শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় |
| জন্ম | ২ নভেম্বর ১৯৩৫ |
| জন্মস্থান | ময়মনসিংহ, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ) |
| পৈতৃক নিবাস | বাইনখাড়া গ্রাম, টঙ্গীবাড়ী, বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ) |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
| পেশা | ঔপন্যাসিক, গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক |
| শিক্ষা | কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ (মাধ্যমিক); কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় — বাংলায় স্নাতকোত্তর |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | মানবজমিন, দূরবীন, পারাপার, যাও পাখি, কাগজের বউ; অদ্ভুতুড়ে সিরিজ — মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি, গোঁসাইবাগানের ভূত, পাতালঘর; শবর গোয়েন্দা সিরিজ (ঋণ, ঈগলের চোখ, তীরন্দাজ) |
| পুরস্কার | আনন্দ পুরস্কার (১৯৭৩, ১৯৯০); বিদ্যাসাগর পুরস্কার (১৯৮৫); সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৮); বঙ্গবিভূষণ (২০১২); সাহিত্য অকাদেমি ফেলো (২০২১) |
পরিচিতি
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (জন্ম: ২ নভেম্বর ১৯৩৫) ভারতের বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুমুখী সাহিত্যিক। প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার উপন্যাস এবং শিশু-কিশোরদের জন্য রোমাঞ্চকর অদ্ভুতুড়ে কাহিনি — দুই ধারাতেই তিনি সমান সিদ্ধহস্ত। মানবজমিন, দূরবীন ও পারাপার-এর মতো উপন্যাস তাকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির ঔপন্যাসিকের মর্যাদা দিয়েছে; অন্যদিকে মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি, গোঁসাইবাগানের ভূত ও পাতালঘর-সহ অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বইগুলো কয়েক প্রজন্মের বাঙালি শিশুর শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্ত তার সৃষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্রগুলোর একটি, যাকে নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
জন্ম ও শৈশব
১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ময়মনসিংহে (বর্তমান বাংলাদেশ) শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম। তার বাবা ব্রিটিশ সরকারের রেলওয়েতে চাকরি করতেন; শীর্ষেন্দুর জন্মের সময় তিনি ময়মনসিংহে বদলি ছিলেন। শীর্ষেন্দুর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার) বাইনখাড়া গ্রামে — বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বিক্রমপুরের শিকড় নিয়ে বহুবার স্মৃতিচারণ করেছেন, আর তার উপন্যাসে কল্পনার ছোঁয়ায় সেই অঞ্চলের গ্রামজীবন বারবার ফিরে এসেছে।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় তার পরিবার কলকাতায় চলে আসে। রেলওয়েতে কর্মরত বাবার সঙ্গে আসাম, পূর্ববঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর — এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তার লেখার ভূগোল ও চরিত্রচিত্রণে গভীর ছাপ ফেলেছে।
শিক্ষাজীবন
জলপাইগুড়ির ফনীন্দ্রদেব ইনস্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি; এরপর কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন
স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে শীর্ষেন্দু কর্মজীবন শুরু করেন একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। কিছুদিনের মধ্যেই শিক্ষকতার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘকাল তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদনার কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন — বাংলা সাহিত্যের এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার পাতাতেই তার অধিকাংশ বিখ্যাত লেখার প্রথম প্রকাশ ঘটে।
সাহিত্যজীবন
১৯৫৯ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় তার প্রথম ছোটগল্প ‘জলতরঙ্গ’ প্রকাশিত হয়। এর প্রায় সাত বছর পর, ১৯৬৬–৬৭ সাল নাগাদ একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’। ছোটদের জন্য লেখা তার প্রথম উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’।
প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য লেখা তার প্রধান উপন্যাসগুলোর মধ্যে আছে মানবজমিন, দূরবীন, পারাপার, যাও পাখি, কাগজের বউ, লাল নীল মানুষ, উজান, পার্থিব ও চক্র। মানবজমিন উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৮৮ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। তার লেখার বৈশিষ্ট্য হলো মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নৈতিক দ্বন্দ্বের সূক্ষ্ম চিত্রণ।
শিশু-কিশোর সাহিত্যে তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে গণ্য হন। ‘অদ্ভুতুড়ে’ সিরিজে মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি (১৯৭৮), গোঁসাইবাগানের ভূত (১৯৭৯), পাতালঘর (১৯৯৬), বটুকবুড়োর চশমা (২০১১)-সহ অর্ধশতাধিক বই রয়েছে; ভূত, রহস্য ও হাস্যরসের মিশেলে এই সিরিজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুদের প্রিয়। গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্তকে নিয়ে লেখা রহস্য উপন্যাস (ঋণ, ঈগলের চোখ, তীরন্দাজ প্রভৃতি) প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয় — এই সিরিজ অবলম্বনে এবার শবর (২০১৫), ঈগলের চোখ (২০১৬) ও তীরন্দাজ শবর (২০২৪)-সহ একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এছাড়া গয়নার বাক্স (২০১৩), পাতালঘর (২০০৩), মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি (২০১৮)-সহ তার বহু কাহিনি চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন নিয়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমে খুব কমই কথা বলেন; নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য সূত্রে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না বলে এখানে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
পুরস্কার ও সম্মাননা
- আনন্দ পুরস্কার (১৯৭৩ ও ১৯৯০)
- বিদ্যাসাগর পুরস্কার (১৯৮৫) — শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য
- সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৮) — মানবজমিন উপন্যাসের জন্য
- বঙ্গবিভূষণ (২০১২) — পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান
- রবীন্দ্র পুরস্কার
- সাহিত্য অকাদেমি ফেলো (২০২১) — অকাদেমির সর্বোচ্চ সম্মান
উত্তরাধিকার
ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে লিখে চলা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের সেই বিরল লেখকদের একজন, যিনি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক — দুই প্রজন্মের পাঠকের কাছেই সমান জনপ্রিয়। তার অদ্ভুতুড়ে কাহিনি বাংলা শিশুসাহিত্যের আধুনিক ধারার পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত; আর প্রাপ্তবয়স্ক উপন্যাসে তিনি নাগরিক মধ্যবিত্তের অন্তর্জগৎকে যে গভীরতায় ধরেছেন, তা বাংলা কথাসাহিত্যে তার স্থায়ী আসন নিশ্চিত করেছে। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও অনুবাদের মাধ্যমে তার সৃষ্টি আজও নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
প্রোফাইল ছবি: Wikimedia Commons (CC BY 3.0, Biswarup Ganguly)