মূল কন্টেন্টে যান

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম খোন্দকার আবু নাসর মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর
জন্ম ৫ নভেম্বর ১৯৫৮ (প্রকৃত জন্মসাল; প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে ১৯৬১ উল্লিখিত)
জন্মস্থান ঝিনাইদহ সদর, ঝিনাইদহ
মৃত্যু ১১ মে ২০১৬, মাগুরা (ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা)
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা ইসলামি গবেষক, অধ্যাপক, লেখক, টিভি আলোচক
শিক্ষা দাখিল-আলিম-ফাজিল-কামিল (সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা, ১৯৭৯); এসএসসি ও এইচএসসি (১৯৮০, যশোর বোর্ডে প্রথম); অনার্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি — ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ (১৯৮৬/১৯৯২/১৯৯৮)
উল্লেখযোগ্য কর্ম হাদীসের নামে জালিয়াতি, এহইয়াউস সুনান, বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত: গুরুত্ব ও প্রয়োগ, ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ, রাহে বেলায়াত; প্রতিষ্ঠা — আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট (২০১১)
পুরস্কার সেরা ছাত্রের পুরস্কার, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় (দু’বার); সেরা ইসলামী সাহিত্যিক পুরস্কার, কুরআন শিক্ষা সোসাইটি (২০০৭)

পরিচিতি

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (৫ নভেম্বর ১৯৫৮ – ১১ মে ২০১৬) ছিলেন বাংলাদেশের একজন ইসলামি গবেষক, অধ্যাপক, লেখক, অনুবাদক ও টিভি আলোচক। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস ও ইসলামি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। সমসাময়িক ইসলামি বিষয়ে পিস টিভি, ইসলামিক টিভি, এটিএন বাংলা, এনটিভি, বাংলা ভিশনসহ বিভিন্ন চ্যানেলে তার আলোচনা তাকে দেশের পরিচিত বক্তায় পরিণত করে। হাদিস, ফিকহ, আকীদা ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তিনি পঞ্চাশটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার কয়েকটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও আলিয়া মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জন্ম ও শিক্ষা

আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর জন্মগ্রহণ করেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলায়। তার পিতা খোন্দকার আনোয়ারুজ্জামান এবং মাতা বেগম লুৎফুন্নাহার। জন্মসাল নিয়ে উল্লেখ্য একটি তথ্যগত পার্থক্য আছে: তার প্রকৃত জন্মসাল ১৯৫৮ হলেও প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রে তা ১৯৬১ উল্লিখিত রয়েছে।

তিনি ১৯৭৩ সালে ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, ১৯৭৫ সালে আলিম এবং ১৯৭৭ সালে ফাজিল পাস করেন। ১৯৭৯ সালে ঢাকার সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া থেকে হাদিস বিভাগে কেন্দ্রীয় কামিল পরীক্ষায় সারাদেশে অষ্টম স্থান অর্জন করেন। মাদ্রাসা-পাঠের পাশাপাশি ১৯৮০ সালে মাগুরার সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে যশোর বোর্ডে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তার জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ আছে, পুরস্কার হিসেবে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে নৌভ্রমণের আমন্ত্রণ পান তিনি।

উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৮৬ সালে আরবি বিভাগে অনার্স, ১৯৯২ সালে উসুলে হাদিস বিভাগে মাস্টার্স এবং ১৯৯৮ সালে কুরআনের ভাষাতত্ত্ব (কাওয়ায়েদুল লুগাতিল কোরআন) বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। রিয়াদে অধ্যয়নকালে তিনি পরপর দু’বার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রের পুরস্কার পান এবং চূড়ান্ত পরীক্ষায় ৯৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে প্রথম হন। সেখানে তিনি শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায, শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন, শায়খ সালেহ আল-ফাওযানসহ বিশ্ববরেণ্য আলেমদের সান্নিধ্য পান। রিয়াদে অবস্থানকালে ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর রিয়াদ ইসলামিক সেন্টারে দাঈ, অনুবাদক ও দোভাষী হিসেবে কাজ করেন এবং রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসেও অনুবাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি কুরআন হিফজও সম্পন্ন করেন।

কর্মজীবন

১৯৭৯ সালে কামিল পাসের পর তিনি ঝিনাইদহ সদরের নাচনা নূরনগর সিদ্দিকীয়া আলিম মাদ্রাসায় প্রায় দুই বছর শিক্ষকতা করেন। সৌদি আরব থেকে ফিরে ১৯৯৮ সালে প্রথমে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক মাস শিক্ষকতা করেন, এরপর একই বছর কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস ও ইসলামি অধ্যয়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৯ সালে সহকারী অধ্যাপক, ২০০৪ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০০৯ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। শিক্ষকতাকালীন তার অধীনে ১২ জন পিএইচডি ও ৩০ জন এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া ২০০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ও ২০০৫ সালে আল ফিকহ বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকার দারুস সালাম কওমি মাদ্রাসা ও পাবনার জামিয়াতুল কুরআনিল কারিমে তিনি খণ্ডকালীন শায়খুল হাদিস হিসেবে সহিহ বুখারি পাঠদান করতেন। ২০০৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিবের দায়িত্বে ছিলেন।

সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি

সমাজ সংস্কার, হাদিস, ফিকহ, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামি ঐক্য বিষয়ে তিনি পঞ্চাশটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন। ইংরেজিতে তার বইয়ের মধ্যে আছে এ ওম্যান ফ্রম ডেজার্ট (১৯৯৫), গাইডেন্স ফর ফাস্টিং মুসলিমস (১৯৯৭) ও এ সামারি অফ থ্রি ফান্ডামেন্টালস অফ ইসলাম (১৯৯৭); আরবিতে বুহুসুন ফি উলূমিল হাদিস (২০০৭)। বাংলা গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: এহইয়াউস সুনান: সুন্নাতের পুনরুজ্জীবন ও বিদ’আতের বিসর্জন (২০০৭), হাদীসের নামে জালিয়াতি, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পোশাক, পর্দা ও দেহ-সজ্জা (২০০৭), খুতবাতুল ইসলাম (২০০৮), ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ (২০০৯), বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত: গুরুত্ব ও প্রয়োগ (২০০৯), রাহে বেলায়াত (২০১৩), পবিত্র বাইবেল: পরিচিতি ও পর্যালোচনা (২০১৬) ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামি আকীদা (২০১৭)। অনুবাদের মধ্যে আছে আল-ফিকহুল আকবার (২০১৪) ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত দুই খণ্ডের ইযহারুল হক্ব।

তার বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত, বুহুসুন ফি উলূমিল হাদিস ও হাদীসের নামে জালিয়াতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত মাদ্রাসার অনার্স পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। টেলিভিশন আলোচনায় তিনি শিরক, বিদ’আত ও আকীদাসহ সমসাময়িক বিষয়ে কথা বলতেন; আইটিভি ইউএস (মার্কিন ইসলামি টেলিভিশন)-এর উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। আরবি, ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় তার দক্ষতা ছিল।

সামাজিক কর্মকাণ্ড

২০১১ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট’, যার অধীনে ইসলামিক বিদ্যালয়, পাঠাগার, মসজিদ ও আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স পরিচালিত হয়। ট্রাস্টের মাধ্যমে গরিবদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ, বিনামূল্যে বই বিতরণ, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মতো সামাজিক কর্মসূচি চলে। এছাড়া উচ্চতর ইসলামি গবেষণার জন্য তিনি আল ফারুক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

তিনি ফুরফুরা শরীফের পীর আব্দুল কাহহার সিদ্দিকীর কন্যা ফাতিমা আবুল আনসারকে বিবাহ করেন। তাদের এক পুত্র খোন্দকার উসামা জাহাঙ্গীর এবং তিন কন্যা — জাকিয়া খোন্দকার, রিফাত খোন্দকার ও বুসাইনা খোন্দকার।

পুরস্কার ও সম্মাননা

  • ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রের পুরস্কার — দু’বার (তৎকালীন রিয়াদের গভর্নর সালমান বিন আব্দুল আজিজের হাত থেকে)
  • সেরা ইসলামী সাহিত্যিক পুরস্কার, কুরআন শিক্ষা সোসাইটি (২০০৭) — এহইয়াউস সুনান গ্রন্থের জন্য

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

২০১৬ সালের ১১ মে ব্যক্তিগত গাড়িতে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকার পথে মাগুরা জেলার ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পারনান্দুয়ালী এলাকায় খুলনাগামী একটি মালবাহী ভ্যানের সঙ্গে তার গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। তার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

মৃত্যুর পর তার স্মরণে বাংলাদেশ জাতীয় মুফাসসির পরিষদ প্রেরণার বাতিঘর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করে (২০১৭), আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স থেকে তার জীবনীগ্রন্থ যুগের মহান দাঈ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর প্রকাশিত হয় (২০২০), এবং ২০২৩ সালে ইমদাদুল হক সুন্নাতে উদ্ভাসিত যে জীবন নামে স্মৃতিচারণামূলক বই লেখেন। তার প্রতিষ্ঠিত আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট ও প্রকাশনাসংস্থা আজও সক্রিয় আছে।

জনপ্রিয় বই

সব বই দেখুন →

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।