মূল কন্টেন্টে যান
জাহানারা ইমাম

জাহানারা ইমাম

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

পূর্ণ নাম জাহানারা ইমাম
উপাধি শহীদ জননী
জন্ম ৩ মে ১৯২৯, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত)
মৃত্যু ২৬ জুন ১৯৯৪, মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র
সমাধি শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, মিরপুর, ঢাকা
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা লেখিকা, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী
শিক্ষা কারমাইকেল কলেজ, রংপুর (১৯৪৫); লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (বিএ, ১৯৪৭); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ, ১৯৬২; শিক্ষায় বিএ)
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি (১৯৮৬), অন্য জীবন (১৯৮৫), বীরশ্রেষ্ঠ (১৯৮৫), জীবন মৃত্যু (১৯৮৮)
পুরস্কার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭, মরণোত্তর) প্রমুখ

পরিচিতি

জাহানারা ইমাম (৩ মে ১৯২৯ – ২৬ জুন ১৯৯৪) বাংলাদেশের লেখিকা ও রাজনৈতিক কর্মী, যিনি মুক্তিযুদ্ধের দিনপঞ্জিমূলক আত্মজীবনী একাত্তরের দিনগুলি-এর জন্য সর্বাধিক পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধে পুত্র শাফি ইমাম রুমিকে হারানোর পর তিনি সারাদেশে ‘শহীদ জননী’ নামে পরিচিতি পান। স্বাধীনতার পর লেখালেখি শুরু করে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালের ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

জন্ম ও শিক্ষা

১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে একটি মুসলিম পরিবারে জাহানারা ইমামের জন্ম। বাবা সৈয়দ আবদুল আলি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট; মা হামিদা আলি। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে কেটেছে তার শৈশব। তখন নারীশিক্ষা চাপের মুখে থাকলেও মায়ের দৃঢ় সংকল্পে তার পড়াশোনা অব্যাহত থাকে। ১৯৪৫ সালে রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে ভর্তি হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ডিগ্রি (১৯৪৭) অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ এবং শিক্ষায় বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন

শিক্ষকতাই ছিল জাহানারা ইমামের পেশা। ১৯৫১ সালে তিনি ‘খাওয়াতীন’ নামে একটি মহিলা মাসিক পত্রিকার প্রথম সম্পাদক হন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজে এবং ১৯৭০ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে তিনি শিক্ষকতা করেন।

সাহিত্যজীবন

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাহানারা ইমাম সাহিত্যজীবন শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার যুদ্ধদিনের ডায়েরি একাত্তরের দিনগুলি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয় — বইটি ১ মার্চ থেকে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত দিনপঞ্জি আকারে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও পারিবারিক ট্র্যাজেডির প্রত্যক্ষ বর্ণনা দেয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা পুনর্জাগরণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে আছে অন্য জীবন (১৯৮৫), বীরশ্রেষ্ঠ (১৯৮৫), জীবন মৃত্যু (১৯৮৮), চিরায়ত সাহিত্য (১৯৮৯), বুকের ভিতরে আগুন (১৯৯০), নাটকের অবসান (১৯৯০) ও দুই মেরু (১৯৯০)।

মুক্তিযুদ্ধ ও ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলন

১৯৭১ সালের মার্চে যুদ্ধ শুরু হলে তার পুত্র শাফি ইমাম রুমি — তখন প্রকৌশল পড়তে বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনাকারী মেধাবী ছাত্র — মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। এক রাতে পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়; তিনি আর ফেরেননি। স্বামী শরিফ ইমাম ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার; যুদ্ধের সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হলেও ব্ল্যাকআউটের কারণে চিকিৎসা-যন্ত্র চালু করা যায়নি, ফলে তিনি মারা যান। এই আত্মত্যাগ থেকেই জাহানারা ইমাম ‘শহীদ জননী’ উপাধি পান। ১৯৯২ সালে তিনি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (ঘাতক ও দালালদের নির্মূল কমিটি) গঠন করেন ও এর প্রধান মুখ হন। কমিটি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় গণআদালত (জনগণের আদালত) বসিয়ে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযুক্তদের ‘দণ্ড’ ঘোষণা করে। এজন্য তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়; তবে ১৯৯৬ সালে তার মৃত্যুর পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এই অভিযোগ প্রত্যাহার করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

জাহানারা ইমাম শরিফুল আলম ইমাম আহমেদের (শরিফ ইমাম) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের পুত্র শাফি ইমাম রুমি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। যুদ্ধের পর তিনি বেঁচে থাকা সন্তানকে নিয়ে জীবনের বাকি সময় কাটান।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সাহিত্য ও সমাজসেবায় অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার (১৯৮৮), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭, মরণোত্তর) ও রোকেয়া পদক (১৯৯৮, মরণোত্তর)।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

১৯৮১ সালে তার মুখের ক্যানসার ধরা পড়ে; অস্ত্রোপচারের ফলে কথা বলতে কষ্ট হতো, তবু তিনি লেখালেখি ও মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থাকার কাজ চালিয়ে যান। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে তিনি মারা যান; পরে ঢাকার মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশে তার মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তার আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে ন্যায়বিচারের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।