মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

হাঁস ছিল, সজারুও, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানি না ৷

বক কহে কচ্ছপে—’বাহবা কি ফুর্তি !
অতি খাসা আমাদের ‘বকচ্ছপ মূর্তি’ ৷’

টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা—
পোকা ছেড়ে শেষে কিগো খাবে কাঁচা লঙ্কা ?

ছাগলের পেটে ছিল না জানি কি ফন্দি,
চাপিল বিছার ঘাড়ে, ধড়ে মুড়ো সন্ধি !

জিরাফের সাধ নাই মাঠে–ঘাটে ঘুরিতে,
ফড়িঙের ঢং ধরি সেও চায় উড়িতে ৷

গরু বলে, ‘আমারেও ধরিল কি ও রোগে ?
মোর পিছে লাগে কেন হতভাগা মোরগে ?’

‘হাতিমি’র দশা দেখ–তিমি ভাবে জলে যাই
হাতি বলে, ‘এই বেলা জঙ্গলে চল ভাই ৷’
সিংহের শিং নাই এই বড় কষ্ট—
হরিণের সাথে মিলে শিং হল পষ্ট ৷

কবিতার সারসংক্ষেপ

ছড়ার শুরুতেই ঘোষণা—'ব্যাকরণ মানি না'। তারপর একের পর এক অসম্ভব প্রাণীর আবির্ভাব: হাঁস-সজারুর মিলনে হাঁসজারু, বক-কচ্ছপের মিলনে বকচ্ছপ-মূর্তি, টিয়ামুখো গিরগিটি, ছাগলের পেটের ফন্দি, বিছার ঘাড়ে চাপা, জিরাফের উড়তে চাওয়া, গরুর পেছনে মোরগের লাগা, হাতি-তিমির 'হাতিমি', আর শেষে সিংহের শিং নিয়ে হরিণের সঙ্গে মিলন। কোনো যুক্তি নেই, কোনো নীতিকথা নেই—শুধু শব্দের খেলা আর হাসির ফোয়ারা। 'খিচুড়ি' নামটাই বলে দেয়—এটি নানা অসম্ভবের এক মিশ্রণ, যেমন খিচুড়িতে মেশে নানা উপকরণ।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

সুকুমার রায়ের 'খিচুড়ি' পড়তে গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়ে ছড়ার প্রথম স্তবকের বন্ধনী-ঘোষণা—'(ব্যাকরণ মানি না)'। এ যেন পুরো ননসেন্স সাহিত্যের ইশতেহার। যুক্তি, ব্যাকরণ, বাস্তবতার সব নিয়মকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে কবি পাঠককে নিয়ে যান এমন এক জগতে, যেখানে হাঁস আর সজারু মিলে 'হাঁসজারু', বক আর কচ্ছপ মিলে 'বকচ্ছপ', হাতি আর তিমি মিলে 'হাতিমি'। এই সংকর প্রাণীদের নামকরণের কৌশলটিই ছড়ার প্রাণ—দুটি পরিচিত শব্দের অংশ জোড়া লাগিয়ে একেবারে নতুন, অচেনা, হাস্যকর একটি সত্তার জন্ম। শিশুরা এই খেলায় মাতে, কারণ তাদের কল্পনাও এমনই অবাধ; বড়োরাও হাসেন, কারণ তারা বোঝেন এই অযৌক্তিকতার পেছনে কতটা বুদ্ধির খেলা। ছড়াটির জন্ম ১৩২১ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যা 'সন্দেশ'-এ। তখন সুকুমার রায় 'সন্দেশ' পত্রিকার সম্পাদক; কালাজ্বরে ভুগতে ভুগতেও তিনি শিশুদের জন্য লিখে চলেছেন। 'আবোল তাবোল' নামে ধারাবাহিক ছড়ার সিরিজে 'খিচুড়ি' ছিল প্রথম দিকের রচনা। পরে, তাঁর মৃত্যুর মাত্র নয় দিন পর ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর 'আবোল তাবোল' বই আকারে প্রকাশিত হয়—বইয়ের ডামি কপি তিনি রোগশয্যায় শুয়েই তৈরি করে গিয়েছিলেন। 'খিচুড়ি' নামটি নিজেই একটি রূপক। খিচুড়ি যেমন চাল-ডাল-সবজির মিশ্রণ, এই ছড়াও তেমনি নানা অসম্ভব প্রাণী ও ঘটনার মিশ্রণ। প্রতিটি স্তবকে একটি করে 'খবর'—টিয়ামুখো গিরগিটির শঙ্কা, ছাগলের পেটের ফন্দি, জিরাফের উড়তে চাওয়া, গরুর পেছনে মোরগের লাগা। কোনো স্তবকের সঙ্গে পরের স্তবকের যৌক্তিক সম্পর্ক নেই; সম্পর্ক শুধু ছন্দের আর হাসির। এই অসংলগ্নতাই ননসেন্স ছড়ার মূল শর্ত—এডওয়ার্ড লিয়ার ও লুইস ক্যারলের ঐতিহ্যের সঙ্গে সুকুমারের যোগ এখানেই, যদিও তাঁর খেয়ালরসে আছে একান্ত বাঙালি মাটির গন্ধ। ধ্বনির দিক থেকে ছড়াটি অসাধারণ। 'হাঁস ছিল, সজারুও'—এই 'ও' ধ্বনির পুনরাবৃত্তি, 'ধড়ে মুড়ো সন্ধি'র মতো যুক্তাক্ষরের খেলা, 'হাতিমির দশা'র মতো ছোটো ছোটো ধাক্কা—পড়তে পড়তে মুখে এক ধরনের নাচন জাগে। শিশুরা এই ছড়া মুখস্থ করে ফেলে না বুঝেই; বোঝার দরকারও হয় না, কারণ ছড়ার আনন্দ তার অর্থে নয়, তার ধ্বনিতে আর চিত্রে। একশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও 'খিচুড়ি' বাংলা শিশুদের প্রথম প্রিয় ছড়াগুলোর একটি। এর কারণ, সুকুমার রায় শিশুমনকে সম্মান করতেন—তিনি জানতেন, শিশুরা যুক্তির দাস নয়, কল্পনার রাজা। '(ব্যাকরণ মানি না)'—এই ঘোষণা আসলে শিশুদের পক্ষে বড়োদের যুক্তিশাসনের বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহে আজও প্রতিটি শিশুপাঠক নিজের মুক্তির আনন্দ খুঁজে পায়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

ননসেন্স ছড়া, হাস্যরস, কল্পনার খেলা

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

দ্বিপংক্তিক স্তবকে গাঁথা ছড়া; প্রতি স্তবকে একটি করে সংকর প্রাণীর চিত্র। প্রধান কৌশল 'সন্ধি-নামকরণ'—দুটি পরিচিত প্রাণীর নামের অংশ জুড়ে নতুন নাম (হাঁস+সজারু=হাঁসজারু, বক+কচ্ছপ=বকচ্ছপ, হাতি+তিমি=হাতিমি)। ধ্বন্যাত্মক শব্দ ও যুক্তাক্ষরের খেলায় ছন্দে নাচনের গতি। '(ব্যাকরণ মানি না)'—এই বন্ধনী-পংক্তি ছড়াটিকে ননসেন্স সাহিত্যের ইশতেহারে পরিণত করেছে। ভাষা সহজ, চলতি ও মুখরোচক; কোনো কঠিন শব্দ নেই, ফলে ছোটো শিশুরাও পড়তে ও মুখস্থ করতে পারে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

ছড়াটি প্রথম প্রকাশিত হয় 'সন্দেশ' পত্রিকার মাঘ ১৩২১ সংখ্যায়, 'আবোল তাবোল' শিরোনামের ধারাবাহিক ছড়ার অংশ হিসেবে। তখন সুকুমার রায় (১৮৮৭–১৯২৩) 'সন্দেশ'-এর সম্পাদক এবং কালাজ্বরে শয্যাশায়ী। তাঁর মৃত্যুর নয় দিন পর, ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর 'আবোল তাবোল' গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ার বাংলায় শিশুসাহিত্য যখন নীতিকথা-সর্বস্ব ছিল, তখন সুকুমারের এই নির্মল খেয়ালরস ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা—এডওয়ার্ড লিয়ার ও লুইস ক্যারলের ননসেন্স ঐতিহ্যকে তিনি দিয়েছিলেন একান্ত বাঙালি রূপ।

সম্পর্কিত কবিতা

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।