ড. ওমর সুলাইমান আল-আশকার
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | ড. ওমর ইবনু সুলাইমান আল-আশকার (Dr. Omar Sulaiman Al-Ashqar; আরবি: عمر بن سليمان الأشقر) |
| জন্ম | ১৯৪০, নাবলুস, ফিলিস্তিন |
| মৃত্যু | ১০ আগস্ট ২০১২ |
| জাতীয়তা | ফিলিস্তিনি-জর্ডানীয় |
| পেশা | ইসলামি পণ্ডিত, অধ্যাপক, লেখক |
| লেখার ধরন | আকীদা, পরকালবিদ্যা, ফেরেশতা-জিন জগৎ, ইসলামি চিন্তা |
| উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | ইসলামিক ক্রিড সিরিজ (৮ খণ্ড); আল-কিয়ামাহ আস-সুগরা; আল-কিয়ামাহ আল-কুবরা; আলামুল জিন ওয়াশ শায়াতীন; আরববিশ্বে ইসলামি শাসনের পতন ও তার নেপথ্যকথা (বাংলা) |
পরিচিতি
ড. ওমর সুলাইমান আল-আশকার বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের অন্যতম প্রভাবশালী সুন্নি-সালাফি পণ্ডিত ও লেখক। ১৯৪০ সালে ফিলিস্তিনের নাবলুসে জন্ম নেওয়া এই পণ্ডিত জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন জর্ডানে — জর্ডান বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া অনুষদে অধ্যাপনা এবং জারকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া অনুষদের ডিন হিসেবে তিনি ইসলামি উচ্চশিক্ষায় গভীর ছাপ রেখে যান। তার খ্যাতির মূল ভিত্তি আকীদা-বিষয়ক রচনা: বিশেষ করে আট খণ্ডের ইসলামিক ক্রিড সিরিজ (সিলসিলাতুল আকীদা ফী দাওইল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ — “কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আকীদা ধারাবাহিক”) সমকালীন সালাফি আকীদা-সাহিত্যের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। ১৯৯৮ সালে সৌদি প্রকাশক দারুল আলামিয়্যা এই আট খণ্ড ২৫টি ভাষায় অনুবাদের উদ্যোগ নেয় — যা তার আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রমাণ। ২০১২ সালের ১০ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন।
জন্ম ও শিক্ষা
ওমর সুলাইমান আল-আশকার ১৯৪০ সালে তৎকালীন ফিলিস্তিনের নাবলুসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইসলামি পণ্ডিত ও লেখকদের জন্য পরিচিত একটি পরিবারের সন্তান — পরিবারটি পরবর্তীতে কুয়েত ও জর্ডানে প্রতিষ্ঠিত হয়। তার পরিবার মদিনায় চলে গেলে তিনি সৌদি আরবের মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি মিশরের কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
তার শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন যুগের দুই প্রভাবশালী আলেম — শায়খ আবদুল আযীয ইবনে বায এবং হাদিস-বিশারদ শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী। ষাটের দশকে সৌদি আরব থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার আগে তিনি ইবনে বাযের শিষ্য ছিলেন; বহিষ্কারের পর তিনি কুয়েতে কাজ করেন এবং আল-আজহার থেকে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে পশ্চিমা একাডেমিক সূত্রগুলো উল্লেখ করে।
কর্মজীবন
ড. আল-আশকারের কর্মজীবনের দুটি প্রধান কেন্দ্র ছিল জর্ডানের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি জর্ডান বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া অনুষদে অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন এবং জারকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেন। জর্ডানের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক হিসেবে তিনি স্বীকৃত ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নিরলস লেখক — আকীদা, পরকালবিদ্যা, ফিকহি চিন্তাধারা ও ইসলামি সংস্কৃতি নিয়ে তার বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
তার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আন্তর্জাতিক অনুবাদ-প্রকল্প: ১৯৯৮ সালে সৌদি প্রকাশক “আদ-দারুল আলামিয়্যা লিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ” তার আট খণ্ডের আকীদা সিরিজ ২৫টি ভাষায় অনুবাদের চুক্তি করে; এর মধ্যে পরকালবিদ্যা-বিষয়ক খণ্ডটি ১৯৯৯ সালে প্রথম ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ইসলামিক পাবলিশিং হাউস (IIPH) পুরো সিরিজের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে, যা পশ্চিমা মুসলিম পাঠকের কাছে তাকে পরিচিত করে তোলে।
সাহিত্যকর্ম
ড. আল-আশকারের রচনাবলির কেন্দ্রে রয়েছে আকীদা — ইসলামি বিশ্বাসের প্রতিটি মৌলিক স্তম্ভ নিয়ে তিনি পৃথক পৃথক মনোগ্রাফ রচনা করেছেন। তার প্রধান গ্রন্থগুলো:
- ইসলামিক ক্রিড সিরিজ (৮ খণ্ড) — আকীদার পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়ন: ১. আল্লাহর প্রতি ঈমান (আল-আকীদা ফিল্লাহ); ২. মহান ফেরেশতাদের জগৎ (আলামুল মালাইকাতিল আবরার); ৩. জিন ও শয়তানদের জগৎ (আলামুল জিন ওয়াশ শায়াতীন); ৪. রাসূলগণ ও রিসালাতসমূহ (আর-রুসুল ওয়ার রিসালাত); ৫. ছোট কিয়ামত / মৃত্যু-পরবর্তী জীবন (আল-কিয়ামাহ আস-সুগরা); ৬. কিয়ামতের দিন (আল-কিয়ামাহ আল-কুবরা); ৭. জান্নাত ও জাহান্নাম; ৮. তাকদীর ও কাযা-কদর।
- আলামুল জিন ওয়াশ শায়াতীন — জিন-শয়তান বিষয়ে সালাফি মহলে একটি প্রধান সূত্র-গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত; মিশরের আনসারুস সুন্নাহসহ বহু পণ্ডিত এই বইকে উদ্ধৃত করেন।
- আল্লাহ ইউহাদ্দিসু ইবাদাহু আন নাফসিহি — আল্লাহর গুণাবলী নিয়ে রচনা।
- আত-তাকওয়া: তারীফুহা ওয়া ফাদলুহা — তাকওয়ার সংজ্ঞা, ফজিলত ও বাণী।
- নাহওয়া সাকাফাতিন ইসলামিয়্যাতিন আসীলাহ — মৌলিক ইসলামি সংস্কৃতির রূপরেখা।
- মাকাসিদুল মুকাল্লাফীন — শরিয়তের উদ্দেশ্য নিয়ে রচনা।
বাংলা ভাষায় তার যে বইগুলো পাওয়া যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: আরববিশ্বে ইসলামি শাসনের পতন ও তার নেপথ্যকথা (মাকতাবাতুল হেরা; অনুবাদ: উমাইর লুৎফর রহমান) — আরব বিশ্বে ইসলামি শাসনের পতনের কারণ নিয়ে গভীর গবেষণার ফসল হিসেবে বইটির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; এবং মহাপ্রলয় থেকে অনন্তজীবন (রুহামা পাবলিকেশন) — পরকাল-বিষয়ক রচনার বাংলা রূপ।
রচনাশৈলী ও মূল্যায়ন
ড. আল-আশকারের রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্য হলো কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক সুশৃঙ্খল উপস্থাপনা। তিনি আকীদার প্রতিটি বিষয়কে স্বতন্ত্র খণ্ডে ভাগ করে পাঠকের জন্য সহজবোধ্য করেছেন — “সবকিছু এক বইয়ে ঠেসে দেওয়ার” বদলে প্রতিটি ঈমানের স্তম্ভকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছেন। তার ভাষা একাডেমিক হলেও প্রবহমান; দলিল-উপস্থাপনে তিনি ধ্রুপদি ও সমকালীন উভয় সূত্র ব্যবহার করেন।
পশ্চিমা একাডেমিক মূল্যায়নে তার কিছু স্বতন্ত্র অবস্থান চিহ্নিত হয়েছে: পরকালবিদ্যায় তিনি পূর্বসূরিদের মতো কঠোর হাদিস-সমালোচনা প্রয়োগ করেননি; “জাহান্নামের ধ্বংস” (ফানাউন নার) মতবাদ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন; আর জিন-শয়তান বিষয়ে তিনি হাসান আল-বসরির সংখ্যালঘু মতের পক্ষে গিয়ে বলেছেন, ইবলিসের গোত্রভুক্ত হলো জিন জাতি। ফেরেশতা-বিষয়ক বহু প্রচলিত হাদিস তিনি উপেক্ষা করেছেন বলেও সমালোচকরা উল্লেখ করেন। এই স্বতন্ত্র অবস্থানগুলোই তাকে শুধু “সংকলক” নয়, একজন মৌলিক চিন্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তার পরকাল-বিষয়ক রচনার প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল-কিয়ামাহ আস-সুগরা (ছোট কিয়ামত) গ্রন্থে তিনি মৃত্যু, কবরের জীবন, ফেরেশতাদের প্রশ্নোত্তর ও কিয়ামতের আলামত নিয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন; আর আল-কিয়ামাহ আল-কুবরা (বড় কিয়ামত) গ্রন্থে শিঙায় ফুঁক, পুনরুত্থান, হাশর, হিসাব-নিকাশ থেকে জান্নাত-জাহান্নামে প্রবেশ পর্যন্ত পুরো পরকালীন ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করেছেন। এই দুটি খণ্ড একসঙ্গে ইসলামি পরকালবিদ্যার একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যপুস্তক হিসেবে কাজ করে — যা আগে খণ্ড-খণ্ডভাবে বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে ছিল। ইংরেজি অনুবাদে (“The Minor Resurrection”, “The Day of Resurrection”) এই বইগুলো পশ্চিমা মুসলিম পাঠকের কাছেও ব্যাপকভাবে পঠিত হয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, ড. ওমর সুলাইমান আল-আশকার সমকালীন সালাফি আকীদা-চিন্তার অন্যতম প্রধান রূপকার। তার আট খণ্ডের সিরিজ আজও আকীদা-শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে স্থান পায়; ২৫ ভাষায় অনুবাদ তার বৈশ্বিক প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়। তার কিছু স্বতন্ত্র ফিকহি-আকীদাগত অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, সুশৃঙ্খল ও দলিলভিত্তিক উপস্থাপনার কারণে তিনি পাঠক ও গবেষক — উভয় মহলেই সমাদৃত। বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাঠকও এখন তার চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।