মূল কন্টেন্টে যান
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম আবুল ফযল আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ জালালুদ্দীন আল-খুদায়রী আল-সুয়ূতী
জন্ম ১ রজব ৮৪৯ হিজরি / অক্টোবর ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দ, কায়রো (খ্রিস্টাব্দ তারিখ নিয়ে উৎসভেদে ৩ বা ১১ অক্টোবর পাওয়া যায়)
মৃত্যু ১৯ জুমাদাল উলা ৯১১ হিজরি / ১৮ অক্টোবর ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দ, কায়রো
জাতীয়তা মিশরীয় (মামলুক যুগ)
মাযহাব ও আকীদা শাফেয়ী ফিকহ; আশআরী আকীদা; শাযিলী তরীকার সুফী
পেশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকীহ, ইতিহাসবিদ, ভাষাবিদ, শিক্ষক
উল্লেখযোগ্য কর্ম তাফসীরে জালালাইন, আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন, আদ-দুররুল মানসূর, আল-জামিউস সগীর, তারীখুল খুলাফা, বুগইয়াতুল উআত
সম্মাননা শায়খুল ইসলাম, আল-হাফিয উপাধি

পরিচিতি

ইমাম জালালুদ্দীন আবদুর রহমান আস-সুয়ূতী (১৪৪৫–১৫০৫) মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচুর্যশালী ও বহুবিদ্যাজ্ঞ লেখকদের একজন। ইসলামী ধর্মবিদ্যার প্রায় প্রতিটি শাখা — আকীদা, শরীআত, ফিকহ, হাদীস, তাফসীর, আরবী ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলংকারশাস্ত্র, ইতিহাস, এমনকি গণিত ও চিকিৎসাশাস্ত্র — সব ক্ষেত্রেই তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার রচনার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক বলে গণ্য করা হয়; অনেক উৎসে এক হাজারের কাছাকাছিও উল্লেখ আছে। এই অসাধারণ প্রাচুর্যের জন্য তাকে ‘শায়খুল ইসলাম’ ও ‘আল-হাফিয’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

জন্ম ও শৈশব

সুয়ূতীর জন্ম কায়রোতে, ১ রজব ৮৪৯ হিজরিতে (অক্টোবর ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দ; খ্রিস্টাব্দ তারিখ নিয়ে উৎসভেদে ৩ বা ১১ অক্টোবর উভয়ই পাওয়া যায়)। তার পিতা ছিলেন ফার্সি বংশোদ্ভূত আলেম, যিনি কায়রোর শায়খু মসজিদ ও খানকায় শাফেয়ী ফিকহ পড়াতেন; মা ছিলেন সার্কাসীয়। সুয়ূতীর পূর্বপুরুষেরা বাগদাদের আল-খুদায়রিয়া অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। পরিবারটি মিশরের আসয়ুত (আসিউত) শহরে বসতি স্থাপন করে, যার ফলে তিনি ‘আল-সুয়ূতী’ নামে পরিচিত হন।

সুয়ূতীর বয়স যখন পাঁচ বা ছয় বছর, তখন তার পিতার মৃত্যু হয়। ফলে তিনি কায়রোতে এতিম হিসেবে বড় হন এবং পিতার বন্ধু ও শিষ্যদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করেন।

শিক্ষাজীবন

অল্প বয়সেই সুয়ূতী ইসলামী ধর্মবিদ্যার গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি শাফেয়ী ও হানাফী ফিকহ, হাদীস, তাফসীর, ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, অলংকারশাস্ত্র, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, গণিত, সময়নির্ণয় (মীকাত) ও চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। কুরআনের পাশাপাশি তিনি আল-উমদা, মিনহাজুল ফিকহ ওয়াল উসূল ও ইবনে মালিকের আলফিয়া গ্রন্থও মুখস্থ করেন। জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে তিনি দামেস্ক, হিজাজ, ইয়েমেন, ভারত, মরক্কো এবং মিশরের মাহাল্লা, দুমিয়াত ও ফাইয়ুমসহ বিভিন্ন জ্ঞানকেন্দ্রে ভ্রমণ করেন।

কর্মজীবন

মাত্র আঠারো বছর বয়সে সুয়ূতী পিতার সেই শায়খু মসজিদেই শাফেয়ী ফিকহ পড়াতে শুরু করেন। ১৪৬৭ সালে তিনি ইবনে তুলুন মসজিদে হাদীস অধ্যয়ন পুনরায় শুরু করেন এবং ১৪৭২ সালে মর্যাদাপূর্ণ শায়খুনিয়া মাদ্রাসায় হাদীসের শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৪৮৬ সালে মামলুক সুলতান কাইতবাই তাকে কায়রোর বায়বার্স খানকার (সুফী আবাস) শায়খ হিসেবে নিয়োগ দেন। সুয়ূতী নিজেও শাযিলী তরীকার সুফী ছিলেন।

এক পর্যায়ে তিনি নিজেকে নবম হিজরী শতকের ‘মুজাদ্দিদ’ (ধর্মসংস্কারক) এবং ফিকহ, হাদীস ও আরবী ভাষায় ‘মুজতাহিদ’ হিসেবে দাবি করেন। এই দাবি তৎকালীন আলেম ও শাসকদের সঙ্গে মতবিরোধ ও টানাপোড়েনের সৃষ্টি করে। খানকার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধের জেরে ১৫০১ সালে তিনি কায়রোর কাছে রওদা দ্বীপে অবসরে চলে যান এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই নিভৃতে গবেষণা ও লেখালেখিতে মগ্ন ছিলেন।

রচনাবলী

সুয়ূতীর রচনাসম্ভার ইসলামী সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য। অনেকগুলো ছোট পুস্তিকা হলেও অনেকগুলোই বিশ্বকোষধর্মী বৃহৎ গ্রন্থ। উল্লেখযোগ্য রচনা:

  • তাফসীরে জালালাইন — কুরআনের শব্দে শব্দে তাফসীর; প্রথম অংশ লেখেন তার শিক্ষক জালালুদ্দীন আল-মাহাল্লী, বাকিটা সম্পূর্ণ করেন সুয়ূতী।
  • আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন — কুরআন-বিজ্ঞানের ওপর সুপরিচিত গ্রন্থ।
  • আদ-দুররুল মানসূর ফিত তাফসীর বিল মা’সূর — হাদীস ও আছারভিত্তিক তাফসীর।
  • আল-জামিউস সগীর — হাদীস সংকলন।
  • তারীখুল খুলাফা — খলীফাদের ইতিহাস (ইংরেজিতে অনূদিত)।
  • বুগইয়াতুল উআত ফী তাবাকাতিল লুগাবিইয়ীন ওয়ান নুহাত — আরবী ভাষাতত্ত্বের অগ্রদূতদের জীবনী-অভিধান।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

১৯ জুমাদাল উলা ৯১১ হিজরি মোতাবেক ১৮ অক্টোবর ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে (কোনো কোনো উৎসে ১৭ অক্টোবর) কায়রোতে সুয়ূতীর মৃত্যু হয়; বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তাকে কায়রোতেই দাফন করা হয়।

সুয়ূতীকে আজও শাফেয়ী মাযহাবের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় রচনা করা বিরল বহুবিদ্যাজ্ঞ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তার তাফসীরে জালালাইন বিশ্বব্যাপী মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য এবং আল-ইতকান কুরআন-গবেষণার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।