হেনরি ফোর্ড (/ )
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | হেনরি ফোর্ড |
|---|---|
| ইংরেজি নাম | Henry Ford |
| জন্ম | ৩০ জুলাই ১৮৬৩ |
| জন্মস্থান | স্প্রিংওয়েলস টাউনশিপ (বর্তমান ডিয়ারবর্ন), মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র |
| মৃত্যু | ৭ এপ্রিল ১৯৪৭, ডিয়ারবর্ন, মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র |
| জাতীয়তা | মার্কিন |
| পেশা | শিল্পপতি, প্রকৌশলী, লেখক, জনহিতৈষী |
| শিক্ষা | অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা; পরে বাণিজ্যিক বিদ্যালয়ে বুককিপিং কোর্স |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | ফোর্ড মোটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠা, মডেল টি গাড়ি, চলন্ত অ্যাসেম্বলি লাইন |
| পুরস্কার | ইলিয়ট ক্রেসন পদক (১৯২৮) |
পরিচিতি
হেনরি ফোর্ড ছিলেন মার্কিন শিল্পপতি ও ফোর্ড মোটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। ভর-উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি অটোমোবাইলকে সাধারণ মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এনে দেন, যা পরিবহন ও আধুনিক শিল্পের চেহারা বদলে দেয়। শিল্পচিন্তা ও ব্যবসায়িক দর্শন নিয়ে তিনি কয়েকটি বই লেখেন, যার মধ্যে My Life and Work (১৯২২) সবচেয়ে পরিচিত। তাঁর নামে শিল্প-ব্যবস্থাপনার ধারা পরিচিত হয় ফোর্ডবাদ বা ফোর্ডিজম নামে।
জন্ম ও শিক্ষা
ফোর্ড ১৮৬৩ সালের ৩০ জুলাই মিশিগানের একটি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা উইলিয়াম ফোর্ড আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি কর্কে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; মাতা মেরি লিটোগট ছিলেন বেলজিয়ান অভিবাসী পরিবারের কন্যা। মাত্র অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে তিনি ১৬ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে ডেট্রয়েটে যান ও যন্ত্রবিদের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল; বাল্যকালে পকেটঘড়ি খুলে-জোড়া লাগানোর ঘটনা তাঁর জীবনীতে উল্লেখিত আছে। মাতার মৃত্যুর (১৮৭৬) পর কৃষিকাজের বদলে যন্ত্র-কারিগরির পথ বেছে নেন তিনি।
কর্মজীবন
১৮৯১ সালে ফোর্ড ডেট্রয়েটের এডিসন ইলিউমিনেটিং কোম্পানিতে প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন এবং ১৮৯৩ সালে প্রধান প্রকৌশলী হন। অবসর সময়ে পেট্রল-ইঞ্জিন নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে ১৮৯৬ সালে তিনি প্রথম স্ব-চালিত যান তৈরি করেন, যার নাম দেন কোয়াড্রিসাইকেল। কয়েকটি ব্যর্থ উদ্যোগের পর ১৯০৩ সালের ১৬ জুন তিনি ফোর্ড মোটর কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৮ সালে বাজারে আসে মডেল টি গাড়ি — সস্তা, মেরামত-সহজ ও টেকসই এই গাড়ি দ্রুত আমেরিকার রাস্তা দখল করে। ১৯১৩ সালে কারখানায় চলন্ত অ্যাসেম্বলি লাইন চালু হয় এবং ১৯১৪ সালে তিনি কারখানা-শ্রমিকদের দৈনিক ৫ ডলার মজুরি ঘোষণা করেন, যা তৎকালীন সময়ে অভূতপূর্ব ছিল। ১৯২৭ সালে মডেল টি-র উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় দেড় কোটি ইউনিট তৈরি হয়। ফোর্ড কোম্পানির সভাপতি ছিলেন ১৯০৬–১৯১৯ ও ১৯৪৩–১৯৪৫ মেয়াদে।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
ফোর্ড তাঁর শিল্প-দর্শন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকটি বই লেখেন, যেগুলো তিনি স্যামুয়েল ক্রাউদারের সহযোগিতায় রচনা করেন বলে উল্লেখিত হয়। তাঁর রচনাগুলো হলো:
- My Life and Work (১৯২২) — আত্মজীবনী ও শিল্প-দর্শন; ব্যবসা, শ্রমিক-নীতি ও উৎপাদন-পদ্ধতি নিয়ে তাঁর চিন্তার সংকলন।
- Today and Tomorrow (১৯২৬) — ফোর্ড মোটর কোম্পানির কারিগরি প্রক্রিয়া ও শ্রম-নীতির বিবরণসহ ব্যবসায়ের প্রকৃতি নিয়ে প্রতিফলন।
- Edison as I Know Him (১৯৩০) — টমাস এডিসনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ও স্মৃতিচারণ।
- My Philosophy of Industry — শিল্প-দর্শনের সংকলন।
তাঁর লেখায় সেবা-ভিত্তিক ব্যবসা, অপচয় রোধ ও শ্রমিকের মর্যাদার কথা বারবার উঠে এসেছে। উল্লেখ্য, ১৯২০-এর দশকে তাঁর মালিকানাধীন পত্রিকা The Dearborn Independent-এ ইহুদি-বিরোধী লেখা প্রকাশিত হয়, যা পরে The International Jew নামে বই আকারে সংকলিত হয় — এটি তাঁর জীবনের একটি বহুল-সমালোচিত অধ্যায়।
ব্যক্তিগত জীবন
১৮৮৮ সালে ফোর্ড ক্লারা জেন ব্রায়ান্টকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান এডসেল ফোর্ড (১৮৯৩–১৯৪৩)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম বছরগুলোতে তিনি শান্তিবাদের পক্ষে প্রচার চালান। পুত্র এডসেলের মৃত্যুর পর ১৯৪৩ সালে তিনি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসেন, তবে তখন তিনি শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল ছিলেন। ১৯৪৫ সালে তিনি কোম্পানি নাতি হেনরি ফোর্ড দ্বিতীয়ের হাতে তুলে দেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৪৭ সালের ৭ এপ্রিল মিশিগানের ফেয়ার লেনে ৮৩ বছর বয়সে ফোর্ড মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বিশাল সম্পদের বড় অংশ ফোর্ড ফাউন্ডেশনে দান করা হয় — ১৯৩৬ সালে পুত্র এডসেলের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠিত এই ফাউন্ডেশন আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনহিতকর প্রতিষ্ঠান। সস্তায় গাড়ি, অ্যাসেম্বলি লাইন ও উচ্চ মজুরির ধারণা — এগুলোর মাধ্যমে তিনি বিংশ শতকের শিল্প-সভ্যতার গতিপথ বদলে দেন।