মুহাম্মদ জাফর ইকবাল
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | মুহম্মদ জাফর ইকবাল |
| জন্ম | ২৩ ডিসেম্বর ১৯৫২ |
| জন্মস্থান | সিলেট (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | শিশুসাহিত্যিক, বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী লেখক, ঔপন্যাসিক, পদার্থবিজ্ঞানী, অধ্যাপক, কলামিস্ট |
| শিক্ষা | বগুড়া জিলা স্কুল; ঢাকা কলেজ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (পদার্থবিজ্ঞানে বিএসসি, এমএসসি); ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র (পিএইচডি, ১৯৮২) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | আমার বন্ধু রাশেদ, দীপু নাম্বার টু, আমি তপু, হাত কাটা রবিন, অবনীল, ত্রিট্রন একটি গ্রহের নাম, কোপোট্রনিক সুখ-দুঃখ, মেকু কাহিনী; গোয়েন্দা সিরিজ টুনটুনি ও ছোটাচ্চু |
| পুরস্কার | বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০১১), রোটারি সিড পুরস্কার (২০১১), জাতীয় আইসিটি পুরস্কার (২০১৭) |
পরিচিতি
মুহম্মদ জাফর ইকবাল (জন্ম ২৩ ডিসেম্বর ১৯৫২) বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সর্বাধিক জনপ্রিয় বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী ও কিশোরসাহিত্য লেখকদের একজন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-কল্পকাহিনীর অগ্রদূত হিসেবে তিনি গণ্য হন — কিশোর পাঠকের কাছে বিজ্ঞানকে মজার ও সহজবোধ্য করে তোলাই তার লেখার প্রধান লক্ষ্য। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন পদার্থবিজ্ঞানী ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। আমার বন্ধু রাশেদ, দীপু নাম্বার টু, আমি তপু, হাত কাটা রবিন-এর মতো বই তাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কিশোর পাঠকের প্রিয় লেখকে পরিণত করেছে। তিনি বিখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই।
জন্ম ও শিক্ষা
১৯৫২ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটে মুহম্মদ জাফর ইকবালের জন্ম। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হন। বাবার চাকরির বদলির সুবাদে দেশের নানা শহরে কেটেছে তার শৈশব।
বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি ও ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে বিএসসি (১৯৭৩) ও এমএসসি (১৯৭৪) ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং ১৯৮২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
কর্মজীবন
পিএইচডির পর ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক)-তে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন। এরপর বেল কমিউনিকেশন্স রিসার্চ (বেলকোর)-এ গবেষণা-বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের গবেষণা-জীবনের পর তিনি দেশে ফিরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন; একসময় তিনি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধানও ছিলেন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তিনি অধ্যাপনা থেকে অবসর নেন। শিক্ষা-প্রসারে তার অবদানের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড প্রতিষ্ঠায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন এবং দীর্ঘদিন বাংলাদেশ গাণিতিক অলিম্পিয়াড কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।
সাহিত্যজীবন
খুব অল্প বয়স থেকেই গল্প লেখা শুরু করেন জাফর ইকবাল — মাত্র সাত বছর বয়সে লিখেছিলেন তার প্রথম বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাপ্তাহিক বিচিত্রা-য় প্রকাশিত হয় তার গল্প “কোপোট্রনিক ভালোবাসা”; পরে কোপোট্রনিক সিরিজের গল্পগুলো কোপোট্রনিক সুখ-দুঃখ নামে সংকলিত হয়। তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-কল্পকাহিনীর অগ্রদূত হিসেবে গণ্য হন।
তার কিশোর-উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: মেকু কাহিনী, শান্তা পরিবার, দুষ্টু ছেলের দল, দীপু নাম্বার টু, অবনীল, ইকারাস, প্রিয়, ত্রিট্রন একটি গ্রহের নাম, আমার বন্ধু রাশেদ, হাত কাটা রবিন। ২০০৫ সালে প্রকাশিত আমি তপু কিশোরদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। শিশুদের জন্য তিনি টুনটুনি ও ছোটাচ্চু নামে একটি গোয়েন্দা সিরিজও লিখেছেন, যার একাধিক খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে (২০১৪–২০২৪)। কল্পকাহিনীর পাশাপাশি তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের ওপর বেশ কয়েকটি অকল্পকাহিনী বই লিখেছেন এবং বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। বিখ্যাত বাংলা কমিক ঢাকা কমিকস-এর জন্য কাহিনীর রূপরেখাও লিখেছেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৭৮ সালে তিনি ইয়াসমীন হককে বিয়ে করেন। তাদের দুই সন্তান — পুত্র নাবিল ইকবাল ও কন্যা ইয়েশিম ইকবাল। কন্যা ইয়েশিম তার বাবার লেখা আমার বন্ধু রাশেদ বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। তার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা (২০১২ সালে মৃত্যু); ছোট ভাই আহসান হাবীব খ্যাতিমান কার্টুনিস্ট ও উন্মাদ পত্রিকার সম্পাদক।
পুরস্কার
সাহিত্য ও শিক্ষা — দুই অঙ্গনেই তিনি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন:
- অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০১)
- বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (উইকিপিডিয়ার বিভিন্ন অংশে ২০০৪ ও ২০০৫ — দুই রকম বছর উল্লেখিত)
- মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ নাট্যকার (২০০৫)
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন পদক (২০০৫)
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০১১, শ্রেষ্ঠ গল্পকার)
- রোটারি সিড পুরস্কার (২০১১, শিক্ষায় অবদানের জন্য)
- জাতীয় আইসিটি পুরস্কার (২০১৭)
উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের কিশোরসাহিত্যে মুহম্মদ জাফর ইকবালের অবদান অনন্য — তিনি বিজ্ঞানকে কিশোরদের কাছে মজার, রোমাঞ্চকর ও ভালোবাসার বিষয়ে পরিণত করেছেন। তার বই পড়ে বড় হয়েছে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রজন্ম; বইমেলায় তার বই এখনও তরুণ পাঠকের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড প্রতিষ্ঠা ও তরুণদের মধ্যে গণিত-বিজ্ঞান জনপ্রিয় করার মধ্য দিয়ে তিনি শিক্ষার মাঠেও গভীর ছাপ রেখেছেন।