মূল কন্টেন্টে যান
শিবরাম চক্রবর্তী

শিবরাম চক্রবর্তী

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম শিবরাম চক্রবর্তী
জন্ম ১৩ ডিসেম্বর ১৯০৩ (বাংলা ২৭ অগ্রহায়ণ ১৩১০), কলকাতার দর্জিপাড়া, নয়ানচাঁদ দত্ত লেনে মাতুলালয়ে
মৃত্যু ২৮ আগস্ট ১৯৮০, কলকাতা (নীলরতন হাসপাতাল)
জাতীয়তা ভারতীয়
পেশা রম্যলেখক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক
শিক্ষা স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়া হয়নি; গৌড়ীয় সর্বভারতীয় বিদ্যায়তন থেকে পাশ করেন; স্বশিক্ষায় বহুবিষয়ে জ্ঞান অর্জন
উল্লেখযোগ্য কর্ম বাড়ি থেকে পালিয়ে, বাড়ি থেকে পালিয়ের পর, হর্ষবর্ধন-গোবর্ধনের গল্প সিরিজ, কল্কেকাশির গোয়েন্দাকাহিনী, মস্কো বনাম পন্ডিচেরি, ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা, ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর, মানুষ, চুম্বন (কাব্যগ্রন্থ), নাটক যখন তারা কথা বলবে
সম্মাননা শেষ জীবনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মাসিক ভাতা

পরিচিতি

শিবরাম চক্রবর্তী (১৩ ডিসেম্বর ১৯০৩ – ২৮ আগস্ট ১৯৮০) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রিয় ও অনন্য রম্যলেখকদের একজন। ‘শিবরামী স্টাইল’ নামে পরিচিত তার শ্লেষ-ভরা, পাঞ্চ-নির্ভর ও আত্মবিদ্রূপপূর্ণ রচনারীতির সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে তুলনা চলে না বললেই চলে। ষাট বছরের লেখকজীবনে তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ — প্রায় প্রতিটি শাখায় দেড়শতাধিক বই রচনা করেছেন।

জন্ম ও বংশপরিচয়

১৯০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর (বাংলার ২৭ অগ্রহায়ণ ১৩১০) কলকাতার দর্জিপাড়ায়, নয়ানচাঁদ দত্ত লেনে মাতুলালয়ে তার জন্ম। বাবা শিবপ্রসাদ চক্রবর্তী ছিলেন মালদহের চাঁচল রাজপরিবারের সন্তান; আদি নিবাস ছিল মুর্শিদাবাদের চোঁয়ায় (চাচল-চোঁয়া এলাকা)। শিবপ্রসাদ ছিলেন আধ্যাত্মিক মনোভাবের মানুষ, সংসারবিমুখ ও ভবঘুরে স্বভাবের — বাবার এই স্বভাব শিবরাম উত্তরাধিকারসূত্রে পান। মায়ের নাম শিবরানি; তার আরও দুই ভাই ছিলেন — শিবসত্য ও শিবহরি।

শিক্ষাজীবন ও রাজনীতি

স্কুলে পড়তে পড়তেই শিবরাম স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সংস্পর্শে আসেন। রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়া হয়নি এবং কারাবাসও করতে হয়। পরে তিনি গৌড়ীয় সর্বভারতীয় বিদ্যায়তন থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। প্রথাগত শিক্ষায় বেশি দূর এগোতে না পারলেও স্বশিক্ষায় তিনি বহু বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন।

কর্মজীবন

শিবরাম বিজলী ও ফরওয়ার্ড পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন এবং একসময় যুগান্তর পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন। পরে তিনি বসুমতী, আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকায় ফিচার লেখক হিসেবে যুক্ত হন — এই লেখাগুলোতেই তার রম্যরীতির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন উত্তর কলকাতার মুক্তারাম বাবু লেনের একটি মেসবাড়িতে; দোতলার একটি ভাড়াঘরে খাটিয়া ও বিছানা-সর্বস্ব জীবন কাটিয়ে, ঘরের দেওয়ালকেই হাতে-লেখা ক্যালেন্ডার বানিয়ে তিনি ছিলেন চিরকুমার এক ‘ফ্রি স্পিরিট’।

সাহিত্যজীবন

শিবরামের সাহিত্যযাত্রা শুরু কবিতা দিয়ে — প্রথম কবিতা বেরোয় ভারতী পত্রিকায়। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত প্রথম দুই বই মানুষ ও চুম্বন — দুটোই কবিতার। এরপর তিনি লেখেন অজস্র প্রবন্ধ, নাটক ও হাসির গল্প।

তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টি দুই ভাই হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধন (সঙ্গে তাদের বোন বিনি) — যাদের নিয়ে লেখা কৌতুক-গল্প আজও পাঠকের প্রিয়। তিনি কল্কেকাশি নামে এক রম্য গোয়েন্দা চরিত্রও সৃষ্টি করেন। শরৎচন্দ্রের দেনা পাওনা উপন্যাসের নাট্যরূপ দেন তিনি ষোড়শী নামে। প্রবন্ধগ্রন্থ মস্কো বনাম পন্ডিচেরি ও ফানুস ফাটাই, নাটক যখন তারা কথা বলবে এবং স্মৃতিকথামূলক দুই বই ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা ও ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর তার সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অংশ।

শিবরাম প্রায়ই নিজেকে গল্পের ভেতরে ঢুকিয়ে দিতেন, কখনও আত্মস্বীকারোক্তিমূলক মেটা-ফিকশনের ভঙ্গিতে — যা তার সময়ের বহু আগের আধুনিক ধারা বলে আজ স্বীকৃত। তার সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস বাড়ি থেকে পালিয়ে ১৯৫৮ সালে ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় চলচ্চিত্রায়িত হয়। বইয়ের বিজ্ঞাপনে তাকে ‘হাসির রাজা’ (King of Laughter) আখ্যা দেওয়া হতো।

জীবনের শেষ পর্যায় ও উত্তরাধিকার

শেষ জীবনে তিনি নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করে। ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্ট কলকাতায় নীলরতন হাসপাতালে তিনি মারা যান; শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু — তাদের মধ্যে ছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

আজ শিবরাম বাংলা রম্যসাহিত্যের ক্লাসিক; আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশিত তার রচনাসমগ্র কলকাতা বইমেলায় আজও বেস্টসেলার। রেডিও-সাসপেন্স ও অডিও প্ল্যাটফর্মে তার গল্পের নতুন করে প্রচার প্রজন্মান্তর পাঠকের কাছে তাকে পৌঁছে দিয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।