জুলফিকার আহমদ কিসমতি
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতী |
|---|---|
| জন্ম | ২ জানুয়ারি ১৯৩৫, বাগৈগ্রাম (মোক্তার বাড়ি), চৌদ্দগ্রাম উপজেলা, কুমিল্লা |
| মৃত্যু | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ঢাকা |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | সাংবাদিক, গবেষক, লেখক ও ইসলামি চিন্তাবিদ |
| শিক্ষা | বটগ্রাম হামিদিয়া মাদ্রাসা; হাটহাজারি মাদ্রাসা; ফেনী আলিয়া মাদ্রাসা |
| উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | এই সময় এই জীবন; আজাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের সংগ্রামী ভূমিকা; দার্শনিক শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী ও তার চিন্তাধারা; বাংলাদেশের সংগ্রামী আলেম-ওলামা পীর-মাশায়েখ |
পরিচিতি
মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতী (১৯৩৫–২০১৫) ছিলেন বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক, গবেষক, বহু গ্রন্থপ্রণেতা ও ইসলামি চিন্তাবিদ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একইসাথে সাংবাদিকতা, গবেষণা, সম্পাদনা ও লেখালেখিতে অবদান রেখেছেন। ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশন্স কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম বাংলা বিশ্বকোষের অন্যতম সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলা জ্ঞান-সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্থায়ী স্থান অধিকার করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব অনুষ্ঠানের আরবি সংবাদ পাঠক ও পর্যালোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার সিনিয়র সহকারী সম্পাদক ছিলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ও বাংলা একাডেমির সদস্য হিসেবেও তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন। (উল্লেখ্য, বিভিন্ন সূত্রে তাঁর নামের বানান কিসমতী ও কিসমতি—দুভাবেই পাওয়া যায়।)
জন্ম ও শিক্ষা
তিনি ১৯৩৫ সালের ২ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাগৈগ্রাম গ্রামের মোক্তার বাড়ির এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সি সেকান্দার আলি ও মাতার নাম জমিলা খাতুন। প্রাথমিক শিক্ষা তিনি স্থানীয় হাজতখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গ্রহণ করেন। পরে বটগ্রাম হামিদিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন; এখান থেকে ১৯৫১ সালে দাখিল, ১৯৫৫ সালে আলিম এবং বাংলা ও ইংরেজি অতিরিক্ত বিষয় নিয়ে ১৯৫৭ সালে ফাজিল পাশ করেন। একই বছর তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারি মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস সমাপ্ত করেন। এরপর কামিল পড়ার জন্য ফেনী আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং তাফসিরে বাইযাবি, তাফসিরে কাশশাফ, বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফসহ নানা ইসলামি গ্রন্থ অধ্যয়ন করে ১৯৫৯ সালে কামিল পাশ করেন।
কর্মজীবন
তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ১৯৬০ সালে, ঢাকা থেকে প্রকাশিত উর্দু সাপ্তাহিক ইনসাফ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকার এমদাদিয়া প্রকাশনা বিভাগে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার সিনিয়র সহকারী সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশন্স প্রকাশিত প্রথম বাংলা বিশ্বকোষের অন্যতম সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন এবং বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব অনুষ্ঠানে আরবি সংবাদ পাঠ ও পর্যালোচনার দায়িত্বে ছিলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্পাদনা পরিষদের সদস্য এবং বাংলা একাডেমির সদস্য হিসেবেও তিনি প্রতিষ্ঠানিক অঙ্গনে অবদান রেখেছেন।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
জুলফিকার আহমদ কিসমতী প্রায় ত্রিশটি মৌলিক ও অনূদিত গ্রন্থ রচনা করেন; তাঁর লেখা বাংলা ইসলামি চিন্তাধারা ও সংস্কারমূলক সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে বলে গণ্য করা হয়। তাঁর মৌলিক রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: এই সময় এই জীবন; শহীদে কারবালা; আল কুরআনের দৃষ্টিতে সমাজসেবা; আজাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের সংগ্রামী ভূমিকা; চিন্তাধারা; বাংলাদেশের সংগ্রামী আলেম-ওলামা পীর-মাশায়েখ; দার্শনিক শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী ও তার চিন্তাধারা; আমাদের মাদরাসা শিক্ষা; ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র; ষড়যন্ত্রের অন্তরালে; মানবতা বিধ্বংসী দুটি মতবাদ; ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের পহেলা শহীদ ইমাম হোসাইন; এবং আরবি ভাষায় রচিত আল-উম্মাতুল মুসলিমাহ ওয়াল-লুগাতুল আরাবিয়া। তাঁর অনূদিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে: মহানবী (সা.) (আরবি সীরাতুন্নবীর অনুবাদ); আদর্শ কীভাবে প্রচার করতে হবে (তাবলীগ কি হিকমাতের অনুবাদ); শরীয়তী রাষ্ট্রব্যবস্থা (ইমাম ইবনে তাইমিয়ার আহকামে শারঈয়ার অনুবাদ); সোভিয়েত ইউনিয়নে মুসলমান; মাযহাব সৃষ্টির গোড়ার কথা (শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর গ্রন্থের অনুবাদ); এবং উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্রমবিকাশের ইতিহাস (উর্দু গ্রন্থ আবে কাউসারের অনুবাদ)।
ব্যক্তিগত জীবন
তাঁর পিতা মুন্সি সেকান্দার আলি ও মাতা জমিলা খাতুনের নাম নির্ভরযোগ্য জীবনীসূত্রে উল্লেখিত হয়েছে। এর বাইরে তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ পারিবারিক জীবন সম্পর্কে প্রকাশ্যে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি, তাই এখানে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
পুরস্কার
তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কার বা সম্মাননা সম্পর্কে প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর কর্মের একাডেমিক স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতী: আরবি ও বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা ও সাংবাদিকতা শিরোনামে তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর একটি অভিসন্দর্ভ (২০১৪) উপস্থাপিত হয়েছে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
তিনি ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বাংলা ইসলামি গবেষণা-সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও বাংলা বিশ্বকোষ সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে তাঁর জীবন-কর্ম নিয়ে রচিত অভিসন্দর্ভটি তাঁর উত্তরাধিকারের একাডেমিক স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হয়।