মুহাম্মাদ আসাদ (রাহিমাহুল্লাহ)
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
| পূর্ণ নাম | মুহাম্মাদ আসাদ (জন্মনাম: লিওপোল্ড ভাইস) |
| জন্ম | ২ জুলাই ১৯০০ |
| জন্মস্থান | লেমবার্গ, গালিশিয়া, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য (বর্তমান লভিভ, ইউক্রেন) |
| মৃত্যু | ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, মিহাস, আন্দালুসিয়া, স্পেন (দাফন: গ্রানাডার মুসলিম কবরস্থান) |
| জাতীয়তা | পাকিস্তানি (জন্মসূত্রে অস্ট্রীয়) |
| পেশা | সাংবাদিক, লেখক, অনুবাদক, চিন্তাবিদ, কূটনীতিক |
| শিক্ষা | ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় (অসমাপ্ত); বহুভাষাবিদ |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | The Road to Mecca (১৯৫৪), The Message of the Qur’an (১৯৮০), Islam at the Crossroads (১৯৩৪), The Principles of State and Government in Islam (১৯৬১), This Law of Ours and Other Essays (১৯৮৭) |
| সম্মাননা | ভিয়েনায় “মুহাম্মাদ আসাদ প্লাৎস” নামকরণ (২০০৮) |
পরিচিতি
মুহাম্মাদ আসাদ (২ জুলাই ১৯০০ – ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২) ছিলেন অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি লেখক, সাংবাদিক, অনুবাদক, চিন্তাবিদ ও কূটনীতিক। জন্মনাম লিওপোল্ড ভাইস; ইহুদি পরিবারে জন্ম নিয়ে ১৯২৬ সালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ইউরোপীয় মুসলিম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পশ্চিমা বিশ্বে তিনি প্রথম খ্যাতি পান বেস্টসেলার আত্মজীবনী The Road to Mecca (১৯৫৪)-এর মাধ্যমে; পরে সতেরো বছরের গবেষণার ফসল The Message of the Qur’an (১৯৮০) — কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ ও তাফসির — প্রকাশ করেন, যা পিকথল ও ইউসুফ আলীর অনুবাদের পাশাপাশি আধুনিক যুগের অন্যতম প্রভাবশালী অনুবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যায় যুক্তি ও ইজতিহাদের পক্ষে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রবক্তা; নিজের রচনাগুলো তিনি “চিন্তাশীল মানুষদের” (to People who Think) উৎসর্গ করেছিলেন।
জন্ম ও শৈশব
১৯০০ সালের ২ জুলাই তৎকালীন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের গালিশিয়া প্রদেশের লেমবার্গ শহরে (বর্তমানে ইউক্রেনের লভিভ) লিওপোল্ড ভাইসের জন্ম। তিনি ছিলেন দীর্ঘ রব্বি-বংশের উত্তরসূরি; তবে তার বাবা আকিভা ভাইস ঐতিহ্য ভেঙে আইনজীবী হয়েছিলেন। শৈশবেই লিওপোল্ড হিব্রু ভাষায় পারদর্শী হন এবং আরামীয় ভাষার সঙ্গেও পরিচিত হন; তানাখ, তালমুদ, মিশনা ও গেমারাসহ ইহুদি ধর্মশাস্ত্রের গভীর অধ্যয়ন করেন। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি স্কুল পালিয়ে ছদ্মনামে অস্ট্রীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন; বাবা পুলিশের সাহায্যে তাকে খুঁজে বের করে ভিয়েনায় ফিরিয়ে আনেন।
শিক্ষাজীবন
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ১৯২০ সালে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এরপর ১৯২০-এর দশকের জার্মানিতে লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ান; কিছুদিন অভিব্যক্তিবাদী চলচ্চিত্র পরিচালক ফ্রিৎস লাং-এর সঙ্গে কাজ করেন, বার্লিনে একটি আমেরিকান সংবাদ সংস্থায় টেলিফোন অপারেটরের চাকরি করেন। সেখানেই রুশ লেখক মাক্সিম গোর্কির স্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিয়ে তার প্রথম সাংবাদিক রচনা প্রকাশিত হয়। তেরো বছর বয়সে মাতৃভাষা জার্মান-পোলিশ ছাড়াও হিব্রু-আরামীয় আয়ত্ত করেছিলেন তিনি; বিশের দশকের মাঝামাঝি ইংরেজি, ফরাসি, ফারসি ও আরবি ভাষায় লেখা-পড়ার দক্ষতা অর্জন করেন।
কর্মজীবন
১৯২২ সালে ভাইস ব্রিটিশ ম্যান্ডেটাধীন ফিলিস্তিনে যান; জেরুজালেমে মামা ডোরিয়ান ফাইগেনবাউমের (মনোবিশ্লেষক, ফ্রয়েডের শিষ্য) বাড়িতে ওঠেন। জার্মানির মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকা Frankfurter Zeitung-এর ফ্রিল্যান্স সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন; জায়নবাদী প্রকল্পের বিরুদ্ধে আরবদের ভয় ও ক্ষোভের প্রতি তার গভীর উপলব্ধি তার প্রতিবেদনে ফুটে ওঠে। এ বিষয়ে ১৯২৪ সালে একটি ছোট বই প্রকাশ করলে পত্রিকাটি তাকে আরব বিশ্বে ব্যাপক ভ্রমণের দায়িত্ব দেয়; দুই বছর ধরে চলে সেই ভ্রমণ।
১৯৩২ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতে আসেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম কবি-দার্শনিক মুহাম্মাদ ইকবালের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। ইকবাল তাকে পূর্বদিকের ভ্রমণ বাদ দিয়ে ভারতের মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করতে রাজি করান। ইকবালের উৎসাহে আসাদ সহীহ বুখারীর ইংরেজি অনুবাদের কাজ শুরু করেন; ১৯৩৪ সালের গ্রীষ্মে কাশ্মীরে গিয়ে শ্রীনগরে নিজের ছাপাখানা বসিয়ে অনুবাদের প্রথম দুই অধ্যায় ছাপান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৩৯ সালে লাহোরে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে “শত্রু বিদেশি” হিসেবে গ্রেপ্তার করে; তিন বছর কারাবাসের পর ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষে মুক্তি পান। (তার বাবা-মা নাৎসিদের হাতে নিহত হন।) ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতার দিন, আসাদ পাকিস্তানি নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং সরকার তাকে ইসলামি পুনর্গঠন বিভাগের পরিচালক নিযুক্ত করে; সেখানে তিনি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে সুপারিশমালা তৈরি করেন। ১৯৪৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের প্রধান হন এবং ১৯৫২ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে পাকিস্তানের মন্ত্রী-প্লেনিপটেনশিয়ারি (রাষ্ট্রদূত-মর্যাদা) নিযুক্ত হন। একই বছর কূটনৈতিক চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন।
সাহিত্যজীবন
সৌদি আরবে প্রায় ছয় বছর অবস্থানকালে (পাঁচবার হজসহ) তিনি বাদশাহ ইবনে সউদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন; রাজার সঙ্গে নাজদ অঞ্চল সফর করেন এবং ১৯২৯ সালে ইখওয়ান বিদ্রোহের অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানে কুয়েতে একটি গোপন মিশনে যান। এই পর্বের অভিজ্ঞতাই পরে The Road to Mecca (১৯৫৪) — বত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত তার জীবনের আত্মজীবনীমূলক বর্ণনা — বইয়ের উপাদান হয়; বইটি পশ্চিমে বেস্টসেলার হয়। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Islam at the Crossroads (১৯৩৪), The Principles of State and Government in Islam (১৯৬১), Sahih Al-Bukhari: The Early Years of Islam এবং This Law of Ours and Other Essays (১৯৮৭)। একসময় তিনি মাসিক পত্রিকা Arafat-ও প্রকাশ করতেন। ১৯৬০ সালে কোরআন অনুবাদের কাজ শুরু করেন; ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত মরক্কোর তানজিয়ারে থেকে কাজটি এগিয়ে নেন এবং ১৯৮০ সালে The Message of the Qur’an প্রকাশ করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
আসাদ তিনবার বিবাহ করেন। প্রথম স্ত্রী এলসা শিমানের মক্কায় আকস্মিক মৃত্যু হয়; এই সংসারে তার পুত্র হাইনরিখ। দ্বিতীয় স্ত্রী মুনিরা বিনতে হুসাইন আশ-শাম্মারি ১৯৭৮ সালে রিয়াদে মারা যান; তাদের পুত্র তালাল। তৃতীয় স্ত্রী পোলা হামিদা ছিলেন পোলিশ বংশোদ্ভূত আমেরিকান ও ইসলাম গ্রহণকারী (২০০৭ সালে মৃত্যু)।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত পর্তুগালে এবং শেষ বছরগুলোতে স্পেনের মিহাসে “দার আল-আন্দালুস” নামের ভিলায় তৃতীয় স্ত্রী পোলা হামিদার সঙ্গে বসবাস করেন আসাদ। ১৯৯২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আন্দালুসিয়ার মিহাসে ৯১ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়; গ্রানাডার মুসলিম কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ২০০৮ সালে ভিয়েনায় জাতিসংঘ দপ্তর প্রাঙ্গণের সামনের চত্বরের নাম “মুহাম্মাদ আসাদ প্লাৎস” রাখা হয় — “ধর্মীয় সেতুবন্ধনকারী” হিসেবে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। জীবনীকাররা তাকে “ইউরোপের ইসলামকে দেওয়া উপহার” এবং “ইসলাম ও পশ্চিমের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী” বলে অভিহিত করেছেন।