মূল কন্টেন্টে যান

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাম্বাল (কুনিয়া: আবু আবদুল্লাহ)
জন্ম নভেম্বর ৭৮০ খ্রিস্টাব্দ (রবিউল আউয়াল ১৬৪ হিজরি)
জন্মস্থান বাগদাদ, আব্বাসীয় খিলাফত (অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে; কারো কারো মতে মার্ভ)
মৃত্যু ২ আগস্ট ৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ (১২ রবিউল আউয়াল ২৪১ হিজরি), বাগদাদ
জাতীয়তা আব্বাসীয় (আরব)
পেশা হাদীছবিশারদ, ফকীহ, ধর্মতত্ত্ববিদ, গ্রন্থকার
শিক্ষা বাগদাদে কুরআন, হাদীছ ও ফিকহ শিক্ষা; শিক্ষকগণের মধ্যে আবু ইউসুফ (হানাফি ফিকহ), ইয়াহইয়া ইবনে আদম (কুরআন) ও ইমাম শাফিয়ী উল্লেখযোগ্য; আরব উপদ্বীপে হাদীছ সংগ্রহে দীর্ঘ ভ্রমণ
উল্লেখযোগ্য কর্ম আল-মুসনাদ (মুসনাদে আহমদ); কিতাবুস সুন্নাহ; উসূলুস সুন্নাহ; আয-যুহদ; ফাদাইলুস সাহাবা; আল-আশরিবা; আল-আসামী ওয়াল কুনা

পরিচিতি

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল (৭৮০–৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ) ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছবিশারদ ও হাম্বলি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা। হাদীছ মুখস্থ ও সংকলনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসাধারণ বলে ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত; তাঁর সংকলিত “আল-মুসনাদ” সেই যুগের বৃহত্তম হাদীছ-সংকলন হিসেবে পরিচিত। আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের আমলে “মিহনা” নামক ধর্মীয় নিপীড়নের সময় তিনি কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট — এই মতবিরোধে প্রচলিত মতের পক্ষে অটল থাকায় কারাবরণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, যা তাঁকে সুন্নি ঐতিহ্যে দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

জন্ম ও শৈশব

পুত্র আবদুল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী আহমদ ইবনে হাম্বাল ৭৮০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে (১৬৪ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার মূলত বসরার বনু যুহল গোত্রের আরব বংশোদ্ভূত ছিল। তাঁর পিতা আব্বাসীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে খোরাসানে দায়িত্ব পালন করতেন এবং পরে পরিবার নিয়ে বাগদাদে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে — কারো মতে তিনি মার্ভে (বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের মেরি অঞ্চল) জন্মেছিলেন, আবার অধিকাংশের মতে তাঁর মা মার্ভ থেকে গর্ভবতী অবস্থায় বাগদাদে এসে সেখানেই তাঁর জন্ম দেন। শৈশবেই তাঁর পিতার মৃত্যু হয় (মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে); মা তাঁকে পিতার পরিবারের তত্ত্বাবধানে লালন-পালন করেন। পিতার রেখে যাওয়া বাগদাদের সম্পত্তির সামান্য ভাড়া-আয় দিয়েই তাঁদের সংসার চলত।

শিক্ষাজীবন

ইবনে হাম্বাল বাগদাদেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি দিওয়ানে (প্রশাসনিক দপ্তরে) লেখকের কাজ শুরু করেন। ইয়াহইয়া ইবনে আদমের কাছে তিনি কুরআন শেখেন এবং আবু হানিফার শিষ্য আবু ইউসুফের কাছে হানাফি ফিকহ অধ্যয়ন করেন। এরপর হাদীছ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হন; ইবনে আল-জাওযীর বর্ণনা মতে, তিনি ৪১৪ জন হাদীছ-বর্ণনাকারীর কাছ থেকে হাদীছ শুনেছিলেন। বহু বছরের ভ্রমণ শেষে বাগদাদে ফিরে তিনি ইমাম শাফিয়ীর কাছে ইসলামী আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কর্মজীবন ও মিহনা

জ্ঞানার্জন শেষে ইবনে হাম্বাল বাগদাদে হাদীছ শিক্ষাদানে নিয়োজিত হন এবং অল্প সময়েই হাদীছশাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি পান। বৃদ্ধ বয়সে তিনি কিছুকাল বিচারকের দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হলো আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের আমলে চালু হওয়া “মিহনা” (ধর্মীয় জিজ্ঞাসাবাদ)। আল-মামুন রাষ্ট্রীয়ভাবে মুতাযিলা মতবাদ — অর্থাৎ কুরআন সৃষ্ট, অসৃষ্ট নয় — এই মত চাপিয়ে দিতে চাইলে ইবনে হাম্বাল প্রচলিত মত (কুরআন আল্লাহর অসৃষ্ট বাণী) ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। ফলে আল-মামুনের আমলে তিনি বাগদাদে কারারুদ্ধ হন; পরবর্তী খলিফা আল-মুতাসিমের আমলে তাঁকে বেত্রাঘাতে অজ্ঞান করে ফেলা হয়, যার ফলে বাগদাদে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিলে খলিফা তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। আল-ওয়াসিকের আমলে তাঁকে বাগদাদ থেকে নির্বাসিত করা হয়। অবশেষে আল-মুতাওয়াক্কিল খলিফা হলে, যিনি প্রচলিত সুন্নি মতের প্রতি সহনশীল ছিলেন, ইবনে হাম্বালকে সসম্মানে বাগদাদে ফিরিয়ে আনা হয়।

সাহিত্যজীবন

ইবনে হাম্বালের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি “আল-মুসনাদ” — বর্ণনাকারী সাহাবীদের নামানুসারে সাজানো হাদীছের বিশাল সংকলন, যাতে প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো হাদীছ রয়েছে। এই গ্রন্থ পরবর্তীকালে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমসহ হাদীছশাস্ত্রের পদ্ধতিগত ভিত্তি গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে কিতাবুস সুন্নাহ, উসূলুস সুন্নাহ, আয-যুহদ (সংযম-বিষয়ক), ফাদাইলুস সাহাবা (সাহাবীদের মর্যাদা-বিষয়ক), আল-আশরিবা এবং আল-আসামী ওয়াল-কুনা। তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে হাম্বলি মাযহাব প্রতিষ্ঠা পায়, যা পরবর্তীতে সৌদি আরব ও কাতারে প্রধান মাযহাব হিসেবে প্রচলিত হয়।

ব্যক্তিগত জীবন

জ্ঞানান্বেষণে ব্যস্ত থাকায় ইবনে হাম্বাল চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত বিয়ে করেননি। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন বাগদাদের উপকণ্ঠের আরব কন্যা আব্বাসা বিনতুল ফাযল, যিনি প্রায় ত্রিশ বছর তাঁর সঙ্গে সংসার করেন এবং পুত্র সালেহের জন্ম দেন। তাঁর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন রায়হানা নামে এক ধার্মিক নারীকে, যাঁর গর্ভে পুত্র আবদুল্লাহর জন্ম হয়। এছাড়া তাঁর দাসী হুসনের গর্ভে কন্যা যায়নাব এবং পুত্র আল-হাসান, মুহাম্মদ ও সাঈদের জন্ম হয়। পুত্রদের মধ্যে সালেহ ও আবদুল্লাহ ফিকহশাস্ত্রে পারদর্শী হন; আবদুল্লাহ পরবর্তীতে পিতার মুসনাদ সংরক্ষণ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

জীবনের শেষ দিকে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুত্র সালেহের বর্ণনা মতে, ২৪১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম দিনে তাঁর জ্বর হয় এবং শুক্রবার, ২ আগস্ট ৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৪-৭৫ বছর। আসরের নামাজের পর তাঁকে দাফন করা হয়। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর জানাযায় লাখো মানুষ অংশ নেয়। বাগদাদের আর-রুসাফা এলাকায় তাঁর নামে মসজিদ-চত্বরে তাঁর সমাধি অবস্থিত। ইবনে হাম্বালকে সুন্নি ইসলামের চার মাযহাবের অন্যতম হাম্বলি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করা হয় এবং হাদীছশাস্ত্রে তাঁর অবদান আজও অধ্যয়নের বিষয়।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।