মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহাব
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব ইবনে সুলাইমান আত-তামিমি আন-নজদি |
| জন্ম | ১৭০৩ (সুনির্দিষ্ট দিন-মাস জানা যায় না), উয়াইনা, নজদ, আরব উপদ্বীপ |
| মৃত্যু | ১৭৯২, দিরিয়া (বয়স আনুমানিক ৮৮–৮৯) |
| জাতীয়তা | আরব (নজদি) |
| পেশা | ইসলামি পণ্ডিত, ধর্মতত্ত্ববিদ, ধর্মীয় সংস্কারক |
| ফিকহি মাযহাব | হাম্বলি |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | কিতাবুত তাওহীদ |
পরিচিতি
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব (১৭০৩–১৭৯২) ছিলেন আরব উপদ্বীপের নজদ অঞ্চলের একজন ইসলামি পণ্ডিত, ধর্মতত্ত্ববিদ ও ধর্মীয় সংস্কারক। তার নামানুসারে পরিচিত আন্দোলনটি — যাকে সাধারণত “ওয়াহাবি আন্দোলন” বলা হয়, যদিও তার অনুসারীরা নিজেদের এই নামে পরিচয় দেন না — ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী সংস্কারধারা হিসেবে বিবেচিত। তার অনুসারীরা নিজেদের “মুওয়াহহিদুন” (একত্ববাদী) বা সালাফি দাওয়ার অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। ১৭৪৪ সালে দিরিয়ার আমির মুহাম্মদ ইবনে সৌদের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক মৈত্রী প্রথম সৌদি রাষ্ট্র (দিরিয়া আমিরাত) প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করে; এই ধর্ম-রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের ধারা আজকের সৌদি আরব পর্যন্ত বিস্তৃত।
জন্ম ও শিক্ষা
১৭০৩ সালে নজদের উয়াইনা গ্রামে বনু তামিম গোত্রের একটি ফকিহ পরিবারে তার জন্ম। তার পিতা আবদুল ওয়াহাব ছিলেন নজদের হাম্বলি ফকিহ এবং দাদা সুলাইমান ছিলেন হাম্বলি মাযহাবের বিচারক। পিতার কাছেই তিনি কুরআন হিফজ করেন এবং ইবনে কুদামার গ্রন্থাবলির আলোকে হাম্বলি ফিকহ ও ইসলামি ধর্মতত্ত্বের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।
প্রায় বিশ বছর বয়সে তিনি উয়াইনা ত্যাগ করেন। মক্কায় হজ পালনের পর মদিনায় অবস্থান তার চিন্তাধারার মোড় ঘোরানোর ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখে। সেখানে তিনি নজদি হাম্বলি ধর্মতত্ত্ববিদ আব্দুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম আন-নজদির সঙ্গে পরিচিত হন, যিনি তাকে মুহাম্মদ হাইয়াত আস-সিন্ধির শিষ্য হিসেবে সুপারিশ করেন। এরপর তিনি বসরা যান, যেখানে মুহাম্মদ আল-মাজমু’ঈর কাছে চার বছর হাদিস, ফিকহ, ভাষাতত্ত্ব ও সীরাত অধ্যয়ন করেন। বসরায় কবর-মাজারকেন্দ্রিক প্রথার প্রকাশ্য বিরোধিতা করায় তাকে শহর ছাড়তে হয়। ১৭৩৯ সালে তিনি বাগদাদ যান, সেখানে পাঁচ বছর অবস্থান করেন ও বিবাহ করেন; এরপর কুর্দিস্তান, হামাদান, ইসফাহান, দামেস্ক ও কায়রো সফর করে আরব উপদ্বীপে ফিরে আসেন হুরাইমিলায় — যেখানে তার পিতা তখন বিচারকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। হুরাইমিলাতেই তিনি কিতাবুত তাওহীদ রচনা করেন এবং প্রথম শিষ্যদের পান।
সংস্কার আন্দোলন ও কর্মজীবন
উয়াইনায় ফিরে তিনি ধর্মপ্রচার শুরু করেন এবং সেখানকার শাসক উসমান ইবনে মু’আম্মারের সমর্থন লাভ করেন। শাসকের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থনের বিনিময়ে তিনি তার ধর্মীয় শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা আদায় করেন। ১৭৪২ সাল থেকে তিনি সক্রিয় সংস্কারপন্থী অবস্থান নেন: তিনি শাসককে দিয়ে সাহাবি যায়দ ইবনে খাত্তাবের মাজার সমতল করান, স্থানীয়দের পবিত্র মনে করা গাছপালা কাটিয়ে দেন এবং ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি দেওয়া এক নারীর পাথর-নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন।
এই কর্মকাণ্ড আল-হাসা ও কাতিফের বনু খালিদ গোত্রপ্রধান সুলাইমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ঘুরাইরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; তার চাপে ইবনে মু’আম্মার ইবনে আবদুল ওয়াহাবকে উয়াইনা থেকে বহিষ্কার করেন। ১৭৪৪ সালে তিনি দিরিয়ায় চলে যান এবং সেখানে আমির মুহাম্মদ ইবনে সৌদের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি করেন — এই চুক্তিই দিরিয়া আমিরাত তথা প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের ভিত্তি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দিরিয়ায় অধ্যয়ন-অধ্যাপনা ও রচনায় নিয়োজিত ছিলেন।
তার ধর্মীয় কর্মসূচির কেন্দ্রে ছিল তাওহীদের (আল্লাহর একত্ব) মতবাদ। তিনি কবর-মাজারকেন্দ্রিক প্রথা ও সাধু-ব্যক্তিদের প্রতি অতিভক্তির বিরোধিতা করে সেগুলোকে ধর্মীয় বিদআত বা শিরক হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি অন্ধ তাকলিদের বিরোধিতা করে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য কুরআন-হাদিসের সরাসরি অধ্যয়ন ও ইজতিহাদের (স্বাধীন শরয়ি গবেষণা) আহ্বান জানান। তার চিন্তায় ইবনে তাইমিয়া (মৃ. ১৩২৮) ও ইবনে কাইয়িম আল-জাওযিয়ার (মৃ. ১৩৫১) রচনার গভীর প্রভাব লক্ষণীয়।
রচনাবলি
তার রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: কিতাবুত তাওহীদ (তাওহীদের গ্রন্থ — তার প্রধান ও সর্বাধিক পরিচিত কর্ম), কাশফুশ শুবুহাত, আল-উসুল আস-সালাসা (তিনটি মূলনীতি), আল-কাওয়াইদ আল-আরবা (চারটি মূলনীতি), নাওয়াকিদুল ইসলাম, মাসাইলুল জাহিলিয়া এবং মুখতাসার যাদ আল-মা’আদ।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৭৯২ সালে দিরিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন; তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক ৮৮–৮৯ বছর। তার বংশধররা “আলে শাইখ” নামে পরিচিত — সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় পরিবার, যারা ঐতিহাসিকভাবে সৌদি রাষ্ট্রের উলামা নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার মতাদর্শ সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিশ্বব্যাপী সালাফি ধারার প্রসারে গভীর প্রভাব রাখে।
তথ্য-সীমাবদ্ধতা: তার জন্ম ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট দিন-মাস ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায় না; শুধু সাল (১৭০৩–১৭৯২) সর্বসম্মতভাবে গৃহীত। তার আন্দোলনের মূল্যায়ন নিয়ে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মহলে ভিন্নমত রয়েছে; এই প্রোফাইলে কেবল যাচাইযোগ্য তথ্য — তারিখ, রচনা, পদ ও ঘটনা — উপস্থাপন করা হয়েছে।