ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
সুফিয়া কামালের ‘তাহারেই পড়ে মনে’ বাংলা কবিতার সবচেয়ে প্রিয় প্রকৃতি-কবিতাগুলোর একটি। ফাগুনের আগমনে বসন্ত-বন্দনা গাইতে বলা হলে কবি গান গাইতে পারেন না—তার মনে পড়ে যায় বিদায়ী শীতের কথা; প্রকৃতির পালাবদল আর মানব-স্মৃতির এই সংলাপ কবিতাটিকে চিরায়ত করে তুলেছে।
হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়,
বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?— সুফিয়া কামাল, ‘তাহারেই পড়ে মনে’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
সংলাপধর্মী এই কবিতায় এক কণ্ঠ কবিকে অনুরোধ করে—ফাগুন এসেছে ধরায়, বসন্তকে বরণ করে গান গাও; কিন্তু কবি গাইতে পারেন না। তার মনে পড়ে যায় বিদায়ী শীতের কথা—'মাঘের সন্ন্যাসী' কুহেলি-উত্তরী গায়ে রিক্ত হস্তে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে চলে গেছেন। বসন্তের ঐশ্বর্য—বাতাবি নেবুর ফুল, আমের মুকুল, দখিনা সমীরের গন্ধ, মাধবী কুঁড়ির অর্ঘ্য—বর্ণিত হলেও কবির মন পড়ে আছে চলে-যাওয়া শীতের স্মৃতিতে। শেষ পংক্তিতে কবির স্বীকারোক্তি: 'তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোনো মতে।' মূলভাব—স্মৃতির কাছে বর্তমানের পরাজয়; যা চলে গেছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞ বেদনা।
‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার সবচেয়ে বড়ো শৈল্পিক সিদ্ধি এর সংলাপ-কাঠামো। কবিতায় দুটি কণ্ঠ কথা বলে—একটি প্রশ্ন করে, অনুরোধ করে; অন্যটি, কবি নিজে, উত্তর দেয়, অস্বীকার করে। এই প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গি কবিতাটিকে নাটকীয় প্রাণ দিয়েছে; পাঠক যেন দুজন মানুষের কথোপকথন শুনছেন, যার একপক্ষ বসন্তের পক্ষে, অন্যপক্ষ শীতের স্মৃতির পক্ষে। প্রশ্নকর্তা বলেন, ফাগুন এসেছে ধরায়, বসন্তকে বরণ করে গান গাও—এ তো স্বাভাবিক দাবি। কিন্তু কবির উত্তর অস্বাভাবিক বলেই কবিতাটি অসাধারণ। কবি গান গাইতে পারেন না, কারণ তার মনে পড়ে যায় সেই ‘মাঘের সন্ন্যাসী’র কথা—শীতকে কবি কল্পনা করেছেন কুহেলি-উত্তরীয়-পরা এক সন্ন্যাসী হিসেবে, যিনি পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে রিক্ত হস্তে চলে গেছেন। এই রূপকটি কবিতার প্রাণ। শীত সাধারণত কঠোর, নির্মম ঋতু হিসেবে চিত্রিত হয়; কিন্তু এখানে শীত এক ত্যাগী সন্ন্যাসী—যিনি কিছু না নিয়েই চলে গেছেন, আর তার এই নিঃস্ব চলে যাওয়াই কবির হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। ‘রিক্ত হস্তে’ শব্দবন্ধটি লক্ষণীয়—শীত যেন কিছু দাবি করেনি, কিছু নেয়নি; শুধু চলে গেছে। আর এই নীরব বিদায়ের স্মৃতিই কবিকে বসন্তের উৎসবে যোগ দিতে দিচ্ছে না। কবিতার আরেকটি দিক এর প্রকৃতি-চিত্রের ঐশ্বর্য। বাতাবি নেবুর ফুল, আমের মুকুল, দখিনা সমীরের গন্ধ, মাধবী কুঁড়ির অর্ঘ্য—বসন্তের এই বর্ণনা এত জীবন্ত যে পাঠক ফাগুনের গন্ধ পান। অথচ এই সৌন্দর্য-বর্ণনা কবিতার বিষণ্ণতাকে আরও গভীর করে—বাইরে যত উৎসব, ভেতরে তত শূন্যতা। এই বৈপরীত্যই কবিতার মর্ম। দার্শনিক দিক থেকে কবিতাটি স্মৃতির দর্শন। মানুষের মন এমনই—বর্তমানের আনন্দের মাঝেও সে ফিরে যায় অতীতে, যা হারিয়েছে তার কাছে। কবি এখানে কোনো ব্যক্তির স্মৃতিতে কাতর নন; তিনি কাতর একটি ঋতুর স্মৃতিতে, একটি চলে-যাওয়া সময়ের স্মৃতিতে। এই সার্বজনীনতাই কবিতাটিকে ব্যক্তিগত শোক থেকে উন্নীত করেছে। সুফিয়া কামালের কবি-পরিচয়ের সঙ্গেও এই কবিতা গভীরভাবে যুক্ত। নারীকণ্ঠের এই কোমল অথচ দৃঢ় অস্বীকৃতি—‘গাইব না’—বাংলা কবিতায় এক নতুন স্বর এনেছিল। ১৯৩৮ সালে ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যে প্রকাশিত এই কবিতা আজও স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়; প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছাত্রছাত্রী এই কবিতার মাধ্যমে কবিতার স্বাদ পেয়েছে। ‘তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোনো মতে’—এই শেষ পংক্তি বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্ধৃত পংক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে, কারণ প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন কিছু আছে যা ভোলা যায় না।
প্রকৃতি, স্মৃতি, বসন্ত, বিদায়, বেদনা
সংলাপধর্মী কাঠামো—প্রশ্নোত্তরের নাটকীয় ভঙ্গি কবিতাটিকে প্রাণ দিয়েছে। ‘মাঘের সন্ন্যাসী’ রূপকটি অনন্য—শীতকে কুহেলি-উত্তরীয়-পরা ত্যাগী সন্ন্যাসী হিসেবে কল্পনা বাংলা কবিতায় বিরল। প্রকৃতি-চিত্র ঐশ্বর্যময়: বাতাবি নেবুর ফুল, আমের মুকুল, দখিনা সমীর, মাধবী কুঁড়ি—প্রতিটি চিত্রে ফাগুনের গন্ধ। বসন্ত-বর্ণনা ও কবির বিষণ্ণতার বৈপরীত্য কবিতার মর্ম। ভাষা সহজ, সুরেলা ও প্রবহমান; প্রশ্নবোধক ভঙ্গি পাঠককে সংলাপের অংশীদার করে।
১৯৩৮ সালে ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত—সুফিয়া কামালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। তখন তিনি সাতাশ বছর বয়সী তরুণী কবি; নারীকণ্ঠে বাংলা কবিতা তখনও বিরল ছিল। ব্রিটিশ-ভারতের শেষ দশকে, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যে, এই নির্মল প্রকৃতি-কবিতা পাঠককে মুগ্ধ করে। পরে কবিতাটি স্কুল-পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়; প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি ছাত্রছাত্রীর কবিতা-পরিচয় ঘটে এই কবিতার মাধ্যমে।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”