ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে—এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়,—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়;
হয়তো বা হাঁস হ’ব—কিশোরীর—ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,
সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে;
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়;
হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;
রূপ্সার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা বায়;—রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক: আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে—
কবি প্রতিজ্ঞা করছেন—তিনি আবার ফিরে আসবেন ধানসিড়ি নদীর তীরে, এই বাংলায়। হয়তো মানুষ হয়ে নয়—হয়তো শঙ্খচিল বা শালিখের বেশে; হয়তো ভোরের কাক হয়ে, কার্তিকের নবান্নের দেশে, কুয়াশার বুকে ভেসে আসবেন কাঁঠাল-ছায়ায়। হয়তো হাঁস হয়ে আসবেন—ভোরের বেলা, কিংবা সন্ধ্যায়। কবি কল্পনা করেন, একদিন বাংলার নদী-মাঠ-ঘাটে, পাখির ভিড়ে, ধবল বকের সারিতে তাকে দেখা যাবে—‘আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে’। অর্থাৎ মৃত্যু কবিকে বাংলার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না; তিনি প্রকৃতির অংশ হয়ে, পাখি হয়ে, কুয়াশা হয়ে বারবার ফিরে আসবেন। এই কবিতা জন্মভূমির প্রতি এমন গভীর প্রেমের ঘোষণা, যেখানে মৃত্যুও বাধা নয়। কবিতায় ‘হয়তো’ শব্দের বারবার আবর্তনে ফুটে উঠেছে এক ধরনের সুরেলা অনিশ্চয়তা—কবি জানেন না কী রূপে ফিরবেন, কিন্তু ফিরবেন—এই প্রত্যয় অটুট।
‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার মূলে আছে পুনর্জন্মের ধারণা—কিন্তু তা ধর্মীয় পুনর্জন্ম নয়; তা কবির একান্ত ব্যক্তিগত কামনা। জীবনানন্দ মৃত্যুকে মেনে নিয়েছেন, কিন্তু বিচ্ছেদ মানেননি—বাংলার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তাই তিনি মৃত্যুর পরের অস্তিত্বকে কল্পনা করেছেন বাংলার প্রকৃতির মধ্যে: শঙ্খচিল, শালিখ, ভোরের কাক, হাঁস, ধবল বক—এই পাখিরাই হবে তার নতুন দেহ। এই কল্পনায় আছে গভীর দর্শন—মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা নয়; মৃত্যুর পর মানুষ প্রকৃতিতেই মিশে যায়। ‘হয়তো’ শব্দের বারবার ব্যবহার লক্ষণীয়—কবি নিশ্চিত নন কীভাবে ফিরবেন, কিন্তু ফিরবেন—এই নিশ্চয়তা অটুট। এই দ্বিধা ও দৃঢ়তার মিলন কবিতাটিকে মানবিক করে তুলেছে। ধানসিড়ি নদীর উল্লেখ তাৎপর্যপূর্ণ—এটি বরিশালের একটি বাস্তব নদী, কবির শৈশবের নদী; ব্যক্তিগত স্মৃতি এখানে সার্বজনীন প্রতীকে রূপ নিয়েছে। কার্তিকের নবান্ন, কুয়াশা, কাঁঠাল-ছায়া, রাঙা মেঘ—এই চিত্রগুলো বাংলার ঋতুচক্রের; কবি ফিরতে চান এই চিরায়ত বাংলায়, যা কখনো বদলায় না। সনেট-আকৃতির (চৌদ্দ পংক্তি) এই কবিতায় অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মন্থর গতি ধ্যানমগ্ন ভাবের সঙ্গে মিলে গেছে। কবিতার শেষ পংক্তি—‘দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে’—পাঠককে সরাসরি সম্বোধন করে; ‘তুমি’ যেন প্রতিটি বাঙালি পাঠক। অর্থাৎ কবি প্রতিটি পাঠকের কাছেই প্রতিজ্ঞা করছেন—বাংলার প্রকৃতিতে তাকালেই তাকে পাওয়া যাবে। এই কবিতা পড়ে প্রবাসী বাঙালিরা কাঁদেন—কারণ তাদেরও একই আকাঙ্ক্ষা: মৃত্যুর পরেও বাংলায় ফেরা। জীবনানন্দ ১৯৫৪ সালে ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যান; ‘রূপসী বাংলা’ প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর তিন বছর পর। তাই এই ‘ফিরে আসা’র প্রতিজ্ঞা আজ আরও বেদনাদায়ক—কবি সত্যিই চলে গেছেন, কিন্তু তার কবিতার মধ্যে তিনি বারবার ফিরে আসেন, প্রতিটি পাঠকের কাছে। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের অন্যান্য সনেটের সঙ্গে এই কবিতা মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ জগৎ তৈরি করেছে—সেই জগতে বাংলার নদী, মাঠ, পাখি, কুয়াশা, ফসল—সবকিছু জীবন্ত। জীবনানন্দের সনেটগুলো পেত্রার্কীয় বা শেক্সপীয়রীয় রীতির অনুকরণ নয়; তিনি সনেটের চৌদ্দ পংক্তির কাঠামো নিয়েছেন, কিন্তু তাতে ঢেলেছেন একান্ত বাঙালি অনুভূতি—এই মৌলিকতাই তার সনেটকে বিশিষ্ট করেছে। ধানসিড়ি নদী আজও বরিশালে বয়ে চলেছে; পাঠকরা সেই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে এই কবিতা পড়েন—বাস্তব ও কবিতার এই মিলন বিরল। কবিতাটির পাঠ-ইতিহাসও তাৎপর্যপূর্ণ—‘রূপসী বাংলা’ প্রকাশের পর প্রথমে এটি বিদ্বানদের কবিতা ছিল; কিন্তু ধীরে ধীরে স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক, আবৃত্তি-মঞ্চ হয়ে এটি গণমানুষের কবিতায় পরিণত হয়। আজ বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের শোক-উৎসব—সবখানেই এই কবিতার পংক্তি শোনা যায়।
জন্মভূমি-প্রেম, পুনর্জন্ম, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা, মৃত্যু-উত্তর অস্তিত্ব
কবিতাটি সনেট-আকৃতির—চৌদ্দ পংক্তিতে রচিত, অক্ষরবৃত্ত ছন্দে। সনেটের সংযত কাঠামো কবির গভীর আবেগকে শৃঙ্খলার মধ্যে ধারণ করেছে। ‘হয়তো’ শব্দের পুনরাবৃত্তি কবিতায় একটি সুরেলা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে—যা শেষে দৃঢ় প্রত্যয়ে পরিণত হয়। চিত্রকল্প সম্পূর্ণ বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতি থেকে নেওয়া—ধানসিড়ি, শঙ্খচিল, নবান্ন, কুয়াশা, কাঁঠাল-ছায়া, ধবল বক; কোনো বিদেশি বা কৃত্রিম চিত্র নেই। পাঠককে সরাসরি সম্বোধন (‘আমারেই পাবে তুমি’) কবিতাটিকে ব্যক্তিগত চিঠির মতো অন্তরঙ্গ করে তুলেছে। ভাষা সহজ, ধ্যানমগ্ন ও সুরেলা; প্রতিটি পংক্তি যেন একটি করে চিত্রপট। সনেটের চৌদ্দ পংক্তির শৃঙ্খলা কবির আবেগকে সংযত রেখেছে—আবেগ উদ্বেল হলেও কাঠামো কখনো ভাঙেনি; এই সংযমই কবিতাটিকে শোকগাথার চেয়ে ধ্যানের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। প্রকৃতির চিত্রগুলো এতটাই সুনির্দিষ্ট যে পাঠক যেন নিজেই সেই কুয়াশা-ভেজা ভোরে দাঁড়িয়ে আছেন।
কবিতাটি ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে—কবির মৃত্যুর (১৯৫৪) তিন বছর পর। এই কাব্যের কবিতাগুলো রচিত হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে, যখন জীবনানন্দ বরিশালে থাকতেন এবং বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির মধ্যে ডুবে ছিলেন। ‘রূপসী বাংলা’ নামেই স্পষ্ট—এই কাব্য বাংলার রূপের বন্দনা। মরণোত্তর প্রকাশিত এই গ্রন্থ জীবনানন্দকে বাংলা কবিতার ইতিহাসে ‘রূপসী বাংলার কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় কবির মৃত্যু হয়—বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বেদনাদায়ক ঘটনা। তার মৃত্যুর পর পাঠক এই কবিতার ‘আবার আসিব ফিরে’ পংক্তিটিকে কবির আধ্যাত্মিক প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি হিসেবে পড়েন। আজ প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে এই কবিতা বিশেষভাবে জনপ্রিয়—জন্মভূমিতে ফেরার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষার কাব্যিক রূপ হিসেবে। কবির অকালমৃত্যুর পর এই কবিতা তার ‘আধ্যাত্মিক উইল’ হিসেবে পঠিত হয়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”