মূল কন্টেন্টে যান

ভাসিলি সুখম্‌লিন্‌স্কি

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

পূর্ণ নাম ভাসিলি আলেক্সান্দ্রোভিচ সুখম্লিন্স্কি (ইউক্রেনীয় রূপ: ভাসিল ওলেক্সান্দ্রোভিচ সুখম্লিন্স্কি)
জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯১৮, ওমেলনিক গ্রাম (বর্তমান ইউক্রেন)
মৃত্যু ২ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, পাভলিশ, ইউক্রেন
পরিচিতি শিক্ষাবিদ ও লেখক
উল্লেখযোগ্য কর্ম শিশুদের প্রতি আমার হৃদয় (১৯৬৯), পাভলিশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শিক্ষকের প্রতি একশো পরামর্শ
পুরস্কার সমাজতান্ত্রিক শ্রমের বীর (১৯৬৮), লেনিন অর্ডার (দুইবার)

পরিচিতি

ভাসিলি আলেক্সান্দ্রোভিচ সুখম্লিন্স্কি (১৯১৮–১৯৭০) সোভিয়েত যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষাবিদদের একজন, যিনি শিক্ষার লক্ষ্যকে দেখতেন প্রকৃত মানবিক মানুষ গড়ে তোলার মধ্যে। ইউক্রেনের প্রত্যন্ত গ্রাম পাভলিশের একটি সাধারণ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি মানবতাবাদী শিক্ষাদর্শনের যে বাস্তব প্রয়োগ ঘটান, তা তাঁকে বিশ্বব্যাপী শিক্ষকদের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত করে। শিক্ষা নিয়ে তাঁর প্রায় ৪৮টি মনোগ্রাফ, ৬০০-এর বেশি প্রবন্ধ এবং প্রায় ১,৫০০ শিশুতোষ গল্প-কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে; তাঁর বই ৫০-এর বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং কোটি কোটি কপি মুদ্রিত হয়েছে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই শিশুদের প্রতি আমার হৃদয় (রুশ: Сердце отдаю детям; ইংরেজি অনুবাদ: I Give My Heart to Children) প্রায় ৫৫টি সংস্করণে ও ২৯টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা অনুবাদেও তাঁর শিক্ষাবিষয়ক রচনা পাওয়া যায়।

জন্ম ও শিক্ষা

১৯১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন ওমেলনিক গ্রামে — তৎকালীন খেরসন গভর্নরেটের ভাসিলিভকা ভোলোস্তের ওলেক্সান্দ্রিয়া উয়েজদে (বর্তমান ইউক্রেনের কিরোভোহ্রাদ অঞ্চলের ওলেক্সান্দ্রিয়া রায়ন)। স্থানীয় গির্জার বাপ্তিস্ম-রেকর্ড অনুযায়ী তাঁর মূল পারিবারিক নাম ছিল ‘সুখমিজ্স্কি’, যা ১৯৩৯ সালে বদলে বর্তমান রূপ নেয়। কৃষক পরিবারে জন্ম; বাবা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি ও বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা, মা ছিলেন সেলাই-সুতা-বুননে দক্ষ গৃহিণী। তাঁর তিন ভাইবোন — সেরহি, ইভান ও মেলানিয়া — সবাই পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশা বেছে নেন।

১৯৩৩ সালে সাত বছরের স্কুল শেষ করে তিনি ক্রেমেনচুকের একটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু পড়া ছেড়ে দিয়ে শ্রমিক-অনুষদ (রবফাক) শেষ করেন। ১৯৩৫ সালে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে পোলতাভা পেডাগোজিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি ইউক্রেনীয় ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে নিজ এলাকার বিভিন্ন স্কুলে কাজ করেন।

কর্মজীবন

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে যোগ দেন; ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে মস্কোর প্রতিরক্ষায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং উরাল পর্বতমালার একটি সামরিক হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা নেন। আংশিকভাবে যুদ্ধের অযোগ্য ঘোষিত হয়ে তিনি উদমুর্তিয়ার উভা শহরের একটি স্কুলের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সালে ইউক্রেন নাৎসি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হলে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং আঞ্চলিক জনশিক্ষা দপ্তরের পরিচালক হন। ১৯৪৮ সালে নিজের ইচ্ছায় তিনি পাভলিশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন — এই পদেই তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন। এই বাইশ বছরে পাভলিশ স্কুলকে তিনি শিক্ষা-পরীক্ষণের জীবন্ত পরীক্ষাগারে পরিণত করেন; সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও গবেষক তাঁর স্কুল সরেজমিনে দেখতে আসেন।

সাহিত্যজীবন

সুখম্লিন্স্কির শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রে ছিল নৈতিক শিক্ষা — প্রকৃতি, শিল্প ও মানবিক সম্পর্কের সৌন্দর্যের প্রতি শিক্ষার্থীদের সংবেদনশীল করে তোলা এবং পারিপার্শ্বিক জীবন্ত পরিবেশের দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করা। তাঁর মতে, প্রতিটি শিশুর মধ্যে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিকে দেখা এবং শিশুর হৃদয়ের পথ খুঁজে পাওয়াই শিক্ষকের প্রধান কাজ। তাঁর শিক্ষা-দর্শন পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে — স্বাস্থ্য-শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, নান্দনিক শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষা ও শ্রম-শিক্ষা।

তাঁর প্রধান গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে শিশুদের প্রতি আমার হৃদয় (Сердце отдаю детям, ১৯৬৯), পাভলিশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শিক্ষকের প্রতি একশো পরামর্শ এবং নাগরিকের জন্ম। তাঁর বৈজ্ঞানিক রচনা রুশ ভাষায় এবং শিশুতোষ গল্প-কাহিনি ইউক্রেনীয় ভাষায় রচিত। ১৯৬৯ সালে লেখা শিশুদের প্রতি আমার হৃদয় বইয়ের জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে ইউক্রেনীয় এসএসআরের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত হন। তাঁর চিন্তা আন্তর্জাতিক সুখম্লিন্স্কি সংস্থা ও সুখম্লিন্স্কি গবেষক সংঘের মাধ্যমে আজও বিশ্বব্যাপী চর্চিত হচ্ছে।

ব্যক্তিগত জীবন

ওনুফ্রিইভকার স্কুলে শিক্ষকতার সময় তিনি বিবাহ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর প্রথম স্ত্রী ও নবজাত পুত্র গেস্টাপোর হাতে নির্যাতিত হয়ে নিহত হন — এই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি তাঁর পরবর্তী শিক্ষাজীবনে শিশুদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার উৎস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

  • সমাজতান্ত্রিক শ্রমের বীর (১৯৬৮)
  • লেনিন অর্ডার — দুইবার
  • রেড স্টার অর্ডার
  • উশিনস্কি ও মাকারেঙ্কো পদক
  • ইউক্রেনীয় এসএসআরের মেধাবী শিক্ষক
  • সোভিয়েত শিক্ষাবিজ্ঞান একাডেমির সংশ্লিষ্ট সদস্য
  • ইউক্রেনীয় এসএসআর রাষ্ট্রীয় পুরস্কার (১৯৭৪, মরণোত্তর)

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

১৯৭০ সালের ২ সেপ্টেম্বর, ৫১ বছর বয়সে তিনি মারা যান; পাভলিশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর স্কুলে তাঁর নামে একটি শিক্ষা-জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর বই বাংলাসহ বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং আজও শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদর্শনের পাঠ্যসূত্র হিসেবে পঠিত হয় — যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার জবাবে তিনি শিশুদের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে যে প্রজন্ম গড়তে চেয়েছিলেন, সেই দর্শনই তাঁর অমর উত্তরাধিকার।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।