মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান |
| জন্ম | ৩ ডিসেম্বর ১৯২৮, দয়ারামপুর, জঙ্গীপুর, মুর্শিদাবাদ |
| মৃত্যু | ১১ জানুয়ারি ২০১৪, ইউনাইটেড হাসপাতাল, ঢাকা |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | বিচারপতি, লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী |
| শিক্ষা | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ইতিহাসে বিএ ও এমএ); অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (আধুনিক ইতিহাসে বিএ, ১৯৫৮) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | যথাশব্দ (১৯৭৪); মাতৃভাষার স্বপক্ষে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৩); কোরানসূত্র (১৯৮৪); কোরান শরিফ সরল বঙ্গানুবাদ (২০০০); বং বঙ্গ বাঙ্গালা বাংলাদেশ (১৯৯৯); প্রায় চল্লিশটি প্রবন্ধগ্রন্থ |
| পুরস্কার | বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০০৭), মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার (২০০৫) |
পরিচিতি
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (৩ ডিসেম্বর ১৯২৮ – ১১ জানুয়ারি ২০১৪) বাংলাদেশের ৭ম প্রধান বিচারপতি এবং ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু শুধু বিচারক হিসেবেই নয় — তিনি ছিলেন একাধারে গবেষক, লেখক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ, ভাষা-সৈনিক ও অভিধানপ্রণেতা। বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসাহিত্য, সংবিধান ও সমাজ নিয়ে তার রচিত প্রবন্ধগ্রন্থের সংখ্যা প্রায় চল্লিশটি।
জন্ম ও পরিবার
১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমার দয়ারামপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ীতে তার জন্ম। বাবা মৌলভী জহিরউদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন আইনজীবী ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে পরিবার মুর্শিদাবাদ থেকে তৎকালীন চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবং পরে রাজশাহীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। হাবিবুর রহমানের শৈশবের অনেকখানি কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের শ্যামপুরে — নানার বাড়িতে।
শিক্ষাজীবন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে ১৯৪৯ সালে বিএ (সম্মান) ও ১৯৫১ সালে এমএ পাস করেন তিনি। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ১৯৫৮ সালে আধুনিক ইতিহাসে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন (১৯৪৯–৫২); ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী প্রথম দলের নেতৃত্ব দেন তিনি।
কর্মজীবন
১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে যোগ দেন; সেখানে ইতিহাসের রিডার (১৯৬২–৬৪) ও আইন বিভাগের ডিন (১৯৬১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে আইন ব্যবসায়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে ঢাকা হাইকোর্ট বারে যোগ দেন; সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (১৯৬৯) ও হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট (১৯৭২) হন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি এবং ১৯৮৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিয়োগ পান। ১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের ৭ম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন (৩০ এপ্রিল ১৯৯৫ পর্যন্ত)। অবসরের পর সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তথা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; তার অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা প্রবর্তনেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
রেনেসাঁর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি আজীবন জ্ঞানের নানা শাখায় গবেষণা করেন — সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্ম, আইন ও সমাজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকে তিনি বিচিত্র ও অভিনব দৃষ্টিতে তুলে ধরেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আছে ল’ অফ রিকুইজিশন (১৯৬৬), যথাশব্দ (১৯৭৪), রবীন্দ্র-প্রবন্ধে সংজ্ঞা ও পার্থক্য বিচার (১৯৮৩), মাতৃভাষার স্বপক্ষে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৩), কোরানসূত্র (১৯৮৪), বচন ও প্রবচন (১৯৮৫), গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ (১৯৮৫), রবীন্দ্র-রচনার রবীন্দ্র-ব্যাখ্যা (১৯৮৬), আমরা কি যাব না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে (১৯৯৬), বং বঙ্গ বাঙ্গালা বাংলাদেশ (১৯৯৯), কোরান শরিফ সরল বঙ্গানুবাদ (২০০০) ও প্রথমে মাতৃভাষা পরভাষা পরে (২০০৪)। তার প্রবন্ধগ্রন্থের সংখ্যা প্রায় চল্লিশটি। তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো ছিলেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্য ও গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০০৭), বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার (২০০৫), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গবেষণা পরিষদ পুরস্কার, ইব্রাহিম মেমোরিয়াল পুরস্কার ও অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা, বাংলা ভাষার মর্যাদা ও রবীন্দ্র-গবেষণা — তিন অঙ্গনেই তার অবদান বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।