তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় |
| জন্ম | ২৩ জুলাই ১৮৯৮ |
| জন্মস্থান | লাভপুর, বীরভূম জেলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) |
| মৃত্যু | ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১, কলকাতা |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
| পেশা | ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, রাজনীতিবিদ |
| শিক্ষা | লাভপুর যাদবলাল এইচই স্কুল (ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯১৬); সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা; সাউথ সুবার্বান কলেজ (বর্তমান আশুতোষ কলেজ) — বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অসমাপ্ত |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, কবি, আরোগ্য নিকেতন, জলসাঘর, ধাত্রীদেবতা, কালিন্দী, সপ্তপদী |
| পুরস্কার | জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৬৬), রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৫৫), সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৫৬), পদ্মশ্রী (১৯৬২), পদ্মভূষণ (১৯৬৯) |
পরিচিতি
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই ১৮৯৮ – ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক। তিনি ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধগ্রন্থ, ৪টি আত্মজীবনী ও ২টি ভ্রমণকাহিনী রচনা করেছেন, পাশাপাশি গানও লিখেছেন। বীরভূমের মাটি ও মানুষ — সাঁওতাল, বাগদি, বাউড়ি, ডোম ও গ্রামীণ কবিয়ালদের জীবন — তার সাহিত্যের প্রধান ভূমি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, স্বাধীনতা আন্দোলন ও সমাজ-পরিবর্তনের ছবি তার উপন্যাসে ধরা পড়েছে। সাহিত্য ও রাষ্ট্র — উভয় ক্ষেত্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি, জ্ঞানপীঠ থেকে পদ্মভূষণ, তিনি পেয়েছেন।
জন্ম ও শিক্ষা
বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে তার জন্ম; বাবা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মা প্রভাবতী দেবী। লাভপুর যাদবলাল এইচই স্কুল থেকে ১৯১৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি প্রথমে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ও পরে সাউথ সুবার্বান কলেজে (বর্তমান আশুতোষ কলেজ) ভর্তি হন। সেন্ট জেভিয়ার্সে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন; একটি বিপ্লবী যুবগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকায় গ্রেপ্তার হয়ে নিজ গ্রামে অন্তরীণ থাকেন। অসুস্থতা ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।
রাজনৈতিক জীবন ও কর্মজীবন
১৯৩০ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থনের জন্য তিনি গ্রেপ্তার হন ও প্রায় এক বছর কারাভোগ করেন; মুক্তির পর পুরোপুরি সাহিত্যসাধনায় মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪২ সালে তিনি বেঙ্গল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হন এবং বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন; ১৯৬০ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত হয়ে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লেখালেখির পাশাপাশি কিছুকাল তিনি কানপুরে চাকরি করেন এবং কয়লার ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
১৯৩২ সালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়; ওই বছরই প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস চৈতালি ঘূর্ণি। এরপর একের পর এক কালজয়ী রচনা আসে: ধাত্রীদেবতা (১৯৩৯), কালিন্দী (১৯৪০), গণদেবতা (১৯৪৩), পঞ্চগ্রাম (১৯৪৪), কবি (১৯৪৪), হাঁসুলি বাঁকের উপকথা (১৯৪৭), আরোগ্য নিকেতন (১৯৫৩), বিচারক, সপ্তপদী, বিপাশা, রাধা, অভিযান, চাঁপাডাঙার বউ প্রভৃতি। গল্পগ্রন্থের মধ্যে জলসাঘর (১৯৩৮) ও রসকলি (১৯৩৯) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার বহু উপন্যাস ও গল্প চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে — সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘর (১৯৫৮) থেকে শুরু করে সপ্তপদী, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, গণদেবতা, কবি, অভিযান ও আরোগ্য নিকেতন পর্যন্ত। ১৯৫৪ সালে তিনি নিজের গল্প অবলম্বনে না চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯১৬ সালে তিনি উমাশশী দেবীকে বিয়ে করেন। তাদের দুই পুত্র — সনৎকুমার (জ. ১৯১৮) ও সরিৎকুমার (জ. ১৯২২) — এবং তিন কন্যা — গঙ্গা (জ. ১৯২৪), বুলু (জ. ১৯২৬; মৃ. ১৯৩২) ও বাণী (জ. ১৯৩২)। ১৯৪০ সালে তিনি পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন; ১৯৪৮ সাল থেকে তালা পার্কে নিজের বাড়িতে বাস করতেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
তার প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা:
- রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৫৫, আরোগ্য নিকেতন-এর জন্য)
- সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৫৬)
- জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৯)
- পদ্মশ্রী (১৯৬২)
- শিশিরকুমার পুরস্কার (১৯৬৩)
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৬৬, গণদেবতা-এর জন্য)
- পদ্মভূষণ (১৯৬৯)
- সাহিত্য অকাদেমি ফেলোশিপ (১৯৬৯); কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট (১৯৬৯)
- শরৎ স্মৃতি পুরস্কার (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)
নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন-আর্কাইভে ১৯৭১ সালের মনোনীত-তালিকায় তার নাম থাকার কথা উইকিপিডিয়ার সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে; এটি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়নি।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ভোরে কলকাতার নিজ বাসভবনে তিনি মারা যান; শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় উত্তর কলকাতার নিমতলা শ্মশানে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃপেন্দ্রচন্দ্র স্মারক বক্তৃতা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি. এল. রায় স্মারক বক্তৃতা দেন। ২০২১ সালে লাভপুরের পৈতৃক বাড়ি “ধাত্রীদেবতা” জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে — বাঙালি সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে যা এখন তীর্থস্থান। বীরভূমের জনজীবনকে তিনি যেভাবে সাহিত্যে অমর করেছেন, তা বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে অনন্য।