মূল কন্টেন্টে যান
সাইয়েদ মুহাম্মাদ আমীনুল ইহসান

সাইয়েদ মুহাম্মাদ আমীনুল ইহসান

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (প্রচলিত বানানভেদে ‘আমীনুল ইহসান’)
জন্ম ২৪ জানুয়ারি ১৯১১ (২২ মুহাররম ১৩২৯ হি.), পাঁচনা গ্রাম, মুঙ্গের জেলা, বিহার, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু ২৭ অক্টোবর ১৯৭৪ (১০ শাওয়াল ১৩৯৫ হি.), ঢাকা, বাংলাদেশ
জাতীয়তা বাংলাদেশি
মাযহাব হানাফী
পেশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকীহ, মুফতী, অধ্যাপক, খতিব
উপাধি মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকীহ, মুফতিয়ে আযম
উল্লেখযোগ্য কর্ম ফিকহুস সুনান ওয়াল আসার, সীরাতে হাবিবে ইলাহ, তারীখে ইসলাম, তারীখে ইলমে হাদীস, আদাবুল মুফতী, কাওয়ায়েদুল ফিকহ, ফাতাওয়ায়ে বারকাতীয়া; মোট দুই শতাধিক গ্রন্থ
পুরস্কার ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ স্বর্ণপদক ও সনদ (মরণোত্তর, ১৯৮৪)

পরিচিতি

মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (১৯১১–১৯৭৪) বাংলাদেশের বিংশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী পণ্ডিত। একাধারে তিনি ছিলেন খতিব, ফকীহ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ইতিহাসবিদ, সিরাতবিদ ও সাহিত্যিক। কলকাতা আলিয়া ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় দীর্ঘ অধ্যাপনার পর তিনি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের প্রথম খতিব হিসেবে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত — মৃত্যুর আগ পর্যন্ত — দায়িত্ব পালন করেন। তার রচিত গ্রন্থাবলীর অনেকগুলো মিসরের জামে আল-আযহার, ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দসহ আরব বিশ্ব ও উপমহাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য, এবং বাংলাদেশের ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত।

জন্ম ও পরিচিতি

আমীমুল ইহসান ১৯১১ সালের ২৪ জানুয়ারি (হিজরী ২২ মুহাররম ১৩২৯) ভারতের বিহার প্রদেশের মুঙ্গের জেলার পাঁচনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হাকিম আবদুল মান্নান ও মাতা সৈয়দা সাজেদা। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় ছিলেন। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় ‘মুহাম্মাদ’ এবং লকব দেওয়া হয় ‘আমীমুল ইহসান’। দাদা সাইয়্যেদ নুরুল হাফেয আল-কাদেরী ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক ও কুরআনের বিশেষ জ্ঞানী। বংশ-তালিকা নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমা (রা.) পর্যন্ত পৌঁছানোর কারণে পরিবারের পূর্বপুরুষেরা নামের আগে ‘সাইয়্যেদ’ ব্যবহার করতেন।

শিক্ষাজীবন

পিতা ও চাচার নিকট থেকে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের পর আমীমুল ইহসান মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিন মাসের মধ্যে চাচা আবদুদ দাইয়ানের নিকট ৩০ পারা কুরআন খতম করেন। চাচা এরপর তাকে ফার্সি ভাষা শেখান। পাঞ্জাবের সুফি বরকত আলীর নিকট তিনি দুই বছর ধরে আরবী ব্যাকরণ, উচ্চতর ফার্সি সাহিত্য ও তাজবীদের প্রাথমিক জ্ঞান গ্রহণ করেন এবং পরে তার মুরীদ হন — এজন্যই নামের শেষে ‘বারকাতী’ যুক্ত হয়।

১৯২৬ সালে পনেরো বছর বয়সে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে আলিম পরীক্ষায় হাদীস বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৩১ সালে ফাযিল এবং ১৯৩৩ সালে হাদীসে কামিল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক ও ‘মুমতাজুল মুহাদ্দিসিন’ উপাধি পান। ১৯৩৪ সালে তিনি তার উস্তাদ মুফতী মুশতাক আহমেদ কানপুরীর নিকট থেকে মুফতী সনদ লাভ করেন।

কর্মজীবন

১৯৩৪ সালে আমীমুল ইহসান কলকাতার নাখোদা মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ও নাখোদা মসজিদের সহকারী ইমাম নিযুক্ত হন। ১৯৩৫ সালে তিনি নাখোদা মাদ্রাসার দারুল ইফতার প্রধান মুফতীর দায়িত্ব পান (১৯৪৩ পর্যন্ত) এবং একই বছর কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষ তাকে ‘গ্রান্ড মুফতী অফ কলকাতা’ সীলমোহর ও পদবি প্রদান করে — এখান থেকেই তিনি ‘মুফতী-এ-আযম’ উপাধি পান। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে মধ্য কলকাতার কাজী নিয়োগ করে। ১৯৪০ সালে তিনি আঞ্জুমানে কুররায়ে বাংলার (বাংলার ক্বারী সমিতি) সভাপতি হন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় টাইটেল কামিল শ্রেণীতে হাদীস, তাফসীর ও ফিকহ পড়ান।

দেশবিভাগের পর ১৯৪৭ সালের ২২ আগস্ট তিনি ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় যুক্ত হন। ১৯৪৯ সালে ধর্মীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন এবং ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসার হেড মাওলানা ছিলেন। তিনি ব্যাখ্যাসহ বুখারী শরীফ পড়াতেন — নিজের উক্তি অনুযায়ী কমপক্ষে পঁচিশবার। ১৯৬৯ সালের ১ অক্টোবর লেখালেখির জন্য তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৬৪ সালে বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদ প্রতিষ্ঠার পর কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তিনি প্রথম খতিব নিযুক্ত হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ঢাকায় এসে তিনি একটি ভাঙ্গা মসজিদ পুনর্নির্মাণ করে ‘নকশবন্দী মসজিদ’ নাম দেন; পরে এটি ‘মসজিদে মুফতী-এ আযম’ নামে পুনর্নির্মিত হয়।

রচনাবলী

আমীমুল ইহসান দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন — তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, সীরাত, ইতিহাস, ব্যাকরণ ও উর্দু সাহিত্য সব শাখাতেই। উল্লেখযোগ্য: ফিকহুস সুনান ওয়াল আসার, সীরাতে হাবিবে ইলাহ, তারীখে ইসলাম, আদাবুল মুফতী, ফাতাওয়ায়ে বারকাতীয়া। প্রধান গ্রন্থগুলো আল-আযহার, দেওবন্দসহ আরব বিশ্ব ও বাংলাদেশের কওমী-আলিয়া মাদ্রাসায় পাঠ্য; তার ‘কিতাবুল আওকাত’-এর ওপর ভিত্তি করেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নামাযের সময়সূচি নির্ধারিত হয়।

ব্যক্তিগত জীবন

আমীমুল ইহসান ১৯২২ সালে মায়মুনাকে বিয়ে করেন; এই স্ত্রী ১৯২৯ সালে মারা যান। এরপর ১৯৩০ সালে ফাতেমাকে বিয়ে করেন; তিনিও ১৯৩৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি খাদিজাকে বিয়ে করেন, যিনি ১৯৮৫ সালে মারা যান। দ্বিতীয় স্ত্রী ফাতেমার গর্ভে তার এক পুত্র ও এক কন্যা জন্মগ্রহণ করেন; কন্যা আমেনা খাতুন ১৯৯১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি জীবনে তিনবার হজ্জ পালন করেন — ১৯৫৪ সালে প্রথম, ১৯৬৮ সালে সস্ত্রীক দ্বিতীয়বার এবং ১৯৭১ সালে তৃতীয়বার। অবসর সময়ে বই পড়তে পছন্দ করতেন; তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে সাড়ে তিন হাজারের অধিক ইসলামী বই ছিল, যার মধ্যে কিছু প্রাচীন ও দুর্লভ কিতাব ছিল তার পীর, শিক্ষক ও শ্বশুরের দেওয়া।

পুরস্কার ও মৃত্যু

ইসলামের সেবা ও দাওয়াতি কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে তাকে মরণোত্তর স্বর্ণপদক ও সনদ প্রদান করে।

১৯৭৪ সালের ২৭ অক্টোবর (হিজরী ১০ শাওয়াল ১৩৯৫) ৬৩ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাসভবনে তার মৃত্যু হয়। তাকে ঢাকাতেই দাফন করা হয়। প্রতি বছর তার মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠান পালিত হয়।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।