মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

শোনা গেল লাসকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে— ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’লো তার সাধ;
বধূ শুয়েছিলো পাশে— শিশুটিও ছিলো;
প্রেম ছিলো, আশা ছিলো— জ্যোৎস্নায়– তবু সে দেখিল
কোন্ ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল— লাসকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।
এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি!
রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি
আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার;
কোনোদিন জাগিবে না আর।

‘কোনোদিন জাগিবে না আর
জানিবার গাঢ় বেদনার
অবিরাম— অবিরাম ভার
সহিবে না আর—’

এই কথা বলেছিলো তারে
চাঁদ ডুবে চ’লে গেলে— অদ্ভুত আঁধারে
যেন তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে।
তবুও তো পেঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায়— অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।
টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।
রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কতো দেখিয়াছি।
ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন— যেন কোন্ বিকীর্ণ জীবন
অধিকার ক’রে আছে ইহাদের মন;
দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ
মরণের সাথে লড়িয়াছে;
চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে
এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা-একা;
যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের— মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা
এই জেনে।
অশ্বত্থের শাখা
করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে
করেনি কি মাখামাখি?
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা এসে
বলেনি কি: ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে
চমৎকার!
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!’
জানায়নি পেঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার?
জীবনের এই স্বাদ– সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের–
তোমার অসহ্য বোধ হ’লো;
মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো
মর্গে— গুমোটে
থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে।

শোনো
তবু এ মৃতের গল্প; কোনো
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোনো খাদ,
সময়ের উদ্বর্তনে উঠে এসে বধূ
মধু— আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;
হাড়হাভাতের গ্রানি বেদনার শীতে
এ-জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই;
তাই
লাসকাটা ঘরে
চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।

জানি— তবু জানি
নারীর হৃদয়— প্রেম— শিশু— গৃহ– নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;, আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত— ক্লান্ত করে;, লাসকাটা ঘরে, সেই ক্লান্তি নাই;, তাই, লাসকাটা ঘরে
চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।

তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বত্থের ডালে ব’সে এসে
চোখ পাল্টায়ে কয়: ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে?
চমৎকার!
ধরা যাক্ দু-একটা ইঁদুর এবার—’
হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজো চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো— বুড়ি চাঁদটারে আমি ক’রে দেবো
কালীদহে বেনোজলে পার;
আমরা দু-জনে মিলে শূন্য ক’রে চ’লে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবিতার শুরুতে শোনা যায়, ফাল্গুনের এক রাতে পঞ্চমীর চাঁদ ডুবে যাওয়ার পর এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে; তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে লাসকাটা ঘরে। তার পাশে বধূ শুয়ে ছিল, শিশুও ছিল; প্রেম ছিল, আশা ছিল—তবু সে মৃত্যুকেই বেছে নিল। কবি বিস্ময়ে প্রশ্ন তোলেন: প্রকৃতিতে তো জীবনের অফুরান স্বাদ—পেঁচা জাগে, ব্যাং ভিক্ষা মাগে আরো দুই মুহূর্তের, মাছি রৌদ্রে ওড়ে, শিশুর হাতে ফড়িঙ মরণের সঙ্গে লড়ে—তবু কেন এই মৃত্যু-সাধ? অশ্বত্থের শাখা, জোনাকি, পেঁচা কেউ কি তাকে বাধা দেয়নি? কবি স্পষ্ট করেন, এ মৃত্যুর পেছনে প্রেমে ব্যর্থতা বা সংসারের অভাব ছিল না। আসল কারণ ‘আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়’—মানুষের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা-করা এক রহস্যময় ক্লান্তি, যা লাসকাটা ঘরের ঘুমে আর থাকে না। কবিতা শেষ হয় পেঁচার সেই চিরায়ত সংলাপে—‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে’—আর কবির নিজের ঘোষণায়: তিনিও একদিন বুড়ো হবেন, জীবনের ভাঁড়ার শূন্য করে চলে যাবেন।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সবচেয়ে বড়ো বিস্ময় এর বিষয়বস্তুর নির্মম সততা। আত্মহত্যাকে বাংলা কবিতায় এর আগে এত নিস্পৃহ, এত দার্শনিক দৃষ্টিতে কেউ দেখেননি। কবি মৃত ব্যক্তির জীবনের সমস্ত ‘সুখের উপাদান’ গুনে দেখান—বধূ, শিশু, প্রেম, আশা, জ্যোৎস্না—আর তারপর সেই বিখ্যাত সিদ্ধান্ত: ‘তবু এ মৃতের গল্প; কোনো নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই।’ অর্থাৎ এই মৃত্যুর কারণ বাইরের কোনো অভাব নয়; কারণ অন্তরের এক অজ্ঞাত শূন্যতা। ‘বিপন্ন বিস্ময়’—এই শব্দবন্ধটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গভীর দার্শনিক উদ্ভাবন; আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব-সংকটের এত সংক্ষিপ্ত ও এত সঠিক নামকরণ আর হয়নি। কবিতার গঠনও লক্ষণীয়: প্রথমে ঘটনার বিবরণ, তারপর প্রকৃতির বিপরীত চিত্র (জীবন যেখানে উচ্ছল, সেখানে মৃত্যু কেন?), তারপর দার্শনিক ব্যাখ্যা, শেষে কবির নিজের আত্ম-উপলব্ধি। প্রকৃতির চিত্রকল্পগুলো জীবনানন্দীয় স্বাক্ষর বহন করে—পেঁচা, ব্যাং, মাছি, ফড়িঙ, জোনাকি—ক্ষুদ্র প্রাণীরাও যেখানে জীবন আঁকড়ে ধরে, সেখানে মানুষের এই আত্ম-বিসর্জন আরো বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। ‘থুরথুরে অন্ধ পেঁচা’ চরিত্রটি কবিতার শেষে এক ধরনের জ্ঞানী-দার্শনিকের ভূমিকা নেয়; তার ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে, চমৎকার! ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার’—এই উদাসীন প্রাজ্ঞতা মৃত্যুর সামনে প্রকৃতির নির্লিপ্ততারই প্রতীক। কবিতার ভাষা কোথাও আবেগে ভেসে যায়নি; মর্গ, লাসকাটা ঘর, রক্তফেনামাখা মুখ—এই কঠোর বাস্তবতা কবিতাটিকে রোমান্টিক মৃত্যু-ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই কবিতা প্রকাশের পর অনেকে একে ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা’ বলে সমালোচনা করেছিলেন; কিন্তু আসলে কবিতাটি মৃত্যুর মহিমাকীর্তন নয়, বরং জীবনের রহস্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক নির্ভীক প্রয়াস। কবি নিজে এই ‘বিপন্ন বিস্ময়’-কে ব্যাখ্যা করতে চাননি; তিনি শুধু তার উপস্থিতি ঘোষণা করেছেন। এই অ-ব্যাখ্যাই কবিতাটির শক্তি—প্রতিটি পাঠক নিজের অন্তরের শূন্যতার সঙ্গে এই কবিতার সংযোগ খুঁজে পান। শেষ স্তবকে কবি নিজেকে সেই মৃত ব্যক্তির সঙ্গে একাত্ম করে নেন—‘আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো’—এই স্বীকারোক্তিতে কবিতাটি ব্যক্তিগত শোক থেকে সার্বজনীন মানব-নিয়তির কবিতায় পরিণত হয়। আজও, প্রায় নব্বই বছর পরেও, এই কবিতা পাঠককে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—আর সেটাই এর চিরস্থায়িত্বের প্রমাণ। কবিতাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সময়-চেতনা। ‘আট বছর আগের একদিন’—শিরোনামেই অতীতের একটি নির্দিষ্ট দিনের উল্লেখ; কিন্তু কবিতার ভেতরে সেই দিন কখনোই অতীত থাকে না, বর্তমানের মতো জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই কৌশলে কবি দেখান, মৃত্যুর স্মৃতি সময়কে জয় করে—আট বছর পরেও সেই রাতের আঁধার, সেই পঞ্চমীর চাঁদ, সেই লাসকাটা ঘর একই রকম তাজা। সমালোচকদের কেউ কেউ এই কবিতায় ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের ছায়া দেখেছেন—মৃত্যু-তাড়নার কাব্যরূপ। আবার কেউ দেখেছেন অস্তিত্ববাদী দর্শনের পূর্বাভাস—জীবনের অর্থহীনতার মুখোমুখি দাঁড়ানো। জীবনানন্দ নিজে কোনো তত্ত্বের অনুসারী ছিলেন না; তিনি শুধু দেখেছেন ও লিখেছেন। এই সততাই কবিতাটিকে তত্ত্বের ঊর্ধ্বে তুলেছে। পাঠকের জন্য কবিতাটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ শেষ স্তবক—যেখানে কবি নিজেকে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে এক করে নেন। ‘আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো’—এই স্বীকারোক্তিতে পাঠক বুঝতে পারেন, কবি বাইরে থেকে বিচারক নন; তিনিও সেই একই ‘বিপন্ন বিস্ময়’-এর শিকার। এই আত্ম-অন্তর্ভুক্তি কবিতাটিকে নৈতিক বিচার থেকে মুক্ত করে মানবিক সমবেদনায় পরিণত করেছে। আজকের মানসিক-স্বাস্থ্য সচেতন যুগে এই কবিতা নতুন করে প্রাসঙ্গিক—এটি শেখায়, বাইরে থেকে সুখী দেখালেও মানুষের ভেতরে অজানা অন্ধকার থাকতে পারে, আর সেই অন্ধকারকে অস্বীকার না করে মুখোমুখি হওয়াই সততা।

প্রধান ভাব ও বার্তা

মৃত্যুচেতনা, আত্মহনন, অস্তিত্ব-সংকট, প্রকৃতি বনাম মানুষ, জীবনের রহস্য

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটি গদ্যছন্দ-ঘেঁষা মুক্তছন্দে রচিত; পয়ার-বন্ধন ভেঙে চিন্তার স্বাভাবিক গতিকে অনুসরণ করেছে ভাষা। চিত্রকল্পের ব্যবহার জীবনানন্দীয়—পেঁচা, ব্যাং, মাছি, ফড়িঙ, জোনাকি, অশ্বত্থ—ক্ষুদ্র ও পরিচিত প্রাণী-উদ্ভিদের মাধ্যমে গভীর দার্শনিক বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে। সংলাপধর্মী অংশ (‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে’) কবিতায় নাটকীয়তা এনেছে। ‘বিপন্ন বিস্ময়’—এই যৌগশব্দ কবির নিজস্ব দার্শনিক পরিভাষা। পুনরাবৃত্তির কৌশল (‘লাসকাটা ঘরে’, ‘চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে’) কবিতায় মন্ত্রোচ্চারণের মতো ধ্বনি তৈরি করেছে। ভাষা একদিকে কঠোর বাস্তববাদী (মর্গ, লাসকাটা ঘর), অন্যদিকে গভীর কাব্যিক—এই দ্বৈততাই কবিতার শৈল্পিক শক্তি।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯৩৮ সাল—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে, বাংলায় অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই কবিতা আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এর আগে রবীন্দ্রনাথের ‘মৃত্যু’-ভাবনা ছিল মূলত আধ্যাত্মিক ও রোমান্টিক; জীবনানন্দ প্রথম মৃত্যুকে দেখালেন মনোবৈজ্ঞানিক ও অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। কবিতাটি প্রকাশের পর সমালোচকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়—কেউ বলেন এটি নৈরাশ্যবাদী, কেউ বলেন এটি আধুনিক চেতনার সৎ প্রকাশ। উল্লেখ্য, কবিতার শিরোনামে ‘আট বছর’—জীবনানন্দের নিজের জীবনের কোনো ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে অনেক জল্পনা হয়েছে, তবে কবি কখনো তা স্পষ্ট করেননি। এই কবিতা পরবর্তীকালে বাংলা কবিতায় মৃত্যু-চেতনার ধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।