ড. ইউসুফ আল কারযাভী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | ইউসুফ আব্দুল্লাহ আল-কারযাভী |
| জন্ম | ৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ |
| জন্মস্থান | সাফত তুরাব, গারবিয়া, নীল ব-দ্বীপ, মিশর (তৎকালীন মিশর রাজ্য) |
| মৃত্যু | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, দোহা, কাতার (বয়স ৯৬) |
| জাতীয়তা | মিশরীয় (পরে কাতারি নাগরিকত্ব লাভ) |
| পেশা | ইসলামি পণ্ডিত, ফকিহ, লেখক, বক্তা |
| শিক্ষা | আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় — আলিমিয়া (১৯৫২–৫৩), স্নাতকোত্তর (১৯৬০), পিএইচডি (১৯৭৩) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | আল-হালাল ওয়াল-হারাম ফিল-ইসলাম (ইসলামে হালাল ও হারাম, ১৯৬০), ফিকহুয যাকাত, ফিকহুল জিহাদ; আল জাজিরার ‘আশ-শারিয়া ওয়াল-হায়া’ অনুষ্ঠান; ইসলামঅনলাইন; ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সের চেয়ারম্যান |
| পুরস্কার | কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার; দুবাই আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন পুরস্কার; আল-ওয়াইস পুরস্কার; জর্ডানের স্বাধীনতা পদক (প্রথম শ্রেণি) |
পরিচিতি
ড. ইউসুফ আল কারযাভী (৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ – ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২) ছিলেন মিশরীয় ইসলামি পণ্ডিত, ফকিহ, লেখক ও বক্তা — বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ ও একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের সবচেয়ে প্রভাবশালী সুন্নি আলেমদের একজন। দোহা-ভিত্তিক এই পণ্ডিত ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সের (আইইউএমএস) চেয়ারম্যান। আল জাজিরা টেলিভিশনে তার ‘আশ-শারিয়া ওয়াল-হায়া’ (শরিয়া ও জীবন) অনুষ্ঠান বিশ্বের ৪ থেকে ৬ কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছাত বলে ধারণা করা হয়; এছাড়া ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা ‘ইসলামঅনলাইন’ ওয়েবসাইটের প্রধান ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন তিনি। ফিকহ, যাকাত, ইসলামি অর্থনীতি ও সমসাময়িক মুসলিম জীবন নিয়ে শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি।
জন্ম ও শৈশব
১৯২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মিশরের নীল ব-দ্বীপের গারবিয়া অঞ্চলের সাফত তুরাব গ্রামে এক দরিদ্র ধর্মপ্রাণ কৃষক পরিবারে ইউসুফ কারযাভীর জন্ম। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন; মা ও চাচার তত্ত্বাবধানে বড় হন। দশ বছর বয়সের আগেই তিনি সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ (মুখস্থ) সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন
তানতার ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয় বছর পড়াশোনা করেন তিনি; এ সময় স্কুলে হাসান আল-বান্নার একটি বক্তৃতা শুনে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন বলে জানা যায়। পরে কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন — উসুল আদ-দীন (ধর্মের মূলনীতি) অনুষদ থেকে আলিমিয়া ডিগ্রি (১৯৫২–৫৩), আরবি ভাষা ও সাহিত্যে ডিপ্লোমা (১৯৫৮), কুরআনিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর (১৯৬০) এবং ১৯৭৩ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন; গবেষণার বিষয় ছিল যাকাত ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে এর ভূমিকা, যাতে তিনি প্রথম শ্রেণির মেধাস্থান পান। মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংযোগের কারণে বাদশাহ ফারুকের আমলে ১৯৪৯ সালে এবং প্রেসিডেন্ট নাসেরের আমলে তিনি কারাবরণ করেন।
কর্মজীবন
পড়াশোনা শেষে তিনি মিশরের ধর্মীয় ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ে এবং আল-আজহারের ইসলামি সংস্কৃতি বিভাগে কাজ করেন। ১৯৬১–৬২ সালে আল-আজহার তাকে কাতারে পাঠায় দোহার ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে; এরপর থেকে আমৃত্যু কাতারই ছিল তার কর্মস্থল — তিনি কাতারি নাগরিকত্বও লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে শরিয়া ও ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং এর ডিন হন; একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন সিরাহ ও সুন্নাহ গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৯০–৯১ সালে তিনি আলজেরিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চ প্রতিষ্ঠানসমূহের বৈজ্ঞানিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন এবং এর প্রধান হন; পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের মিশরীয় বিপ্লবের পর তিনি ১৯৬১ সালের পর প্রথমবার মিশরে ফেরেন এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি কায়রোর তাহরির স্কয়ারে জুমার নামাজে ইমামতি করেন।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
কারযাভী শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন — ফিকহ, আকিদা, ইসলামি অর্থনীতি, নারী ও পরিবার, পাশ্চাত্যে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিধানসহ সমসাময়িক প্রায় প্রতিটি বিষয়ে। তার সবচেয়ে পরিচিত গ্রন্থ ‘আল-হালাল ওয়াল-হারাম ফিল-ইসলাম’ (ইসলামে হালাল ও হারাম, ১৯৬০) পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আছে ফিকহুয যাকাত, ফিকহুল জিহাদ, ফিকহুল আওলাউইয়্যাত ও ইসলাম: ভবিষ্যৎ সভ্যতা। চরমপন্থা ও শিথিলতা — দুই প্রান্তিকতা এড়িয়ে মধ্যপন্থী (ওয়াসাতিয়া) ধারার প্রবক্তা হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও ফতোয়া কাউন্সিলের মাধ্যমে সাধারণ মুসলিমদের কাছে শরিয়তের ব্যাখ্যা পৌঁছে দেওয়ায় তিনি মিডিয়া-যুগের ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হন।
বিতর্ক ও সমালোচনা
তার কিছু মতামত ও ফতোয়া আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্য তাকে প্রবেশ ভিসা দিতে অস্বীকার করে এবং ২০১২ সালে ফ্রান্সে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে; তবে তিনি বারবার বলেছেন যে তিনি আর সংগঠনটির সদস্য নন এবং ১৯৭৬ ও ২০০৪ সালে দুবার সংগঠনের নেতৃত্বের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
ব্যক্তিগত জীবন
তার সন্তানদের মধ্যে আছেন আব্দুর রহমান ইউসুফ ও ইলহাম আল-কারযাভী। পারিবারিক জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য সূত্রে এর বেশি বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না বলে এখানে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
পুরস্কার ও সম্মাননা
- কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার (সৌদি আরব)
- মালয়েশিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কার
- দুবাই আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন পুরস্কার
- ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ পুরস্কার
- সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ওয়াইস পুরস্কার
- জর্ডানের স্বাধীনতা পদক (প্রথম শ্রেণি)
- ২০০৮ সালে ফরেন পলিসি ও প্রসপেক্ট ম্যাগাজিনের বিশ্বের শীর্ষ বুদ্ধিজীবী জরিপে তৃতীয় স্থান
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কাতারের দোহায় ৯৬ বছর বয়সে ইউসুফ আল কারযাভীর মৃত্যু হয়। দোহার ইমাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব মসজিদে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে — যাদের মধ্যে ছিলেন কাতারের ডেপুটি আমিরসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা — তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়; পরে তাকে দোহার মেসাইমির কবরস্থানে দাফন করা হয়।
কারযাভীকে সমসাময়িক ইসলামি চিন্তার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণ করা হয় — মধ্যপন্থী ফিকহি ধারার প্রসার, ইসলামি অর্থনীতির আধুনিক ব্যাখ্যা এবং টেলিভিশন-ইন্টারনেট যুগে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান স্বীকৃত। একই সঙ্গে তার কিছু রাজনৈতিক অবস্থান ও ফতোয়া নিয়ে বিতর্কও তার উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে আছে।
প্রোফাইল ছবি: Wikimedia Commons (CC BY 3.0, Nmkuttiady)