মূল কন্টেন্টে যান
মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্দলবী

মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্দলবী

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

পূর্ণ নাম আবূ মুহাম্মদ আলীমুদ্দীন নদিয়াভী
জন্ম ১৯২৫ (মাস-তারিখ জানা যায়নি)
জন্মস্থান খোর্দপলাশী, কালীগঞ্জ, নদীয়া, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত)
মৃত্যু ১২ জুন ২০০১, ঢাকা, বাংলাদেশ
সমাধি বংশাল আহলে হাদীস জামে মসজিদ কবরস্থান, ঢাকা
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা ইসলামি পণ্ডিত, মুহাদ্দিস, লেখক, গবেষক, শিক্ষক
শিক্ষা মাজাহিরুল উলূম, সাহারানপুর; মাদ্রাসা রাহমানিয়া, দিল্লি; আল্লামা আবদুল জলীল সামরুদীর সান্নিধ্যে ৭ বছর
প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস (সহ-সভাপতি)
উল্লেখযোগ্য কর্ম হাকীকাতুস সালাত, হাদীস ও মুহাদ্দিস, ফিরকাবন্দীর মূল উৎস (২ খণ্ড), হাদীসে রাসূল ও আধুনিক বিজ্ঞান
পুরস্কার —

পরিচিতি

আবূ মুহাম্মদ আলীমুদ্দীন নদিয়াভী (১৯২৫ – ১২ জুন ২০০১) ছিলেন বাংলাদেশি ইসলামি পণ্ডিত, মুহাদ্দিস, লেখক, গবেষক ও শিক্ষক। তিনি বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম এবং দীর্ঘদিন সংগঠনটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। হাদীস, তাফসীর, আকীদাহ, রিজাল ও ইসলামি দর্শনে গভীর পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি সমাদৃত ছিলেন। বাংলা ভাষায় তিনি অন্তত ত্রিশটি ইসলামি গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ করেন এবং দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় শিক্ষার্থীদের সহীহ বুখারীর দরস প্রদান করেন।

জন্ম ও শৈশব

আবূ মুহাম্মদ আলীমুদ্দীন ১৯২৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ থানার খোর্দপলাশী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন মূসা বিন লুকমান বিন নাসির আল-খাদিম। শৈশব থেকেই তার মাতা তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন; জীবনীকারদের বর্ণনায় মাতার দোয়া ও উৎসাহ তার শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষাজীবন

গ্রামের নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি মুন্সী শাকের মুহাম্মদ, মাওলানা আবদুস সাত্তার, মাওলানা রহমতুল্লাহ, মাওলানা নি’মাতুল্লাহ, মাওলানা কায়কোবাদ প্রমুখ আলেমের নিকট কুরআন, আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষা অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে মালদহে মাওলানা আনিসুর রহমানের নিকট কিরাআত, নাহু, সরফ, ফিকহ ও হাদীস শিক্ষা লাভ করেন। এরপর সাহারানপুরের মাজাহিরুল উলূমে অধ্যয়নকালে তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়ে শত শত শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন; পরে দিল্লির মাদ্রাসা রাহমানিয়ায় তাফসীর, হাদীস, মানতেক, ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি গুজরাটে আল্লামা আবদুল জলীল সামরুদীর সান্নিধ্যে যান এবং টানা সাত বছর হাদীস, উসূলে হাদীস, তাফসীর, উসূলে তাফসীর, রিজাল, আকীদাহ, আরবি সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। সহীহ বুখারী তিনি তিন বছর ধরে অধ্যয়ন করেন এবং শিক্ষা সমাপ্তির পর হাদীস পাঠদানের ইজাযা (সনদ) লাভ করেন।

কর্মজীবন

শিক্ষা সমাপ্তির পর নিজ গ্রামে ফিরে তিনি মাদ্রাসা মুহাম্মাদিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে আরও তিনটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যার দুটি বাংলাদেশে এবং একটি পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। ১৯৬০ সালে বোম্বাইয়ে অবস্থানকালে তিনি তুহফাতুল আশরাফ বি মারিফাতিল আতরাফ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা ও মুদ্রণোপযোগী করার কাজে অংশগ্রহণ করেন। পরে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গা দারুল হাদীস মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশে হিজরত ও দাওয়াতি কর্ম

১৯৬৪ সালে তিনি প্রথমবার পূর্ব পাকিস্তানে আগমন করেন। ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান জমঈয়তে আহলে হাদীসের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসে মাদ্রাসাতুল হাদীসে দরস প্রদান শুরু করেন এবং একই সময়ে সংগঠনের মুখপত্র তর্জুমানুল হাদীস-এর মাসআলা-মাসায়েল বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে নিয়মিত প্রবন্ধ ও ফতোয়া লিখতে থাকেন। ১৯৬৭ সালে তিনি সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন — প্রথমে ঢাকার রূপগঞ্জের ভোলাবো গ্রামে, পরে নারায়ণগঞ্জের পাঁচরুখীতে। ১৯৭৪ সালে তিনি মাদ্রাসা দারুল হাদীস সালাফিয়া প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে জীবনের শেষ পর্যন্ত শিক্ষা ও দাওয়াহ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। দীর্ঘকাল তিনি বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের সহ-সভাপতি ও ফতোয়া বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তর্জুমানুল হাদীস, সাপ্তাহিক আরাফাত, আহলে হাদীসসহ বিভিন্ন সাময়িকীতে গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি একাধিকবার হজ পালন করেন (১৯৬৫, ১৯৭৫, ১৯৮০, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯৯ ও সর্বশেষ ২০০০ সালে)।

রচনাবলি

আবূ মুহাম্মদ আলীমুদ্দীন ছিলেন বহুলপ্রজ লেখক। হাদীস, তাফসীর, আকীদাহ, ফিকহ, ইসলামি দর্শন, সমাজচিন্তা ও সমসাময়িক বিষয়ে তার রচিত ও অনূদিত গ্রন্থের সংখ্যা অন্তত ত্রিশটি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে হাকীকাতুস সালাত, হাদীস ও মুহাদ্দিস, ফিরকাবন্দীর মূল উৎস (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), হাদীসে রাসূল ও আধুনিক বিজ্ঞান, কিতাবুদ দুআ, তাফসীরে আমপারা, তাফসীরে সূরা মুলক, রোযা ও তারাবীহ, ইসলাম ও দাম্পত্য জীবন, তাকলীদ ও ইসলাম, ইসলাম ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান, মৃতদের জন্য জীবিতদের করণীয়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সালাত ও আকীদা, আর রিসালাতুস সালাফিয়্যাহ ফিস সালাত (অনুবাদ) এবং সহীহ বুখারীর প্রথম থেকে কিতাবুত তাহারাত পর্যন্ত অংশের অনুবাদ। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন, যেখানে আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষার বিপুলসংখ্যক গ্রন্থের পাশাপাশি বহু দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপিও সংরক্ষিত ছিল।

ব্যক্তিগত জীবন

আলীমুদ্দীনের আটজন পুত্র ও চারজন কন্যা ছিল; তাদের মধ্যে কয়েকজন উচ্চশিক্ষা লাভ করে ইসলামি শিক্ষা ও অন্যান্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হন। পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও সংযমী; দেশভাগ, হিজরত ও আর্থিক সংকটের মতো প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি শিক্ষা ও দাওয়াহর কাজ অব্যাহত রাখেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

জীবনের শেষদিকে তিনি দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। ২০০১ সালের ১২ জুন (১৩ রবিউল আউয়াল ১৪২২ হিজরি) ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বংশাল বড় আহলে হাদীস জামে মসজিদে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন; পরে তাকে ঢাকার ঐতিহাসিক বংশাল বড় মসজিদ কবরস্থানে দাফন করা হয়। সমসাময়িক আলেমদের মূল্যায়নে তিনি বাংলা ভাষাভাষী আহলে হাদীস সমাজের অন্যতম প্রধান মুহাদ্দিস ও গবেষক ছিলেন; তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, অধ্যবসায় ও নিরহংকার জীবনযাপন সমকালীন ইসলামি অঙ্গনে তাকে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। তার রচিত ও অনূদিত গ্রন্থসমূহ এখনও ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণায় ব্যবহৃত হয়।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।