শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
| পূর্ণ নাম | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
| ছদ্মনাম | অনিলা দেবী |
| জন্ম | ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬ (৩১ ভাদ্র, ১২৮৩ বঙ্গাব্দ) |
| জন্মস্থান | দেবানন্দপুর, হুগলি (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত) |
| মৃত্যু | ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮, কলকাতা |
| জাতীয়তা | বাঙালি (ব্রিটিশ ভারতীয়) |
| পেশা | ঔপন্যাসিক, গল্পকার |
| শিক্ষা | আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অসমাপ্ত — পাঠশালা, ভাগলপুর ও হুগলির বিদ্যালয়; দারিদ্র্যের কারণে ১৮৯২ সালে পাঠ বন্ধ হয় |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | দেবদাস, শ্রীকান্ত, পথের দাবী, পরিণীতা, চরিত্রহীন, গৃহদাহ, দত্তা, দেনাপাওনা, শেষ প্রশ্ন |
| পুরস্কার | জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯২৩); ডিলিট (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৩৬); ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ উপাধি |
পরিচিতি
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬ – ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকদের একজন। ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ নামে তিনি খ্যাত — জনপ্রিয়তার এই উপাধি বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় কোনো লেখকের জোটেনি। গ্রামের মানুষের জীবন, নিপীড়িত নারীর দুঃখ-যন্ত্রণা ও সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরা শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ভারতবর্ষের প্রধান ভাষাগুলোতে অনূদিত হয়েছে এবং বারবার চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে।
জন্ম ও শিক্ষা
১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে শরৎচন্দ্রের জন্ম। বাবা মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও মা ভুবনমোহিনী দেবী। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। দারিদ্র্যের কারণে তার পরিবার দীর্ঘদিন ভাগলপুরে মামাবাড়িতে থাকত — ফলে শৈশবের বড় অংশ কেটেছে সেখানেই।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা তার পুরোপুরি হয়নি। পাঁচ বছর বয়সে দেবানন্দপুরের প্যারী পণ্ডিতের পাঠশালায়, পরে ভাগলপুরের দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয় ও জেলা স্কুলে, শেষে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে তিনি পড়েন। কিন্তু ১৮৯২ সালে স্কুলের ফি দিতে না পারায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্বশিক্ষায় তিনি গভীর পাঠক ও পণ্ডিত হয়ে ওঠেন।
কর্মজীবন
যুবক বয়সে শরৎচন্দ্র নানা পেশায় জড়ান। ১৯০৩ সালে তিনি বার্মায় (তৎকালীন রেঙ্গুন) যান এবং সরকারি অফিসে কেরানির চাকরি নেন। বার্মায় থাকাকালীনই তার লেখকজীবনের ভিত্তি রচিত হয়। পরবর্তীতে দেশে ফিরে তিনি হাওড়ার বাজে শিবপুরে দীর্ঘ এগারো বছর থাকেন; ১৯২৩ সালে হাওড়ার সামতা গ্রামে নিজের বাড়ি তৈরি করে সেখানেই জীবনের শেষ বারো বছর কাটান — এই বাড়ি আজ ‘শরৎচন্দ্র কুটি’ নামে পরিচিত।
সাহিত্যজীবন
শরৎচন্দ্রের প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস বড়দিদি (১৯১৩)। এরপর একে একে আসে পরিণীতা (১৯১৪), পল্লীসমাজ (১৯১৬), দেবদাস (১৯১৭), চরিত্রহীন (১৯১৭), শ্রীকান্ত (চার খণ্ডে, ১৯১৭–১৯৩৩), দত্তা (১৯১৮), গৃহদাহ (১৯২০), পথের দাবী (১৯২৬) ও শেষ প্রশ্ন (১৯৩১)। দেনাপাওনা, মেজদিদিসহ তার ছোটগল্পও সমান জনপ্রিয়। ‘অনিলা দেবী’ ছদ্মনামেও তিনি লিখতেন।
তার উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকে গ্রামবাংলার মানুষ, বিধবা ও নিপীড়িত নারীর জীবন, জাতপাত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। দেবদাস ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বহুবার পর্দায় এসেছে; পরিণীতা, শ্রীকান্ত, পথের দাবীসহ বহু উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়ে প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯০৬ সালে তিনি শান্তি দেবীকে বিয়ে করেন; ১৯০৮ সালের প্লেগ মহামারিতে স্ত্রী ও শিশুপুত্র — দুজনেরই মৃত্যু হয়। ১৯১০ সালে তিনি হিরন্ময়ী দেবীকে বিয়ে করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
- জগত্তারিণী স্বর্ণপদক — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯২৩
- ডিলিট উপাধি — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৩৬
- ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ — বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার জন্য প্রদত্ত উপাধি
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মারা যান; বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। আজও বাংলা ভাষার সবচেয়ে বেশি পঠিত লেখকদের মধ্যে তিনি শীর্ষে — তার উপন্যাস দেশ-বিদেশের বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠকের মন জয় করে আসছে।