মূল কন্টেন্টে যান
রামনাথ বিশ্বাস

রামনাথ বিশ্বাস

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম রামনাথ বিশ্বাস (Ramnath Biswas)
জন্ম ১৩ জানুয়ারি ১৮৯৪, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ (তৎকালীন আসাম প্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত)
মৃত্যু ১ নভেম্বর ১৯৫৫, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
জাতীয়তা ভারতীয়
পেশা সৈনিক, বিশ্বভ্রমণকারী, ভ্রমণকাহিনী লেখক
শিক্ষা হরিশচন্দ্র হাই স্কুল (অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত)
উল্লেখযোগ্য কর্ম তিনবার সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ (১৯৩১–১৯৪০); অন্ধকারের আফ্রিকা, ভবঘুরের বিশ্বভ্রমণ, পৃথিবীর পথে-সহ ত্রিশের অধিক ভ্রমণকাহিনী

পরিচিতি

রামনাথ বিশ্বাস (১৩ জানুয়ারি ১৮৯৪ – ১ নভেম্বর ১৯৫৫) ছিলেন বাঙালি বিপ্লবী, সৈনিক, বিশ্বভ্রমণকারী ও ভ্রমণকাহিনী লেখক। তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়েছেন সাইকেলে পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী প্রথম দিককার ভারতীয়দের একজন হিসেবে — ১৯৩১ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে তিনি তিনবার সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ করেন। তার ভ্রমণকাহিনীগুলো শুধু ভ্রমণ-বিবরণ নয়, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদও বটে। বাংলাদেশের হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে তার জন্ম, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি কলকাতায় স্থায়ী হন। (লক্ষণীয়: কিছু সূত্রে তার মৃত্যুসাল ভিন্নভাবে উল্লেখ আছে; উইকিপিডিয়া ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর মতো নির্ভরযোগ্য সূত্রে মৃত্যুর তারিখ ১ নভেম্বর ১৯৫৫ দেওয়া আছে, সেটিই এখানে অনুসরণ করা হয়েছে।)

জন্ম ও শৈশব

রামনাথের জন্ম ১৮৯৪ সালে বানিয়াচংয়ের বিদ্যাভূষণপাড়া গ্রামে; বাবা বিরাজনাথ বিশ্বাস, মা গুণময়ী দেবী। শৈশবে তিনি হরিশচন্দ্র হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন, কিন্তু বাবার অকাল মৃত্যুর কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

কর্মজীবন

রামনাথ প্রথমে সিলেটের স্বদেশি প্রতিষ্ঠান “জাতীয় ভাণ্ডার সমিতি”-তে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন; সেখানকার মোটরগাড়ি মেরামতের কর্মশালায় তিনি গাড়ি চালানো ও সাইকেল চালানো শেখেন এবং সাইকেল চালনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। এই সময় তিনি গোপনে বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন; সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা প্রকাশ্যে এলে চাকরি হারান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি “বেঙ্গলি পল্টনে” যোগ দিয়ে মেসোপটেমিয়ায় যুদ্ধে যান। ১৯২৪ সালে তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে চাকরি নিয়ে ব্রিটিশ মালয়ে চলে যান। উপনিবেশবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে তার এই যোগাযোগ পরবর্তীতে তার ভ্রমণকাহিনীগুলোর রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়।

বিশ্বভ্রমণ

১৯৩১ সালে সিঙ্গাপুরের কুইন স্ট্রিট থেকে রামনাথ তার প্রথম বিশ্বভ্রমণ শুরু করেন — সম্বল ছিল একজোড়া চপ্পল, দুটি গামছা, একটি সাইকেল ও সাইকেল মেরামতের সরঞ্জামের বাক্স। সাইকেলের ফ্রেমে ধাতব প্লেটে লেখা ছিল — “Round the world, Hindoo traveller”। তিনি মালয়, সিয়াম, ইন্দোচীন, চীন, কোরিয়া, জাপান হয়ে কানাডা পৌঁছান; কানাডায় তাকে এক মাস জেলও খাটতে হয়। ১৯৩৪ সালে দেশে ফিরে আসেন। দ্বিতীয় ভ্রমণে (১৯৩৪–৩৬) তিনি ভারত, আফগানিস্তান, পারস্য, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, তুরস্ক, বুলগেরিয়া, যুগোস্লাভিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স হয়ে ইংল্যান্ড পৌঁছান; স্কটল্যান্ডও ভ্রমণ করেন। দীর্ঘ ও কঠিন এই যাত্রা তার স্বাস্থ্য ভেঙে দেয়; ১৯৩৬ সালে লন্ডন থেকে জাহাজে পোর্ট সঈদ হয়ে মুম্বাই ফিরে আসেন। সুস্থ হয়ে তিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে যান। তৃতীয় ভ্রমণে (১৯৩৮–৪০) তিনি আফ্রিকায় যান — মুম্বাই থেকে জাহাজে মোম্বাসা, সেখান থেকে সাইকেলে কেনিয়া, উগান্ডা, নিয়াসাল্যান্ড, রোডেশিয়া হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা, তারপর যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৪০ সালে দেশে ফেরেন।

সাহিত্যজীবন

রামনাথ ত্রিশের অধিক ভ্রমণকাহিনী ও উপন্যাস রচনা করেন। তার বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: অন্ধকারের আফ্রিকা, আজকের আমেরিকা, জুজিৎসু জাপান, তরুণ তুর্কি, দুরন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা, বেদুইনের দেশে, ভবঘুরের বিশ্বভ্রমণ, মরণবিজয়ী চীন, লাল চীন, হলিউডের আত্মকথা, পৃথিবীর পথে, ছায়া কায়া ভয় এবং ইংরেজিতে Tour Round the World Without Money। তার লেখায় বারবার উঠে এসেছে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-মুসলিম লীগের রাজনীতির সমালোচনা; আফ্রিকা-বিষয়ক একটি বই তিনি উৎসর্গ করেন মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়া ভারতীয় শ্রমিকদের উদ্দেশে। দেশভাগের পর প্রকাশক না পেয়ে তিনি নিজেই “পর্যাটক প্রকাশনা” নামে প্রকাশনী প্রতিষ্ঠা করে নিজের বই ছাপাতে শুরু করেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

দেশভাগের পর রামনাথের জন্মভূমি পাকিস্তানের অংশ হয়; তিনি প্রথমে সেখানেই থেকে যান, পরে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং আনন্দবাজার পত্রিকায় ভ্রমণকাহিনী লিখতে থাকেন। ১৯৫৫ সালের ১ নভেম্বর কলকাতায় তার মৃত্যু হয়। বানিয়াচংয়ে তার পৈতৃক বাড়িটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পর দখল হয়ে যায়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইক্লিস্ট ও সংস্কৃতিকর্মীরা বাড়িটি উদ্ধার করে সেখানে সাইকেল জাদুঘর ও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন, এবং ১৩ জানুয়ারি তার জন্মবার্ষিকীকে “রামনাথ দিবস” হিসেবে পালনের দাবি উঠেছে।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।