মূল কন্টেন্টে যান
সমরেশ মজুমদার

সমরেশ মজুমদার

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম সমরেশ মজুমদার
জন্ম ১০ মার্চ ১৯৪২ (বাংলা ১৩৪৮, ২৬ ফাল্গুন; কোনো কোনো সূত্রে ১৯৪১)
জন্মস্থান গয়েরকাটা, জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
মৃত্যু ৮ মে ২০২৩, কলকাতা, ভারত
জাতীয়তা ভারতীয়
পেশা ঔপন্যাসিক, গল্পকার, চিত্রনাট্যকার
শিক্ষা জলপাইগুড়ি জেলা স্কুল; স্কটিশ চার্চ কলেজ, কলকাতা (বাংলায় স্নাতক); কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর)
উল্লেখযোগ্য রচনা ‘উত্তরাধিকার’, ‘কালবেলা’, ‘কালপুরুষ’, ‘মৌষলকাল’, ‘সাতকাহন’, ‘গর্ভধারিণী’, ‘গঙ্গা’, ‘দায়বন্ধন’, ‘বন্দীনিবাস’; গোয়েন্দা অর্জুন সিরিজ
পুরস্কার সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৪), আনন্দ পুরস্কার (১৯৮২), বঙ্কিম পুরস্কার (২০০৯), বঙ্গবিভূষণ (২০১৮)

পরিচিতি

সমরেশ মজুমদার (১০ মার্চ ১৯৪২ – ৮ মে ২০২৩) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুমুখী ঔপন্যাসিক। অনিমেষ-কেন্দ্রিক ‘উত্তরাধিকার–কালবেলা–কালপুরুষ–মৌষলকাল’ সিরিজ তাঁকে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছে; এই সিরিজের দ্বিতীয় খণ্ড ‘কালবেলা’র জন্য তিনি ১৯৮৪ সালে ভারতের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। ষাটের দশকের শেষ থেকে পাঁচ দশকের লেখকজীবনে তিনি দুই শতাধিক উপন্যাস, গল্প, গোয়েন্দাকাহিনী, কিশোরসাহিত্য ও ভ্রমণকাহিনী রচনা করেছেন। ডুয়ার্সের চা বাগানের শৈশব থেকে কলকাতার নাগরিক জীবন — বাংলার সমাজ ও রাজনীতির দলিল হিসেবে তাঁর লেখা আজও পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক।

জন্ম ও শিক্ষা

সমরেশ মজুমদার ১৯৪২ সালের ১০ মার্চ (বাংলা ১৩৪৮ সনের ২৬ ফাল্গুন) পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গয়েরকাটায় জন্মগ্রহণ করেন। (উল্লেখ্য, তাঁর বাংলা উইকিপিডিয়া নিবন্ধের তথ্যবাক্সে জন্মসাল ১৯৪১ উল্লেখ থাকলেও নিবন্ধের মূল পাঠে ১৯৪২ বলা হয়েছে; অন্য কিছু সূত্রেও ১৯৪১ পাওয়া যায়।) বাবা কৃষ্ণদাস মজুমদার, মা শ্যামলী দেবী। শৈশব কেটেছে ডুয়ার্সের গয়েরকাটা চা বাগানে; ভবানী মাস্টারের পাঠশালায় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়, পরে তিনি জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে পড়েন। ১৯৬০ সালে তিনি কলকাতায় আসেন; স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন

কর্মজীবনে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন (বিভিন্ন সূত্রে আনন্দবাজার পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেডের নাম পাওয়া যায়)। গ্রুপ থিয়েটারের প্রতি তাঁর প্রবল আসক্তি ছিল; এই মঞ্চ-চেতনাই তাঁর গল্প বলার ভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন।

সাহিত্যজীবন

লেখকজীবনের শুরু মঞ্চনাটক হিসেবে লেখা ‘অন্যমাত্রা’ দিয়ে; ১৯৬৭ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় তা ছাপা হয় — এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প। ১৯৭৫ সালে ‘দেশ’-এই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’। তাঁকে সর্বাধিক খ্যাতি এনে দেয় অনিমেষ–মাধবীলতা–অর্কের কাহিনী নিয়ে লেখা সিরিজ — ‘উত্তরাধিকার’, ‘কালবেলা’, ‘কালপুরুষ’ ও ‘মৌষলকাল’। ষাট-সত্তরের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতি, নকশাল আন্দোলন ও বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন এই উপন্যাসগুলোর প্রাণ। ‘কালবেলা’ ১৯৮৪ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পায়; গোটা সিরিজই আজ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক হিসেবে গণ্য।

কিশোর পাঠকের কাছে তিনি অমর গোয়েন্দা ‘অর্জুন’-এর স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত — জলপাইগুড়ির কিশোর গোয়েন্দা অর্জুন ও তার প্রশিক্ষক অমল শোমের অভিযান নিয়ে লেখা বহু কিশোর-উপন্যাস আজও জনপ্রিয়। নারী-কেন্দ্রিক উপন্যাসেও তাঁর খ্যাতি অসামান্য: ‘সাতকাহন’-এর দীপাবলী — প্রতিকূল সমাজের বিরুদ্ধে এক নারীর সংগ্রামের কাহিনী — বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় নারীচরিত্র। এ ছাড়া ‘গর্ভধারিণী’, ‘গঙ্গা’, ‘দায়বন্ধন’, ‘বন্দীনিবাস’, ‘বুনোহাঁস’, ‘আট কুঠুরি নয় দরজা’, ‘তেরো পার্বণ’, ‘স্বপ্নের বাজার’, ‘অনুরাগ’, ‘উজানগঙ্গা’সহ দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। শহরকেন্দ্রিক জীবনের ঘনিষ্ঠ আলেখ্যের জন্য তাঁকে ‘আপাদমস্তক আরবান লেখক’ বলেও বর্ণনা করা হয়।

অনিমেষ সিরিজ ও প্রধান চরিত্র

সমরেশ মজুমদারের সবচেয়ে আলোচিত সৃষ্টি অনিমেষ-কেন্দ্রিক সিরিজ। ‘উত্তরাধিকার’-এ অনিমেষের বেড়ে ওঠা, ‘কালবেলা’য় ষাট-সত্তরের উত্তাল রাজনীতিতে তার জড়িয়ে পড়া, ‘কালপুরুষ’ ও ‘মৌষলকাল’-এ পরবর্তী প্রজন্মের গল্প — এই চারটি উপন্যাস মিলে বিংশ শতকের মাঝামাঝি বাংলার সমাজ ও রাজনীতির এক বহুমাত্রিক দলিল। এই সিরিজের সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্র মাধবীলতা — অনিমেষের প্রেমিকা, যিনি নিজে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক হয়েও প্রেমিকের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে অটল সমর্থন জুগিয়েছেন এবং পুলিশি নির্যাতনের মুখেও মাথা নত করেননি। সাহিত্য-সমালোচকরা মাধবীলতাকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহসী নারীচরিত্র হিসেবে গণ্য করেন। অনিমেষ ও মাধবীলতার সন্তান অর্ক পরবর্তী খণ্ডগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্র। লেখক নিজে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ষাট-সত্তরের ছাত্ররাজনীতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়া অনিমেষ ও তার বন্ধুদের চরিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন না।

চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন

তাঁর কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে একাধিক ধারাবাহিক ও চলচ্চিত্র — ধারাবাহিক ‘তেরো পার্বণ’ (১৯৮৯) ও ‘সাতকাহন’; চলচ্চিত্র ‘আত্মীয়স্বজন’ (১৯৯৮), ‘কালবেলা’ (২০০৯), ‘বুনোহাঁস’ এবং ‘অর্জুন: কালিম্পঙে সীতাহরণ’ (২০১৩)। চিত্রনাট্যকার হিসেবে ১৯৮২ সালে তিনি বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, দিশারী ও চলচ্চিত্র প্রসার সমিতির শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার পুরস্কার পান। টেলিভিশন ধারাবাহিকের কাহিনিকার হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল।

লেখার বিষয়বৈচিত্র্য

শুধু গল্প-উপন্যাসেই সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি নিজেকে। ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, গোয়েন্দাকাহিনী, কিশোর উপন্যাস — প্রতিটি শাখায় তাঁর অবদান রয়েছে। ‘সওয়ার’, ‘টাকাপয়সা’, ‘তীর্থযাত্রী’, ‘ভালবাসা থেকে যায়’, ‘ডানায় রোদের গন্ধ’, ‘জলছবির সিংহ’, ‘মেয়েরা যেমন হয়’, ‘স্বপ্নের বাজার’, ‘কলিকাল’, ‘জনযাজক’, ‘জলের নিচে প্রথম প্রেম’, ‘মেঘ ছিল বৃষ্টিও’, ‘হরিণবাড়ি’, ‘ঊনিশ বিশ’, ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি’, ‘সিংহবাহিনী’ — তাঁর গ্রন্থতালিকা দীর্ঘ। ‘অর্জুন সমগ্র’ (৫ খণ্ড), ‘গল্প সমগ্র’ (২ খণ্ড) ও ‘উপন্যাস সমগ্র’ (৩ খণ্ড) তাঁর রচনার সংকলন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। চা বাগানের মদেসিয়া সমাজ থেকে কলকাতার নিম্নবিত্ত মানুষ — তাঁর কলমে উঠে এসেছেন রক্তমাংসের চরিত্র হয়ে।

ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রকাশ্যে খুব বেশি তথ্য নেই। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর মেয়ে দোয়েল মজুমদার।

পুরস্কার ও সম্মাননা

  • আনন্দ পুরস্কার — ১৯৮২
  • সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার — ১৯৮৪ (‘কালবেলা’ উপন্যাসের জন্য)
  • বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, দিশারী ও চলচ্চিত্র প্রসার সমিতি পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার — ১৯৮২
  • বঙ্কিম পুরস্কার — ২০০৯ (‘কলকাতায় নবকুমার’-এর জন্য)
  • বঙ্গবিভূষণ সম্মান, পশ্চিমবঙ্গ সরকার — ২০১৮
  • এবিপি আনন্দ ‘সেরা বাঙালি’ — ২০১৮

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভুগছিলেন তিনি। ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন; ৮ মে সন্ধ্যায় সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যুকে ‘সাহিত্যজগতের অপূরণীয় ক্ষতি’ বলে শোক জানান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও শোকবার্তা দেন — তিনি বলেন, সমরেশ মজুমদার বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এবং তাঁর লেখনীতে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় শোক জানিয়ে বলেন, সমরেশ তাঁর চেয়ে ছোট ছিলেন; তিনি চলে গেলেও তাঁর কাজ বেঁচে থাকবে। চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ স্মরণ করেন, উত্তরবঙ্গের ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশকের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, ডুয়ার্স অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন ও হতাশা সমরেশ মজুমদারের লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। আজও অনিমেষ–মাধবীলতা–অর্জুন–দীপাবলীর স্রষ্টা হিসেবে তিনি বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে আছেন।

প্রোফাইল ছবি: Wikimedia Commons (CC BY 3.0 — Biswarup Ganguly (own work))

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।