মুফতি মুহাম্মদ রফী উসমানী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | মুহাম্মদ রফী উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ রফী উসমানী) |
| জন্ম | ২১ জুলাই ১৯৩৬ |
| জন্মস্থান | দেওবন্দ, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ, ভারত) |
| মৃত্যু | ১৮ নভেম্বর ২০২২, করাচি, পাকিস্তান |
| জাতীয়তা | পাকিস্তানি |
| পেশা | ইসলামী পণ্ডিত, ফকীহ ও মুফতি; দারুল উলূম করাচির সভাপতি (১৯৮৬–২০২২) |
| শিক্ষা | দারুল উলূম দেওবন্দ; দারুল উলূম করাচি থেকে দরসে নিজামি (১৯৬০); পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাওলভি ফাজিল; দারুল উলূম করাচিতে ইফতা (ফতোয়া ও ফিকহ) বিষয়ে বিশেষজ্ঞতা |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | আহকামে জাকাত, নওয়াদির আল-ফিকহ, ইসলাম মে আওরত কি হুকমরানি, আল-তালিকাত আন-নাফিয়া আলা ফাতহ আল-মুলহিম, হায়াতে মুফতি-এ-আজম |
| পুরস্কার | ১৯৯৫ সালে দেওবন্দি আলেমদের ঐকমত্যের মাধ্যমে ‘মুফতি-এ-আজম’ (গ্র্যান্ড মুফতি) উপাধি |
পরিচিতি
মুফতি মুহাম্মদ রফী উসমানী ছিলেন পাকিস্তানের একজন ইসলামী পণ্ডিত, ফকীহ ও হাদিসবিদ। ১৯৮৬ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত (২০২২) তিনি দারুল উলূম করাচির তৃতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেওবন্দি ধারার এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে তিনি প্রায় চার দশক যুক্ত ছিলেন এবং ফিকহ, হাদিস ও তাফসীর বিষয়ে আরবি ও উর্দু ভাষায় প্রায় ২৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৯৫ সালে পাকিস্তানের দেওবন্দি আলেমগণ ঐকমত্যের মাধ্যমে তাঁকে ‘মুফতি-এ-আজম’ (গ্র্যান্ড মুফতি) উপাধি দেন।
জন্ম ও শিক্ষা
রফী উসমানী ১৯৩৬ সালের ২১ জুলাই ব্রিটিশ ভারতের দেওবন্দে উসমানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম ‘মুহাম্মদ রফী’ রাখেন আল্লামা আশরাফ আলী থানভী। তাঁর পিতা মুফতি মুহাম্মদ শাফী ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দের গ্র্যান্ড মুফতি এবং পরবর্তীতে দারুল উলূম করাচির প্রতিষ্ঠাতা; পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি পরিচিত। রফী উসমানীর ছোট ভাই মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ইসলামী পণ্ডিত।
শৈশবেই তিনি কুরআন হিফজ শুরু করেন — প্রথম অংশ দেওবন্দে, এবং দেশভাগের পর পরিবারের সাথে পাকিস্তানে চলে এসে করাচির বাব আল-ইসলাম মসজিদে হিফজ সম্পন্ন করেন। ১৯৫১ সালে তিনি পিতার প্রতিষ্ঠিত জামিয়া দারুল উলূম করাচিতে (তৎকালীন নানকওয়াড়া) ভর্তি হন এবং ১৯৬০ সালে দরসে নিজামি সম্পন্ন করেন। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি মাওলভি ও মুন্শি (মাওলভি ফাজিল) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং দারুল উলূম করাচিতেই ইফতা — ফতোয়া ও ফিকহ বিষয়ে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। হাদিস শাস্ত্রে তাঁর উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী, আকবর আলী সাহারানপুরী, সাহবান মাহমূদ প্রমুখ।
কর্মজীবন
শিক্ষাজীবন শেষে রফী উসমানী দারুল উলূম করাচিতেই শিক্ষকতায় যুক্ত হন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি দরসে নিজামির বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক পড়ান; ১৯৭১ সাল থেকে হাদিস ও ইফতার উচ্চতর পাঠ দিতে থাকেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাওসারী। তিনি ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিতেন বলে জানা যায়।
প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি পাকিস্তানের বহু জাতীয় প্রতিষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন: অল পাকিস্তান উলামা কাউন্সিল, কাউন্সিল অব ইসলামিক আইডিয়োলজি, রুয়েতে হিলাল কমিটি ও সিন্ধু প্রদেশের জাকাত কাউন্সিলের সদস্য; পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের শরিয়ত আপিল বেঞ্চের উপদেষ্টা; করাচি বিশ্ববিদ্যালয় ও এনইডি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। তিনি ওয়েফাকুল মাদারিস আল-আরাবিয়া পাকিস্তানের সহ-সভাপতি (২০১৭–২০২১) ও পরে পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। পিতার মৃত্যুর (১৯৭৬) পর আবদুল হাই আরিফী দারুল উলূম করাচির প্রধান হন; তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৬ সালে রফী উসমানী তৃতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং আমৃত্যু এই পদে ছিলেন।
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ চলাকালে তিনি হরকতুল জিহাদ আল-ইসলামীর সাথে যুক্ত হন এবং ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দারুল উলূম করাচির মাসিক আল-বালাঘসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর যুদ্ধ-স্মৃতিচারণ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়; পরে এগুলো ইয়ে তেরে পুর-আসরার বান্দে নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
রচনাবলি
রফী উসমানী আরবি ও উর্দু ভাষায় প্রায় ২৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- আহকামে জাকাত — জাকাত বিষয়ক বিধান
- আল-তালিকাত আন-নাফিয়া আলা ফাতহ আল-মুলহিম — হাদিস গ্রন্থ সংক্রান্ত টীকা
- ইসলাম মে আওরত কি হুকমরানি — ইসলামে নারী নেতৃত্ব প্রসঙ্গে
- নওয়াদির আল-ফিকহ — ফিকহ বিষয়ক গ্রন্থ
- হায়াতে মুফতি-এ-আজম — পিতা মুফতি মুহাম্মদ শাফীর জীবনী
- কিতাবাতে হাদিস আহদে রিসালাত ও আহদে সাহাবা মে — হাদিস সংকলনের ইতিহাস
- মেরে মুরশিদ হজরত-ই আরিফী — আবদুল হাই আরিফীর জীবন ও কর্ম
- ইউরোপ কে তিন মুআশি নিজাম — সামন্ততন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের তুলনামূলক আলোচনা (ইংরেজি অনুবাদ: The Three Systems of Economics in Europe)
- আলামাতে কিয়ামাত আওর নুজুলে মসীহ — কিয়ামতের লক্ষণ ও মসীহের অবতরণ প্রসঙ্গে
ইনায়ত আহমদের ইলম আস-সীগা গ্রন্থের তাঁর উর্দু অনুবাদ ও টীকা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের বহু মাদ্রাসায় দরসে নিজামির পাঠ্যসূচিতে পড়ানো হয়।
ব্যক্তিগত জীবন
খবরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও তিন কন্যা রেখে গেছেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
কোভিড-১৯ থেকে আরোগ্য লাভের পর বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন রফী উসমানী। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২২ সালের ১৮ নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে তিনি করাচিতে মৃত্যুবরণ করেন। ২০ নভেম্বর তাঁর জানাজায় ইমামতি করেন ছোট ভাই মুফতি তাকী উসমানী; দারুল উলূম করাচির প্রাঙ্গণস্থ কবরস্থানে পিতার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আরিফ আলভী, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ শোক প্রকাশ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর মুফতি তাকী উসমানী দারুল উলূম করাচির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।