নসীম হিজাযী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | শরীফ হুসেন (ছদ্মনাম: নসীম হিজাযী) |
| জন্ম | ১৯ মে ১৯১৪ |
| জন্মস্থান | সুজানপুর গ্রাম, ধরিওয়ালের কাছে, গুরুদাসপুর জেলা, পাঞ্জাব, ব্রিটিশ ভারত |
| মৃত্যু | ২ মার্চ ১৯৯৬, পাকিস্তান |
| জাতীয়তা | পাকিস্তানি |
| পেশা | ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | মুহাম্মদ বিন কাসিম, আখরি মারকা, আখরি চাটান, ইউসুফ বিন তাশফিন, শাহীন, খাক ঔর খুন, মোয়াজ্জম আলী, ঔর তলোয়ার টুট গয়ি |
| পুরস্কার | প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৯২), পাকিস্তান |
পরিচিতি
নসীম হিজাযী (১৯ মে ১৯১৪ – ২ মার্চ ১৯৯৬) ছিলেন উর্দু ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিকদের একজন। তার আসল নাম শরীফ হুসেন; লেখক হিসেবে তিনি নসীম হিজাযী ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। ইসলামের ইতিহাস — খিলাফতের উত্থান, আন্দালুস, মোঙ্গল আক্রমণ, মুঘল-পরবর্তী ভারত ও দেশভাগ — এই বিশাল ক্যানভাসে তিনি প্রায় দুই ডজন উপন্যাস রচনা করেছেন, যা পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের উর্দুভাষী পাঠকের কাছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমান জনপ্রিয়। উর্দু ঐতিহাসিক উপন্যাসে আবদুল হালিম শররের পর তাকেই সবচেয়ে কৃতিত্বপূর্ণ লেখক বলা হয়।
জন্ম ও শৈশব
১৯১৪ সালের ১৯ মে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার ধরিওয়াল শহরের কাছে সুজানপুর গ্রামে এক আরাইন পরিবারে শরীফ হুসেনের জন্ম। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না; তবে ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস ও সাহিত্যের প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল বলে জানা যায়।
সাংবাদিকতা
সাহিত্যিক হওয়ার আগে হিজাযী ছিলেন একজন সক্রিয় সাংবাদিক। উর্দু দৈনিক ডেইলি হায়াত-এ সাংবাদিকতা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু; পরে তিনি করাচির ডেইলি জামানা ও কোয়েটার সাপ্তাহিক তানজিম-এ কাজ করেন। এ সময় তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং রাওয়ালপিন্ডির তামীর পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৩ সালে স্থানীয় আরেক সাংবাদিকের সঙ্গে মিলে তিনি দৈনিক কোহিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে লাহোর থেকে প্রকাশিত হতো। ১৯৬৩ সালের ৭ নভেম্বর আয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর মতামত ছাপানোর দায়ে কোহিস্তান তিন মাসের জন্য নিষিদ্ধ হয় এবং তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৯ সালে পত্রিকায় ফিরলেও ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর পত্রিকাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
সাহিত্যজীবন
সাংবাদিকতার পাশাপাশি ছোটগল্প ও প্রবন্ধ দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও ঐতিহাসিক উপন্যাসেই হিজাযী খুঁজে পান তার আসল ঠিকানা। তার উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য — ঐতিহাসিক তথ্যের যত্নশীল গবেষণা, উৎসের উল্লেখ এবং ইতিহাসের সঙ্গে রোমান্টিক কল্পনার মিশ্রণ। তিনি সাধারণত এমন চরিত্রকে কেন্দ্র করে গল্প বুনতেন যারা বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী বা অংশীদার।
তার উপন্যাস পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে ভারত ও বাংলাদেশের উর্দুভাষী পাঠকের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়; শাহীন-এর ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। ঐতিহাসিক গবেষণার প্রতি তার নিষ্ঠা — ঘটনার পেছনে পুঙ্খানুপুঙ্খ পড়াশোনা এবং সম্ভব হলে উৎসের উল্লেখ — তাকে সমসাময়িক ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিকদের মধ্যে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
ইসলামের উত্থানপর্ব নিয়ে তার উপন্যাস: মুহাম্মদ বিন কাসিম (সিন্ধু বিজয়), আখরি মারকা (মাহমুদ গজনভীর ভারত অভিযান), কায়সার-ও-কিসরা (বাইজেন্টাইন-সাসানীয় যুদ্ধ ও ইসলামের অভ্যুদয়), কাফিলা-এ-হিজাজ (পারস্য বিজয়)। মুসলিম স্পেন (আন্দালুস) ও রিকনকিস্তা নিয়ে: ইউসুফ বিন তাশফিন, শাহীন (গ্রানাডার পতন — তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর একটি), কলীসা ঔর আগ ও আঁধেরি রাত কে মুসাফির। চেঙ্গিস খানের মধ্য এশিয়া অভিযান ও খোয়ারিজম সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে আখরি চাটান। ব্রিটিশ যুগ নিয়ে দুটি ধারাবাহিক উপন্যাস: মোয়াজ্জম আলী (পলাশীর যুদ্ধ থেকে হায়দার আলীর উত্থান) ও ঔর তলোয়ার টুট গয়ি (টিপু সুলতানের বীরত্ব ও শাহাদাত)। দেশভাগের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে লেখা খাক ঔর খুন। এছাড়া দাস্তান-এ-মুজাহিদ, ইনসান ঔর দেবতা, পরদেশি দরখত, গুমশুদা কাফলে, সৌ সাল বাদ, সুফেদ জাজিরা এবং হজ সফরের ভ্রমণকাহিনী পাকিস্তান সে দিয়ারে হারাম তক।
ঐতিহাসিক নির্ভুলতার জন্য তিনি প্রশংসিত হলেও কিছু ঐতিহাসিক তার বিরুদ্ধে উপন্যাসের খাতিরে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলেছেন। পাকিস্তানের ডন পত্রিকার ভাষায়, তিনি ছিলেন সেই আদর্শ ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক যিনি উপন্যাসের প্রয়োজনে ইতিহাসকে ঢেলে সাজাতেন — উনিশ শতকের ইউরোপীয় রোমান্টিকদের ঐতিহ্যে, যারা জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগাতে ঐতিহাসিক কল্পকাহিনী রচনা করতেন।
পুরস্কার
- প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৯২) — পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক প্রদত্ত
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৯৬ সালের ২ মার্চ ৮১ বছর বয়সে পাকিস্তানে নসীম হিজাযীর মৃত্যু হয় (সূত্রভেদে লাহোর বা রাওয়ালপিন্ডি উল্লেখ আছে)। মৃত্যুর পরও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি — শাহীন, মুহাম্মদ বিন কাসিম ও আখরি চাটান-এর নতুন নতুন সংস্করণ আজও প্রকাশিত হচ্ছে; শাহীন অবলম্বনে টেলিভিশন রূপায়ণও হয়েছে। ইবনে সফি, সাদত হাসান মান্টো ও শফিক-উর-রহমানের মতো সমসাময়িকদের পাশাপাশি উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ঐতিহাসিক উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
প্রোফাইল ছবি: Wikimedia Commons (CC BY-SA 3.0 (Mrehansarwar, Wikimedia Commons))