ইমাম বাইহাকী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | আবু বকর আহমদ ইবনে আল-হুসাইন ইবনে আলী ইবনে মুসা আল-খুসরাউজিরদী আল-বাইহাকী |
| পরিচিত নাম | ইমাম বাইহাকী |
| জন্ম | রমজান ৩৮৪ হিজরি / অক্টোবর ৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ — খুসরাউজিরদ, বাইহাক (বর্তমান সাবজেভার, ইরান) |
| মৃত্যু | ১০ জমাদিউল আউয়াল ৪৫৮ হিজরি / ৯ এপ্রিল ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ — নিশাপুর (বয়স ৭২) |
| উপাধি | শাইখুল ইসলাম, হাফিজ |
| জাতীয়তা | ইরানি |
| পেশা | মুহাদ্দিস, ফকীহ |
| মাজহাব | শাফিঈ |
| শিক্ষা | পনেরো বছর বয়স থেকে হাদিস অধ্যয়ন; আল-হাকিম আন-নিশাপুরীসহ শতাধিক উস্তাদ; খোরাসান, ইরাক ও হেজাজে জ্ঞানান্বেষণ ভ্রমণ |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | আস-সুনানুল কুবরা, শুআবুল ঈমান, মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, দালাইলুন নবুওয়াহ, আল-আসমা ওয়াস সিফাত, মানাকিবুশ শাফিঈ |
পরিচিতি
আবু বকর আল-বাইহাকী (৯৯৪–১০৬৬) তাঁর যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ হাদিস-বিশারদ হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। “শাইখুল ইসলাম” উপাধিতে ভূষিত এই পণ্ডিত একই সঙ্গে ছিলেন শাফিঈ মাজহাবের প্রামাণ্য ব্যক্তিত্ব এবং আশআরী ধর্মতত্ত্বের প্রবক্তা। প্রখ্যাত জীবনীকার ইমাম যাহাবী তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেন — তাঁর যুগে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলেন না, তিনি ছিলেন নিজ সময়ের হাফিজ। তাঁর রচিত আস-সুনানুল কুবরা হাদিসশাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংকলন হিসেবে আজও অধ্যয়ন করা হয়।
জন্ম ও শিক্ষা
৯৯৪ সালের অক্টোবরে (রমজান ৩৮৪ হি.) খোরাসানের বাইহাক অঞ্চলের খুসরাউজিরদ গ্রামে তাঁর জন্ম; “আল-বাইহাকী” নামটি এই অঞ্চলের দিকেই ইঙ্গিত করে। পনেরো বছর বয়স থেকে তিনি হাদিস শোনা ও সংগ্রহ শুরু করেন। জীবনীকার আস-সুবকীর বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি শতাধিক উস্তাদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- আল-হাকিম আন-নিশাপুরী — খোরাসানের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস; বাইহাকী ছিলেন তাঁর প্রধান শিষ্য
- আবু তাহির মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আয-যিয়াদী — ফকীহ ও মুহাদ্দিস
- আবু বকর ইবনে ফূরাক ও আবু মানসূর আল-বাগদাদী — ধর্মতত্ত্ববিদ
- আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী — সূফী-জীবনীকার ও মুহাদ্দিস
কর্মজীবন
জ্ঞানান্বেষণে ইমাম বাইহাকী খোরাসান, ইরাক ও হেজাজ ভ্রমণ করেন — বাগদাদ, কুফা, মক্কাসহ বহু শহরে অসংখ্য পণ্ডিতের কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেন। পরে তিনি নিশাপুরে স্থায়ী হন, সেখানে শিক্ষাদান করেন এবং গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেন। সমসাময়িক বর্ণনায় তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী, ধার্মিক ও তপস্বীপ্রবণ মানুষ হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন। হাদিসের সনদ-যাচাইয়ে তিনি যুক্তিনির্ভর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পদ্ধতি প্রয়োগ করতেন বলে জানা যায়।
রচনাবলি
তাঁর রচনার পরিমাণ বিপুল — জীবনীকারদের মতে শত শত খণ্ডের সমান। প্রধান গ্রন্থগুলো:
- আস-সুনানুল কুবরা — তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা; ফিকহের অধ্যায়-বিন্যাসে সাজানো বিশাল হাদিস-সংকলন। সংগঠন, শ্রেণিবিন্যাস ও উৎকর্ষে এই ধরনের সংকলনে অতুলনীয় বলে বিবেচিত।
- মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার — শাফিঈ ফকীহদের জন্য অপরিহার্য গ্রন্থ; ইমাম শাফিঈর হাদিস-জ্ঞানের বিস্তৃতি তুলে ধরাই এর উদ্দেশ্য ছিল বলে তাকিউদ্দীন আস-সুবকী মন্তব্য করেন।
- শুআবুল ঈমান — ঈমানের শাখা-প্রশাখা বিষয়ে হাদিস-সংকলন।
- দালাইলুন নবুওয়াহ — নবুয়তের প্রমাণ ও নিদর্শন বিষয়ে।
- আল-আসমা ওয়াস সিফাত, আস-সুনানুস সুগরা (আল-ওয়ুস্তা), মানাকিবুশ শাফিঈ প্রভৃতি।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১০৬৬ সালের ৯ এপ্রিল নিশাপুরে তাঁর মৃত্যু হয়; বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনী তাঁর সম্পর্কে বলেন — প্রত্যেক শাফিঈ পণ্ডিত ইমাম শাফিঈর কাছে ঋণী, কিন্তু বাইহাকীর কাছে ইমাম শাফিঈই ঋণী; কারণ তিনি এত গ্রন্থ রচনা করে মাজহাবকে শক্তিশালী করেছেন, ইমামের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যগুলো বিস্তারিত করেছেন এবং তাঁর মতামতের পক্ষে দলিল দিয়েছেন। আজও হাদিস-গবেষণায় সুনানে কুবরা একটি অপরিহার্য সূত্রগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।