মতিউর রহমান নিজামী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | মতিউর রহমান নিজামী |
|---|---|
| জন্ম | ৩১ মার্চ ১৯৪৩ |
| জন্মস্থান | মনমথপুর, সাঁথিয়া, পাবনা (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত) |
| মৃত্যু | ১১ মে ২০১৬, পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | রাজনীতিবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক |
| শিক্ষা | মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা থেকে কামিল (ফিকহ, ১৯৬৩); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (১৯৬৭) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | কুরআনের আলোকে মু’মিনের জীবন, ইসলামী আন্দোলন: সমস্যা ও সম্ভাবনা, দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব, কারাগারের স্মৃতি, স্মৃতির পাতা থেকে |
পরিচিতি
মতিউর রহমান নিজামী (৩১ মার্চ ১৯৪৩ – ১১ মে ২০১৬) ছিলেন বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখক। তিনি ২০০১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর, পাবনা-১ আসন থেকে দুই মেয়াদে জাতীয় সংসদ সদস্য (১৯৯১–১৯৯৬ ও ২০০১–২০০৬) এবং খালেদা জিয়ার সরকারে কৃষিমন্ত্রী (২০০১–২০০৩) ও শিল্পমন্ত্রী (২০০৩–২০০৬) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন; ২০১৬ সালের ১১ মে পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বিশেরও বেশি ইসলামী গ্রন্থ রচনা করেন।
জন্ম ও শিক্ষা
১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামে তার জন্ম; পিতার নাম লুৎফর রহমান খান। গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি সাঁথিয়ার বোয়ালমারী মাদ্রাসায় পড়েন। ১৯৫৫ সালে প্রথম শ্রেণীতে দাখিল, ১৯৫৯ সালে আলিম (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১৬তম স্থান) এবং ১৯৬১ সালে প্রথম শ্রেণীতে ফাজিল পাস করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকার মাদ্রাসা-ই-আলিয়া থেকে ফিকহ শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে কামিল ডিগ্রি (বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান) অর্জন করেন এবং ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন
১৯৫৪ সালে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৬১ সালে তিনি ইসলামী ছাত্র সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন; ১৯৬৬–৬৯ সালে পরপর তিন বছর পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি এবং পরে দুইবার সর্বপাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮–৮২ সালে ঢাকা মহানগরীর আমীর, ১৯৮৩–৮৮ সালে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১৯৮৮–২০০০ সালে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ সালে গোলাম আযমের উত্তরসূরী হিসেবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত (২০১৬) এই পদে ছিলেন।
১৯৯১ সালে তিনি পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৪ পর্যন্ত সংসদে জামায়াতের সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০১–২০০৩ সালে কৃষিমন্ত্রী ও ২০০৩–২০০৬ সালে শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি পাবনা-১ আসনে পরাজিত হন।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি নিজামী ইসলামী চিন্তাধারা, আন্দোলন ও কুরআন-হাদিসভিত্তিক জীবনবিধান নিয়ে বিশেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন। বাংলা উইকিপিডিয়ায় সংকলিত তার প্রকাশিত গ্রন্থতালিকার উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো —
- কুরআনের আলোকে মু’মিনের জীবন
- ইসলামী আন্দোলন: সমস্যা ও সম্ভাবনা
- ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
- দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব
- মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব ও কর্তব্য
- গণতন্ত্র গণবিপ্লব ও ইসলামী আন্দোলন
- রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার
- ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ
- কুরআন রমযান তাকওয়া
- ইসলামী আদাবে জিন্দেগী
- রাসূলুল্লাহর (সা.) মক্কার জীবন
- কারাগারের স্মৃতি ও স্মৃতির পাতা থেকে (স্মৃতিকথামূলক)
- ৮ম জাতীয় সংসদের ৪টি ভাষণ
রয়্যাল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার প্রকাশিত দ্য মুসলিম ৫০০ (২০১৩/১৪) তালিকায় প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শামসুন্নাহার নিজামীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন; এই দম্পতির ছয় সন্তান রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে তার পুত্র নাজিবুর রহমান মোমেনের নাম উল্লেখ আছে।
বিচার ও মৃত্যু
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনরুজ্জীবিত করে। ২০১০ সালের ২ আগস্ট নিজামীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১৯৭১ সালে আল-বদর নামের আধাসামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে তার ভূমিকার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে; ট্রাইব্যুনালের বিচারে এই অভিযোগগুলোই মূল বিষয় ছিল। ১৬টি অভিযোগে বিচার শেষে ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আপিল বিভাগ এই দণ্ড বহাল রাখেন এবং ২০১৬ সালের ৫ মে পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ হয়ে যায়। ২০১৬ সালের ১১ মে রাত ১২টা ১০ মিনিটে পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়; পরে তাকে পারিবারিক বাড়িতে দাফন করা হয়। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি পক্ষ সমালোচনা করেছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। (উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর হাইকোর্ট খারিজ করে তাকে খালাস দেন — এটি তার মৃত্যুর পরের রায়।)