন মুহূর্ত আসে, যখন সাধারণ জীবনের অর্থহীনতা তাকে গ্রাস করে—যখন উৎসবের ভিড়েও সে একা বোধ করে। জীবনানন্দ এই সার্বজনীন অভিজ্ঞতাকে দিয়েছেন কাব্যরূপ। ‘আমার নিজের মুদ্রাদোষে আমি একা হতেছি আলাদা’—এই স্বীকারোক্তিতে কোনো অহংকার নেই, আছে শুধু বেদনা; কবি নিজের আলাদা-হওয়াকে দোষ হিসেবেই দেখেন, গৌরব হিসেবে নয়। এই বিনয় কবিতাটিকে আত্মম্ভরিতা থেকে বাঁচিয়েছে। কবিতার শেষাংশে ‘চোখে কালো শিরার অসুখ, কানে যেই বধিরতা আছে’—এই চিত্রকল্পে শিল্পীর সীমাবদ্ধতার নির্মম স্বীকারোক্তি: তিনি দেখবেন, কিন্তু অসুস্থ চোখে; শুনবেন, কিন্তু বধির কানে। অর্থাৎ শিল্পীর দৃষ্টি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি থেকে আলাদা—তা তীক্ষ্ণতর, কিন্তু সেই তীক্ষ্ণতাই তাকে বিচ্ছিন্ন করে। এই দ্বন্দ্ব—দেখার শক্তি বনাম মিলনের অক্ষমতা—সব মহৎ শিল্পীরই নিয়তি। ‘বোধ’ তাই শুধু জীবনানন্দের আত্মজীবনী নয়; এটি সব সৃজনশীল মানুষের আত্মজীবনী।
শিল্পী-মানস, একাকীত্ব, আত্ম-অন্বেষণ, সৃষ্টির তাড়না, সাধারণ জীবন বনাম অসাধারণ চেতনা
কবিতাটি মুক্তছন্দে রচিত দীর্ঘ আত্মকথন; প্রশ্নবোধক বাক্যের ধারাবাহিক ব্যবহারে (‘কে চলিতে পারে?’, ‘তবু কেন এমন একাকী?’) এটি সংলাপধর্মী আত্ম-জিজ্ঞাসায় পরিণত হয়েছে। ‘বোধ’-এর ব্যক্তিকরণ (সে হাত ধরে, সাথে চলে) কবিতার কেন্দ্রীয় শৈল্পিক কৌশল। পুনরাবৃত্তি (‘শূন্য মনে হয়, শূন্য মনে হয়’, ‘তবু সে মাথার চারিপাশে…’) মন্ত্রের মতো ধ্বনি তৈরি করেছে। চিত্রকল্প বাস্তব ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য—চাষার লাঙল, পুকুরের পানা, আঁশটে গায়ের ঘ্রাণ। ভাষায় সাধু-চলিতের স্বাভাবিক মিশ্রণ; দীর্ঘ বাক্যের প্রবাহ চিন্তার গতিকে অনুসরণ করে।
১৯৩০ সালে ‘প্রগতি’ পত্রিকায় প্রকাশের সময় জীবনানন্দের বয়স একত্রিশ; তখনো তিনি সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠিত নন, চাকরির অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এই কবিতায় সেই সময়ের মানসিক অবস্থার ছাপ স্পষ্ট—নিজের কবি-পরিচয় নিয়ে দ্বিধা, সাধারণ জীবনের প্রতি আকর্ষণ ও বিকর্ষণ। ১৯৩৬ সালে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে সংকলিত হলে কবিতাটি বৃহত্তর পাঠকের নজরে আসে। সমালোচক ক্লিনটন বি. সিলির মতে, এই কবিতায় জীবনানন্দ ‘সৃজনশীল প্রক্রিয়ার বোঝা’ বহনের কথা বলেছেন—যা তার সারাজীবনের সঙ্গী ছিল। বাংলা কবিতায় শিল্পীর আত্ম-সংকট নিয়ে এত সৎ ও এত গভীর কবিতা খুব কমই আছে।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”