মুহম্মদ নিজাম
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | মুহম্মদ নিজাম (Muhommod Nijam) |
| জন্ম | লেখকের নিজ-পরিচিতিতে “১৫ই পৌষ মধ্যরাত্রি” (জন্মবছর উল্লেখ নেই); হাওর জনপদের এক কৃষক পরিবারে। ২০২৩ সালের এক পাঠক-পর্যালোচনায় প্রায় ৩৪ বছর বয়সী বলে উল্লেখিত |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| শিক্ষা | আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর; এমফিল গবেষক |
| পেশা | ঔপন্যাসিক, গল্পকার, স্ক্রিপ্ট-রাইটার; শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা |
| প্রথম প্রকাশিত গল্প | ২০১৩ সালে — পাক্ষিক অন্যদিন, সাপ্তাহিক কাগজ ও জাতীয় দৈনিকে |
| উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | ঝড় ও জনৈক চিন্তাবিদ (উপন্যাস, ২০১৫), অগ্নিপুরাণ (উপন্যাস, ২০২০), বেগানা পুষ্প (উপন্যাস, ২০২০), জলগাভীদের উপকথা এবং তার পরের কথা (ছোটগল্প সংকলন, উপকথা প্রকাশন), তমসা নদীর তীরে (উপন্যাস, ২০২১) |
পরিচিতি
মুহম্মদ নিজাম বাংলাদেশের একজন সমসাময়িক কথাসাহিত্যিক — উপন্যাস ও ছোটগল্প দুটোতেই তিনি সক্রিয়। তাঁর গ্রন্থে প্রকাশিত নিজ-পরিচিতি অনুযায়ী, জন্ম হাওর জনপদের এক আদিম ও অকৃত্রিম কৃষক পরিবারে; ২০০৬ সালে তিনি ঢাকায় আসেন। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি এমফিল গবেষণায় যুক্ত হন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি স্ক্রিপ্ট-রাইটার হিসেবেও কাজ করেন এবং শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। পুরনো ও দুষ্প্রাপ্য বই, পুঁথি, গান, কেচ্ছা ও কিংবদন্তী সংগ্রহ করা তাঁর প্রিয় অভ্যাস; অবসরে তিনি ভালোবাসেন প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডা, বই এবং বৃক্ষের সান্নিধ্য। ইতিহাস-চেতনা, মিথ-প্রীতি ও সংগ্রাহকের দৃষ্টি — এই তিনটি প্রবণতা তাঁর সাহিত্যের মূল স্বভাব নির্ধারণ করেছে।
সাহিত্যজীবন
মুহম্মদ নিজামের সাহিত্যযাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে, যখন তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় পাক্ষিক অন্যদিন, সাপ্তাহিক কাগজ এবং বেশ কিছু জাতীয় দৈনিকে। এরপর ২০১৫ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আসে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঝড় ও জনৈক চিন্তাবিদ। লেখকের নিজ-পরিচিতির ভাষায়, এই উপন্যাসের মাধ্যমেই তিনি দেশের বিদগ্ধ ও বলিষ্ঠ পাঠকমহলের প্রশংসা অর্জন করেন এবং সমকালীন সাহিত্যে একজন শক্তিমান কথাশিল্পীর আগমনী বার্তা হিসেবে গণ্য হন।
এরপর ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত তাঁর দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাস অগ্নিপুরাণ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এর অন্যতম বেস্টসেলার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। একই বছর নয়েস পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস বেগানা পুষ্প। তাঁর ছোটগল্পের সংকলন জলগাভীদের উপকথা এবং তার পরের কথা প্রকাশ করে উপকথা প্রকাশন (৮৮ পৃষ্ঠা), এবং ২০২১ সালে সাহিত্যচর্চা প্রকাশনী থেকে আসে উপন্যাস তমসা নদীর তীরে (১২৮ পৃষ্ঠা), যার নতুন সংস্করণ ২০২৪ সালে প্রকাশ করে বায়ান্ন (৫২) প্রকাশনী (১৩৬ পৃষ্ঠা, ISBN 9789849767879)। রকমারির বই-আলোচনায় প্রকাশিত দীর্ঘ পাঠক-পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, তাঁর ছোটগল্প পাঠকের মধ্যে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে — বিশেষ করে ভাষার কাব্যিক বাঁক ও পরাবাস্তবতার ছোঁয়া নিয়ে।
কোনো প্রকাশিত সাক্ষাৎকার বা পুরস্কারের যাচাইযোগ্য তথ্য এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি (বিস্তারিত নিচের তথ্য-সীমাবদ্ধতা অংশে)।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
ঝড় ও জনৈক চিন্তাবিদ (উপন্যাস, প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫) — মুহম্মদ নিজামের প্রথম উপন্যাস। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ধর্মদর্শনের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসের কেন্দ্রে উগ্র ধর্মযোদ্ধা জাবের আলী এবং তাঁর পৌত্র মিথুনের সংঘাত; মিথুন প্রাচীন সভ্যতার দেবদেবীর প্রতিকৃতি ও রেপ্লিকা সংগ্রহ করে একটি ‘Museum of God’ গড়তে চায়। বস্তুগত যুদ্ধের বিবরণের চেয়ে চিন্তার সূত্র ধরে পথ চলা এখানে বেশি — লেখকের নিজের ভাষায় এটি “প্রেম ও যুদ্ধদিনের গল্প”।
অগ্নিপুরাণ (উপন্যাস, ২০২০) — ঐতিহাসিক পটভূমিতে লেখা তাঁর দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাস। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এর অন্যতম বেস্টসেলার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই গ্রন্থ তাঁর পাঠক-প্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বলে তাঁর নিজ-পরিচিতিতে উল্লেখ আছে।
বেগানা পুষ্প (উপন্যাস, নয়েস পাবলিকেশন, সেপ্টেম্বর ২০২০; ১৫৬ পৃষ্ঠা) — প্রথম-পুরুষ কথকের জবানিতে রচিত এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত তরুণের আত্মকথন। মহানগরীর পরিত্যক্ত-সদৃশ এক ভবনে বসবাসকারী কথক মেরুদণ্ডহীন পিতার উত্তরাধিকার, উগ্র বড়চাচার দুঃশাসন ও আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে নিজেকে গড়ে তোলার লড়াইয়ের বর্ণনা দেয়। বিথী নামের এক সাদামাটা মেয়ের সঙ্গে তার প্রেম ও আকস্মিক বিচ্ছেদ উপন্যাসের আবেগ-কেন্দ্র — যেখানে রতির নেশা, হারিয়ে যাওয়া এবং পুনর্মিলনের আকস্মিকতায় কথকের জগৎ ভেঙে যায়।
জলগাভীদের উপকথা এবং তার পরের কথা (ছোটগল্প সংকলন, উপকথা প্রকাশন; ৮৮ পৃষ্ঠা) — পাঁচটি গল্পের সংকলন। “লাল-সবুজ সুড়ঙ্গ সংকেত” দেড় পৃষ্ঠার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি গল্প; সিগন্যালে শুয়ে থাকা অর্ধনগ্ন এক পাগল ও বাসযাত্রী যুবকের মধ্য দিয়ে কে ‘ফিট’ আর কে ‘আনফিট’ — সেই প্রশ্নই গল্পের নিউক্লিয়াস। “সান্ধ্যলিপি” শব্দবিন্যাসের কাব্যিক বাঁকে লেখা এক ভিন্ন স্বাদের গল্প। “একটি অসমাপ্ত খু/ন, অসংলগ্ন প্রেম এবং অমীমাংসিত জীবনকর্মের চিত্র” শেষভাগে পরাবাস্তবতার ছোঁয়া আনে। টাইটেল গল্পটি গ্রামীণ মিথ-আশ্রিত — কথক নূর ও তার বন্ধু শান্তনুর বউ-দেখার ঘটনার সঙ্গে মিথের সমান্তরাল বুনন তৈরি হয়েছে; মিথ ও বাস্তব — এই দুই স্তরে “কার গল্পটা সবচেয়ে অশ্লীল” সেই প্রশ্ন গল্পটিকে বিশ্লেষণাত্মক করে তোলে। “আমরা হেঁটেছি যারা নিজেদের করোটির ভেতর” সংকলনের দীর্ঘতম গল্প — বিচ্ছিন্ন অংশ-বিন্যাসে লেখকদের ‘মেইড-আপ’ আলাপন, শাহবাগের বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা, আর আত্মহত্যাপ্রবণ মেয়ে বিভার কাহিনি এক আশাবাদী ‘পোয়েটিক অপটিমিজম’-এ গিয়ে শেষ হয়।
তমসা নদীর তীরে (উপন্যাস; প্রথম প্রকাশ: সাহিত্যচর্চা প্রকাশনী, ২০২১, ১২৮ পৃষ্ঠা; বায়ান্ন (৫২) প্রকাশনী, ২০২৪, ১৩৬ পৃষ্ঠা, ISBN 9789849767879) — সমকালীন উপন্যাস। এখানে লেখক নিজে কথক-চরিত্র হিসেবে উপস্থিত; ইশান ভাই, মুন্নি-সহ গ্রাম্য-প্রেক্ষাপটের চরিত্রদের আদিরসাত্মক কৌতুক ও সরল জীবনাচার নিয়ে গল্প এগোয়। সরল বয়ানভঙ্গির ভেতর দিয়ে তরুণ-বয়সের কৌতূহল ও গ্রামীণ জীবনের রসালো মুহূর্ত ধরা পড়ে।
রচনাশৈলী ও বিষয়বস্তু
মুহম্মদ নিজামের গদ্যের সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর ভাষা-চেতনা। পাঠক-পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি প্রচলিত শব্দবিন্যাস ভেঙে শব্দের স্থান বদলে বাক্যে কাব্যিক বাঁক আনেন — “সাপ স্বভাবতই করছিল উদ্যোগ প্রস্থানের” ধরনের বাক্যই তাঁর স্টাইলের পরিচায়ক। এই কাব্যিকতা তাঁর ছোটগল্পকে গতানুগতিক বয়ান থেকে আলাদা করে, কোথাও কোথাও ইমতিয়ার শামীমের গদ্যধারার ছায়া মনে করিয়ে দেয়।
বিষয়বস্তুর দিক থেকে তাঁর লেখায় তিনটি স্তর স্পষ্ট। প্রথমত, মিথ ও প্রাচীন উপাদানের পুনর্লেখন — গ্রামীণ মিথ-আশ্রিত টাইটেল গল্প, জাবের আলী-মিথুনের পুরাণ-দেবতার সংগ্রহ, আর তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ-প্রবণতা (পুঁথি, কেচ্ছা, কিংবদন্তী) সবই এই ধারার অংশ। দ্বিতীয়ত, ইতিহাস-দর্শন ও চিন্তার বহন — ঝড় ও জনৈক চিন্তাবিদ-এর দার্শনিক উপস্থাপনা ও অগ্নিপুরাণ-এর ঐতিহাসিক পটভূমি তাঁর ইতিহাস-শিক্ষার প্রতিফলন। তৃতীয়ত, নগর-বিচ্ছিন্নতা ও মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব — বেগানা পুষ্প-এর মহানগর-জীবন, ছোটগল্পের ‘ফিট বনাম আনফিট’ প্রশ্ন, বাসযাত্রী যুবক বা আত্মহত্যাপ্রবণ বিভার মতো চরিত্র সবই সমাজ-প্রান্তের মানুষের অন্তর্জগত খুঁড়ে দেখে।
পরাবাস্তবতার ছোঁয়া, প্রথম-পুরুষ কথকতা এবং নৈতিক প্রশ্নকে গল্পের কেন্দ্রে রাখা — এই কৌশলগুলো মিলিয়ে তাঁকে সমকালীন বাংলাদেশি কথাসাহিত্যের একজন প্রতিশ্রুতিশীল ও স্বতন্ত্র কণ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এক পাঠক-পর্যালোচকের ভাষায়, তাঁর মাত্র একটি বই পড়েই পাঠকের মধ্যে বাকি বইগুলো পড়ার আগ্রহ জাগে — যা একজন তরুণ লেখকের পক্ষে বিরল প্রশংসা।
তথ্য-সীমাবদ্ধতা
এই পরিচিতি প্রকাশ্যে যাচাইযোগ্য সূত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ: লেখকের গ্রন্থে প্রকাশিত নিজ-পরিচিতি (বেগানা পুষ্প, নয়েস পাবলিকেশন, ২০২০), রকমারি ও পাঠক সমাবেশের বই-তালিকা তথ্য, এবং রকমারিতে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ পাঠক-পর্যালোচনা। জন্মবছর, জন্মস্থানের নাম, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, ব্যক্তিগত জীবন, সাক্ষাৎকার বা পুরস্কার সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। জলগাভীদের উপকথা ও তমসা নদীর তীরে সংক্রান্ত গল্প-বিবরণ রকমারির পাঠক-পর্যালোচনার ভিত্তিতে সংক্ষিপ্তায়িত — বিশ্লেষণের সীমা পাঠকের পাঠ-অভিজ্ঞতায় আটকে, লেখকের নিজস্ব বক্তব্যে নয়। Goodreads-এর লেখক-তালিকায় অগ্নিমঙ্গল, নর্তকী ও পুঁজিপতি শাসিত এই ব্রোথেল পৃথিবীতে, কবি ও কঙ্কাবতী, রক্ত শ্বাপদ প্রেম-সহ আরো কয়েকটি শিরোনাম তাঁর নামে পাওয়া গেলেও প্রকাশন-তথ্য স্বতন্ত্রভাবে যাচাই না হওয়ায় এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া গেলে এই পাতা হালনাগাদ করা হবে।