মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ (محمد صالح المنجد) |
| জন্ম | ১৪ জুন ১৯৬১ (হিজরি: ৩০ যিলহজ্জ ১৩৮০) — কিছু সূত্রে ১৯৬০ |
| জন্মস্থান | আলেপ্পো, সিরিয়া (ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারে) |
| বেড়ে ওঠা | সৌদি আরব — রিয়াদ ও ধাহরান |
| জাতীয়তা | সৌদি |
| পেশা | ইসলামি পণ্ডিত, দাঈ, লেখক |
| শিক্ষা | কিং ফাহদ পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস বিশ্ববিদ্যালয় — শিল্প ব্যবস্থাপনায় স্নাতক; শাইখ ইবনে বাজ, ইবনে উসাইমীন প্রমুখের কাছে শরিয়াহ শিক্ষা |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | IslamQA.info (১৯৯৬) — প্রতিষ্ঠাতা ও তত্ত্বাবধায়ক; ঈমানের দুর্বলতা (ضعف الإيمان) প্রভৃতি গ্রন্থ |
| বর্তমান অবস্থা | ২০১৭ সাল থেকে সৌদি আরবে আটক (মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী) |
পরিচিতি
মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ (১৯৬১ – ; কিছু সূত্রে জন্মসাল ১৯৬০) সিরিয়ায় জন্ম নেওয়া সৌদি আরবের একজন প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত, দাঈ ও লেখক। ইন্টারনেট-যুগে ইসলামি জ্ঞানচর্চার অগ্রপথিকদের একজন হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইসলামি প্রশ্নোত্তর ওয়েবসাইট IslamQA.info-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। আল জাজিরা তাকে সালাফি আন্দোলনের একজন সম্মানিত আলিম হিসেবে উল্লেখ করেছে। লাখো মুসলিমের দৈনন্দিন ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার অনেকগুলো বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
জন্ম ও শিক্ষা
আলেপ্পোতে একটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারে তার জন্ম; শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সৌদি আরবে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেন রিয়াদে; এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যান ধাহরানে। কিং ফাহদ পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস বিশ্ববিদ্যালয় (KFUPM) থেকে ১৯৭৯ সালের ব্যাচে তিনি শিল্প ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে তিনি পুরোপুরি ইসলামি জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করেন। শাইখ আবদুল আযীয ইবনে বাজ, শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন ও শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীনের ইলমি মজলিসে তিনি নিয়মিত উপস্থিত হতেন; শাইখ আবদুর রহমান ইবনে নাসির আল-বাররাকের কাছ থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন বলে নিজের জীবনীতে উল্লেখ করেছেন। কুরআনের সঠিক তেলাওয়াত শেখেন শাইখ সাঈদ আল আব্দুল্লাহর কাছে। ইবনে বাজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রায় পনেরো বছর স্থায়ী ছিল, এবং ইবনে বাজই তাকে দাওয়াত ও শিক্ষকতার কাজে উৎসাহ দেন।
কর্মজীবন
ইবনে বাজের পরামর্শ ও উৎসাহে ত্রিশ বছর বয়সের আগেই তিনি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে দাওয়াতি কাজে নিয়োজিত হন। দাম্মামের দাওয়াহ ও ইরশাদ কেন্দ্রে তিনি পাঠদান করেন এবং আল-খোবার শহরের উমর ইবনে আবদুল আযীয মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রিয়াদ ও জেদ্দায় তিনি নিয়মিত সাপ্তাহিক ও মাসিক ইলমি পাঠ দিতেন; সৌদি রেডিওর পবিত্র কুরআন চ্যানেলেও তার নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। দাওয়াতের কাজে ইন্টারনেট ব্যবহারে তিনি ছিলেন অগ্রদূত — যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ IslamQA.info।
IslamQA.info
১৯৯৬ সালে তিনি Islam Question & Answer (islamqa.info) ওয়েবসাইট চালু করেন — ওয়েবসাইটের ভাষায়, সাইটের “সব প্রশ্নোত্তর শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ কর্তৃক প্রস্তুত, অনুমোদিত, সংশোধিত, সম্পাদিত বা টীকাকৃত”। সময়ের সঙ্গে সাইটটি আরবি, ইংরেজি, উর্দু, চীনাসহ এক ডজনেরও বেশি ভাষায় ফতোয়ার বিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হয়; ২০১৫ সালে Alexa-র র্যাঙ্কিং অনুযায়ী এটি ছিল ইসলাম-বিষয়ক বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়েবসাইট। সৌদি আরবে কেবল কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলার্সের ফতোয়া দেওয়ার একচেটিয়া কর্তৃত্ব থাকায়, স্বতন্ত্র ফতোয়া প্রকাশের অভিযোগে সৌদি কর্তৃপক্ষ সাইটটি সে দেশে নিষিদ্ধ করে। এছাড়া তিনি ZAD Academy নামে একটি অনলাইন ইসলামি শিক্ষা প্রকল্পও চালু করেন।
রচনাবলি
তিনি বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন; তার অধিকাংশ রচনাই মূলত আরবিতে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর (শিরোনাম) মধ্যে আছে — ঈমানের দুর্বলতা (ضعف الإيمان), অনেকের কাছে হালকা মনে হওয়া নিষেধাজ্ঞাসমূহ (محرمات استهان بها الناس), আমি তওবা করতে চাই, কিন্তু (أريد أن أتوب ولكن), আল্লাহর দীনের ওপর অটল থাকার উপায় (وسائل الثبات على دين الله), ভুল সংশোধনে নববী পদ্ধতি (الأساليب النبوية في معالجة الأخطاء), সিয়াম বিষয়ে ৭০টি মাসআলা (70 مسألة في الصيام), সালাতে খুশুর ৩৩টি উপায় (33 سبباً للخشوع في الصلاة), তাকওয়া (التقوى) ও আশা (الرجاء)। তার বহু গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। একটি সূত্র (EMAN) অনুযায়ী, ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি ৪,৫০০ ঘণ্টারও বেশি অডিও বক্তৃতা রেকর্ড করেছেন।
গ্রেপ্তার ও বর্তমান অবস্থা
২০১৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তার করে — ওই বছর সৌদি আরবে আলিম ও প্রচারকদের বিরুদ্ধে চালানো ব্যাপক গ্রেপ্তার-অভিযানের অংশ হিসেবে। মানবাধিকার সংস্থা Grant Liberty-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুড-নেতাদের আশ্রয়দান, সিরীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও তাদের জন্য ফতোয়া প্রদানের অভিযোগ আনা হয়েছিল বলে দাবি করা হয় — তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তার মুক্তির কোনো নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া যায়নি। এর পরের অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্য এই প্রতিবেদন তৈরির সময় যাচাই করা সম্ভব হয়নি — এটি একটি তথ্য-সীমাবদ্ধতা হিসেবে রেখে দেওয়া হলো।
উত্তরাধিকার
মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার IslamQA.info — প্রায় তিন দশক ধরে সক্রিয় এই প্ল্যাটফর্ম বিশ্বের লাখো মুসলিমের ধর্মীয় জিজ্ঞাসার ঠিকানা হয়ে আছে। তার গ্রন্থাবলি ও বক্তৃতা আজও আরবি, ইংরেজি, বাংলাসহ বহু ভাষায় পঠিত ও প্রচারিত হচ্ছে।