মূল কন্টেন্টে যান

তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা

কবিতা সম্পর্কে

শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ প্রেম ও যুদ্ধ-বিরোধিতার এক অপূর্ব মিলন। প্রিয়তমাকে ‘ভয় নেই’ আশ্বাস দিয়ে কবি কল্পনা করেন এমন এক পৃথিবী, যেখানে সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে মার্চপাস্ট করে, যুদ্ধবিমান থেকে ঝরে চকোলেট—আর ভালোবাসাই হয় একমাত্র বৈধ মুদ্রা।

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে মার্চপাস্ট করে চলে যাবে

— শহীদ কাদরী, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ থেকে উদ্ধৃত

স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।

কবিতার সারসংক্ষেপ

প্রেমিক কবি প্রিয়তমাকে আশ্বাস দেন—'ভয় নেই'। তিনি এমন ব্যবস্থা করবেন যাতে সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে মার্চপাস্ট করে; আর্মার্ড কার ভায়োলিন বোঝাই করে প্রিয়তমার দোরগোড়ায় আসে; বি-৫২ আর মিগ-২১ থেকে ঝরে পড়ে চকোলেট, টফি, লজেন্স। একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সব রণতরী; 'ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ' হবে; গণরোষের বদলে গণচুম্বনের ভয়ে হন্তারকের হাত থেকে ছুরি পড়ে যাবে। শেষে নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী প্রিয়তমাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নিশিদিন অভিবাদন জানাবে। প্রেমের কল্পনায় যুদ্ধের পরাজয়—এই কবিতার মূল সুর।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতার প্রথম চমক এর শিরোনামেই—অভিবাদন সাধারণত দেওয়া হয় বীরকে, নেতাকে, বিজয়ীকে; কিন্তু এখানে অভিবাদন প্রিয়তমাকে, একজন নারীকে। আর এই অভিবাদন জানানো হয় সেনাবাহিনী, রণতরী, যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে—যুদ্ধের সব যন্ত্রকে প্রেমের সেবায় নিয়োজিত করে। এই বিপরীতধর্মী কল্পনাই কবিতার প্রাণ। কবিতাটি শুরু হয় ‘ভয় নেই’ আশ্বাস দিয়ে। এই দুটি শব্দ বারবার ফিরে আসে, যেন প্রেমিক প্রিয়তমার কাঁধে হাত রেখে বলছেন—ভয় পেয়ো না, পৃথিবীটা আমি বদলে দেব। তারপর একের পর এক অসম্ভব কল্পনা: সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে মার্চপাস্ট করবে; আর্মার্ড কার ভায়োলিন বোঝাই করে প্রিয়তমার দোরগোড়ায় আসবে; বি-৫২ আর মিগ-২১ থেকে ঝরবে চকোলেট, টফি, লজেন্স। যুদ্ধের প্রতিটি যন্ত্র এখানে ভালোবাসার বাহনে রূপান্তরিত। এই রূপান্তরের মধ্যে আছে গভীর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। ১৯৭৪ সালে, মুক্তিযুদ্ধের মাত্র তিন বছর পর, যখন পৃথিবী শীতল যুদ্ধের উত্তাপে পুড়ছে, তখন কবি কল্পনা করছেন এমন এক পৃথিবীর যেখানে ‘ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ’। রাষ্ট্র যেখানে ভালোবাসা ছাড়া সব নিষিদ্ধ করে, সেখানে কবি উল্টো প্রস্তাব দেন—নিষিদ্ধ হোক ঘৃণা, বৈধ হোক ভালোবাসা। ‘গণরোষের বদলে গণচুম্বনের ভয়ে হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি’—এই পংক্তিতে সহিংসতার রাজনীতির প্রতি তীব্র ব্যঙ্গ আছে, আবার প্রেমের শক্তির প্রতি অগাধ বিশ্বাসও আছে। শহীদ কাদরীর কবি-সত্তার বৈশিষ্ট্য এই কবিতায় পূর্ণরূপে প্রকাশিত—নাগরিক, বুদ্ধিদীপ্ত, কৌতুকপ্রবণ, অথচ গভীর মানবিক। তিনি যুদ্ধকে দেখেন দূর থেকে, বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিতে; কিন্তু প্রেমকে দেখেন কাছ থেকে, প্রেমিকের হৃদয় দিয়ে। এই দুই দৃষ্টির মিলনেই কবিতাটি অনন্য। ভাষার দিক থেকে কবিতাটি গদ্যছন্দের কাছাকাছি—দীর্ঘ, প্রবহমান বাক্য, যেন প্রেমিকের একটানা স্বপ্ন-বর্ণনা। ‘ভয় নেই’ পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে সংগীতময় ছন্দ দিয়েছে, যেন একটি ঘুমপাড়ানি গান—প্রিয়তমাকে দুঃস্বপ্নের বদলে সুন্দর স্বপ্ন দেখানো। কবিতাটি কেন টিকে আছে? কারণ যুদ্ধ আজও শেষ হয়নি। পৃথিবীর যেখানেই বোমা পড়ে, সেখানেই এই কবিতা প্রাসঙ্গিক—মানুষ আজও চায়, যুদ্ধের যন্ত্রগুলো একদিন ভালোবাসার কাজে লাগুক। প্রেমের কবিতা হয়েও এটি যুদ্ধ-বিরোধী ঘোষণা; আর যুদ্ধ-বিরোধী হয়েও এটি নির্মল প্রেমের কবিতা। এই দ্বৈত পরিচয়ই এর চিরস্থায়িত্বের রহস্য। কবিতাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক এর অর্থনৈতিক ব্যঙ্গ। ‘স্টেটব্যাংকে গিয়ে গোলাপ কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে’—এই পংক্তিতে অর্থনীতির যুক্তিকে ফুলের সৌন্দর্যের কাছে পরাজিত করা হয়েছে; টাকার মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে ফুল দিয়ে। ‘মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা’—অর্থনীতির ভাষায় কবিতার জয় ঘোষণা করা হয়েছে। এই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যঙ্গের মধ্যেও প্রেমের কেন্দ্রীয়তা অটুট—সব রূপান্তরের লক্ষ্য একটাই, প্রিয়তমার মুখে হাসি ফোটানো। প্রেম এখানে শুধু অনুভূতি নয়, একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাব।

প্রধান ভাব ও বার্তা

প্রেম, শান্তি, যুদ্ধ-বিরোধিতা, কল্পনা

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

‘ভয় নেই’—এই আশ্বাস-বাক্যের পুনরাবৃত্তি কবিতার সংগীতময় কাঠামো তৈরি করেছে। প্রধান শৈল্পিক কৌশল রূপান্তর: যুদ্ধের প্রতিটি যন্ত্র (সেনাবাহিনী, ট্যাংক, বোমারু বিমান) ভালোবাসার বাহনে বদলে যায়। এই চিত্রকল্পে ব্যঙ্গ ও কল্পনার মিশ্রণ—‘ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ’ পংক্তিতে রাষ্ট্র-ব্যঙ্গের চরম। ভাষা গদ্যছন্দের কাছাকাছি, দীর্ঘ প্রবহমান বাক্যে স্বপ্ন-বর্ণনার ঢঙ।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯৭৪ সালে ‘উত্তরাধিকার’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র তিন বছর পর বাংলাদেশ; যুদ্ধের ক্ষত তখনও তাজা, আবার শীতল যুদ্ধের উত্তাপে পৃথিবী বিভক্ত। শহীদ কাদরী (১৯৪২–২০১৬) তখন নাগরিক মধ্যবিত্তের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের শান্তি-আকাঙ্ক্ষার কাব্যিক প্রকাশ এই কবিতা।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।