সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| পূর্ণ নাম | সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী |
|---|---|
| জন্ম | ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ |
| জন্মস্থান | ঔরঙ্গাবাদ, হায়দ্রাবাদ রাজ্য, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান মহারাষ্ট্র, ভারত) |
| মৃত্যু | ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯, বাফেলো, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র |
| জাতীয়তা | পাকিস্তানি |
| পেশা | ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক, সাংবাদিক, সংগঠক |
| শিক্ষা | প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে স্বশিক্ষা; ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষায় ইজাযা (সনদ) প্রাপ্ত; আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় পারদর্শী |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | তাফহীমুল কুরআন (ছয় খণ্ডের কুরআন তাফসির), খুতবাত (Khutabat), Human Rights in Islam, The Islamic Law and Constitution |
| পুরস্কার | কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার (১৯৭৯) — ইসলামের সেবায় প্রথম প্রাপক |
পরিচিতি
সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী (২৫ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ – ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন বহুল-আলোচিত ইসলামী চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নিয়ে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে সক্রিয় ছিলেন। কুরআনের তাফসির, হাদিস, আইন, দর্শন ও ইতিহাস — নানা শাখায় তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো মূলত উর্দুতে লেখা হলেও পরবর্তীতে ইংরেজি, আরবি, বাংলা, হিন্দিসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়। ১৯৪১ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এর প্রথম আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রচনা ও চিন্তাধারা দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে ধর্মীয়-রাজনৈতিক আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ফেলে আসছে।
জন্ম ও শৈশব
১৯০৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন হায়দ্রাবাদ রাজ্যের ঔরঙ্গাবাদ শহরে মওদুদীর জন্ম। তিনি ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ। বাবা আহমদ হাসান পেশায় ছিলেন আইনজীবী। নয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বাবা ও বাবার নিয়োগ করা শিক্ষকদের কাছে ধর্মীয় শিক্ষা পান; এই শিক্ষার মধ্যে ছিল আরবি, ফারসি, ইসলামী আইন ও হাদিস। বাল্যকালে তিনি মেধাবী বলে বিবেচিত হন — এগারো বছর বয়সে কাসিম আমিনের আরবি গ্রন্থ আল-মারাআ আল-জাদিদা (নতুন নারী) থেকে উর্দুতে অনুবাদ করেন বলে উল্লেখ আছে।
শিক্ষা ও সাংবাদিকতা
এগারো বছর বয়সে তিনি ঔরঙ্গাবাদের মাদরাসা ফওকানিয়া মাশরিকিয়ায় (ওরিয়েন্টাল হাই স্কুল) সরাসরি অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন; এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসলামী আধুনিকতাবাদী চিন্তাবিদ শিবলি নোমানী। সেখানে দর্শন ও গণিত-পদার্থবিজ্ঞানের মতো আধুনিক বিষয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মে। পরে তিনি হায়দ্রাবাদের দারুল উলুমে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করেন। বাবার মৃত্যুর পর অর্থাভাবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়; ১৯১৯ সালে, ষোল বছর বয়সে তিনি দিল্লিতে চলে যান এবং স্বশিক্ষায় পাশ্চাত্য দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। এ সময়ে তিনি ইংরেজি ও জার্মান ভাষা শেখেন এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শাস্ত্রে ইজাযা (সনদ) অর্জন করেন, যদিও তিনি নিজেকে প্রথাগত অর্থে ‘আলেম’ বলে পরিচয় দিতেন না।
খুব অল্প বয়সেই তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯২০ সালে, সতেরো বছর বয়সে, তিনি উর্দু সাপ্তাহিক পত্রিকা তাজ-এর সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯২৪ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি রক্ষণশীল মুসলিম গোষ্ঠীর পত্রিকা আল-জামিআ সম্পাদনা করেন। ১৯৩২ সালে তিনি তারজুমান আল-কুরআন পত্রিকায় যোগ দেন — এই পত্রিকাই তাঁর ধর্মীয়-রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রধান প্রকাশমাধ্যমে পরিণত হয়। ১৯৩২ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে তিনি ইসলামী পুনর্জাগরণ ও ইসলামকে একটি আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ধারণা বিকশিত করেন।
সাহিত্যকর্ম
মওদুদী তাঁর জীবদ্দশায় শতাধিক গ্রন্থ ও পুস্তিকা রচনা করেন। তাঁর সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী কাজ তাফহীমুল কুরআন — কুরআনের ছয় খণ্ডের অনুবাদ ও তাফসির, যার লেখা তিনি ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে (১৩৬১ হিজরির মহররমে) শুরু করেন এবং বহু বছর ধরে সম্পন্ন করেন। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে আছে খুতবাত (Khutabat), Human Rights in Islam, The Islamic Law and Constitution ও Political Theory of Islam। তাঁর রচনা কুরআনের ব্যাখ্যা, হাদিস, আইন, দর্শন ও ইতিহাসসহ নানা শাখা নিয়ে রচিত।
জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক ভূমিকা
১৯৩০-এর দশকের শেষদিকে মওদুদী মুসলমানদের জন্য একটি দাওয়াতি (প্রচারমূলক) সংগঠন গড়ার পরিকল্পনা শুরু করেন, যা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ — উভয়ের বিকল্প হবে। ১৯৪১ সালের আগস্টে তিনি ব্রিটিশ ভারতে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা আমির হন। প্রতিষ্ঠার শুরুতে আমিন আহসান ইসলাহি, মুহাম্মদ মানজুর নোমানী, আবুল হাসান আলি নদভি ও নঈম সিদ্দিকী প্রমুখ তাঁর মিশনকে সমর্থন করেন।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মওদুদী ও জামায়াতে ইসলামী ভারত বিভাগের বিরোধিতা করে। দেশভাগের পর তিনি লাহোরে চলে যান, যা নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৪৭ সালে জামায়াতে ইসলামী দেশভেদে বিভক্ত হয়: মওদুদীর নেতৃত্বাধীন অংশ জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান নামে পরিচিত হয়, আর ভারতে থাকা অংশ জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আরও শাখা গঠিত হয়। মওদুদী ১৯৪১ থেকে ১৯৭২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আমিরের দায়িত্বে ছিলেন; তাঁর পরে পাকিস্তানে মিয়া তুফাইল মোহাম্মদ আমির হন।
পাকিস্তানে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ হন। প্রথম গ্রেপ্তার হয় ১৯৪৮ সালে। ১৯৫৩ সালে তিনি আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রচারণায় অংশ নেন এবং ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড পান, যা পরে কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং অবশেষে তিনি মুক্তি পান। ১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পতন এবং ১৯৭৭ সালে জুলফিকার আলি ভুট্টোর সরকারের পতনে তাঁর দল ভূমিকা রাখে বলে উল্লেখ করা হয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা
১৯৭৯ সালে সৌদি আরবের কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার চালু হলে মওদুদী ইসলামের সেবা বিভাগে এর প্রথম প্রাপক হন। এছাড়া সৌদি আরবের মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি ভূমিকা রাখেন।
মৃত্যু
১৯৭৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, ৭৫ বছর বয়সে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো শহরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মওদুদীর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর মক্কার কাবা চত্বরে রাষ্ট্রীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয় বলে উল্লেখ আছে। তাঁর রচনা বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হয়ে আজও অধ্যয়ন করা হয়।